হবিগঞ্জ প্রতিনিধি : স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও জেলার শায়েস্তাগঞ্জের রেলওয়ে জংশনের দাউদনগর বাজার রেলগেইট এলাকার গণকবরে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ হয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শায়েস্তাগঞ্জবাসী।
জানা যায়, ১৯৭১-এর আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় শায়েস্তাগঞ্জের পার্শ্ববর্তী লালচান্দ চা বাগান থেকে ১১ জন শ্রমিককে ধরে আনে পাক হানাদাররা। পরে গুলি করে তাদের আহত অবস্থায় মাটিচাপা দেওয়া হয়।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এ গণকবরটি এখনো সংরক্ষণ করা হয়নি। বরং অবহেলিত-পরিত্যক্ত ভূমিতে পড়ে আছে। সেই স্মৃতি বুকে নিয়ে আজও নীরবে-নিভৃতে অশ্রু ফেলেন নিহতের স্বজনরা।
১১ জনকে মাটিচাপা দিতে দেখেছিলেন তাদের একজন আব্দুল গফুর ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, তখন আমার বয়স ১৬-১৭ বছর। চাচার চায়ের দোকান দেখাশুনা করতেন রেলওয়ে জংশনে। সে সময় আমি আটক হই পাকসেনাদের হাতে। তারা আমাকে নিয়ে যায় রেলওয়ের গেইট ঘরে।
সেখানে দেখি ১১ জন হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বন্দি। দুজন পাকসেনা তাদের প্রত্যেককে এক মগ করে পানি পান করায়। এরপর নিয়ে আসে গেইট ঘরের পেছনে গর্তের মধ্যে। হাত বাঁধা অবস্থায় গর্তে বসিয়ে গুলি করা হয় তাদের। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার আগেই পাকসেনারা নির্দেশ দেয় ১১ জনকে মাটিচাপা দিতে। এ সময় অনেকে আহত অবস্থায় দাঁড়াতে চাইলে হায়েনারা পা চেপে ধরে মাটিচাপা দিতে বাধ্য করে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা হাজী সফিকুর রহমান বলেন, সেই দিন এ স্থানে পাকহানাদার বাহিনীর নির্মমতার শিকার হন লালচান্দ চা বাগানের মৃত বিহারি বাউরীর ছেলে কৃষ্ণ বাউরী, রাজেন্দ্র রায় বাউরী, গহর রায় বাউরী, সন্ন্যাসী বাউরীর ছেলে নেপু বাউরী, কুমার গোয়ালার ছেলে রাজকুমার গোয়ালা, বিপক বাউরী, কৃষ্ণ বাউরীর ছেলে সুনীল বাউরী, ভুবন বাউরী, মিতাই বাউরীর ছেলে মহাদেব বাউরী, হরিদাস সাধুর ছেলে লাল সাধু ও আতাব আলীর ছেলে অনু মিয়া। তাদের স্বজনরা আজও অশ্রু ফেলেন নীরবে-নিভৃতে।
গণকবরটি সম্পর্কে জানতে চাইলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলী জানান, শায়েস্তাগঞ্জের পার্শ্ববর্তী লালচান্দ চা বাগানের ১১ জন শ্রমিককে ধরে আনে পাকিস্তানিরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হায়েনার দল একে একে তাদের গুলি করে হত্যা করে। তিনি গণকবরটি সংরক্ষণ করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানান।
গণকবরের পাশে বসবাসকারী মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহতাব আলীর পরিবারের পক্ষ থেকে ক্ষোভের সঙ্গে জানানো হয়, স্বাধীনতার ৪৮ বছর হলেও এ গণকবরের স্মৃতি রক্ষায় আজও এখানে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ হয়নি। এতে করে গণকবরটি অবহেলিতভাবে পড়ে রয়েছে।
সরেজমিন গিয়ে জানা গেছে, স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে মাটি ভরাট করা হয়েছে বেশ কয়েক বছর আগে। পৌরসভার পক্ষ থেকে একটি রাস্তা করে দেওয়া হয়েছে। এসব হলেও আজও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ না হওয়ায় স্থানীয়রা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এ ব্যাপারে সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার ও সেক্টর কমান্ডার ফোরাম মুক্তিযুদ্ধ-৭১ হবিগঞ্জ জেলার সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা গৌর প্রসাদ রায় বলেন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকসেনারা দাউদনগর বাজার রেলওয়ে গেইটের পাশে বধ্যভুমিরস্থানে ১১ জনকে হত্যা করে মাটি চাপা দিয়ে রাখে। এখানে দ্রুত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবিও জানান তিনি।


