নিজস্ব প্রতিবেদক : ২৭ বছর পর জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিল হতে যাচ্ছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনায় ঈদের পর কাউন্সিল করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে দায়িত্ব প্রাপ্ত সার্চ কমিটির নেতারা। কাউন্সিলকে ঘিরে ছাত্রদলের পদপ্রত্যাশী এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীরা উচ্ছ্বসিত।
প্রথম দফায় ঘোষিত তফসিল মোতাবেক ১৫ জুলাই কাউন্সিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ একটি অংশের আন্দোলনের কারণে ওই তারিখে কাউন্সিল হচ্ছে না। তফসিল পিছিয়ে আগামী ২৬ বা ২৮ আগস্ট ছাত্রদলের কাউন্সিলের ভোটগ্রহণ করা হতে পারে। পাশাপাশি বিএনপির হাইকমান্ড ছাত্রদলের নতুন নেতা হওয়ার যেসব শর্ত দিয়েছেন তা বহাল থাকবে। তবে বিবাহিতরা কোনোভাবেই প্রার্থী হতে পারবেন না বলে জানিয়েছেন সার্চ কমিটির সিনিয়র সদস্য শামসুজ্জামান দুদু। ছাত্রদলের কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে লড়তে যারা এগিয়ে আছেন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান। ইতোমধ্যে নিজেদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রচারণা চালাচ্ছেন তারা। বিশেষ করে ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে দলের পক্ষে কার কী ভূমিকা ছিল এবং বর্তমানে বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণসহ নানা বিষয় অগ্রাধিকার পাচ্ছে প্রচারণায়। অবশ্য এবারের কাউন্সিলে তৃণমূল ও সাধারণ কর্মীদের দাবি শুধু প্রতিষ্ঠান দেখে আর সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যেন ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচিত না হয়। জাতীয়তাবাদী পরিবারের ও সরকার বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা রাখা যোগ্য প্রার্থীরাই যেন ছাত্রদলের কা-ারি নির্বাচিত হন।
পেছানো হবে তফসিল : ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটের ইতিবাচক সমাধান হয়েছে। গুলশানে চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই নেতা ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধদের নিয়ে গত সোমবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে স্কাইপিতে সংযুক্ত ছিলেন। তিনি দায়িত্ব প্রাপ্ত দুই নেতা ও বিক্ষুব্ধ নেতাদের বলেছেন, যা হওয়ার হয়েছে। এখন ছাত্রদলের কাউন্সিল আগের শর্ত ঠিক রেখে এ মাসের মধ্যেই করতে হবে। তারেক রহমান বিক্ষুব্ধদের বৈঠকে ছাত্রদলের ১২ নেতার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার সহ অন্য সংগঠনে যোগ্যতা অনুযায়ী তাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হবে এবং মূল্যায়ন করার ব্যপারে আশ্বাস দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ২০০০ সালের পরে এসএসসি ধরে ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনে দলের আগের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। আর বিক্ষুব্ধদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রদলের কাউন্সিলের কার্যক্রম স্থগিত থাকায় ঈদের পরে পুনঃতফসিল ঘোষণা করা হতে পারে।
শীর্ষ পদে লড়তে এগিয়ে আছেন যারা : ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষ পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন অন্তত ডজন খানেক নেতা। বিএনপির দেয়ার শর্ত মোতাবেক ২০০০ সালে এসএসসি পাস ও তৎপরবর্তী ব্যাচ থেকে ছাত্রদলের শীর্ষপদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী এসব নেতা। তারা বিএনপির নীতিনির্ধারকসহ ছাত্রদলের নতুন কমিটি গঠনের সাথে জড়িত সাবেক ছাত্রনেতাদের কাছে গিয়ে বিগত দিনে আন্দোলন-সংগ্রামে নিজের অংশগ্রহণ ও ভূমিকার প্রমাণ তুলে ধরছেন।
তবে পদপ্রত্যাশীদের মাঝে ‘সিন্ডিকেট’ ভীতি রয়েছে। বিগত দিনে ছাত্রদলের নিয়ন্ত্রক হিসেবে পরিচিত নেতাদের নিয়ে শংকিত অনেক ত্যাগী ও যোগ্যরা। পদপ্রত্যাশীদের মাঝে নানা শংকা ও হতাশাও দেখা দিয়েছে। তবে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একাধিক সদস্য বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করেছেন, খোঁজখবর রাখছেন। তাই কাউন্সিল ঘিরে সিন্ডিকেটের সুযোগ নেই।
সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান, বিলুপ্ত কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রান ও দুর্যোগ বিষয়ক সম্পাদক আজিম উদ্দিন মেরাজ, সহ সাংগঠনিক সম্পাদক কারীমুল হাই নাঈম, নাদিয়া পাঠান পাপন, সহ-তথ্যবিষয়ক সম্পাদক মামুন খান, ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, ইকবাল হোসেন শ্যামল, শাহ নেওয়াজ, রিজভী আহমেদ, তানজিল হাসান, সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবু তাহের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক সর্দার আমিরুল ইসলাম সাগর, সদস্য মোহাম্মদ এরশাদ খান, ঢাবির সিনিয়র সহ সভাপতি তানভীর রেজা রুবেল সহ প্রমুখ।
ছাত্রদলের কাউন্সিলের ইতিহাস : ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্র মতে, ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি সংগঠনের প্রতিষ্ঠার পর গত ৪০ বছরে ১৮টি কমিটি হয়েছে। ১৯৭৯ সালে প্রথমে মরহুম কাজী আসাদুজ্জামানকে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি হয়। ওই বছরেই কাউন্সিলের মাধ্যমে প্রথম কমিটি নির্বাচিত হয়। এতে এনামুল করিম সভাপতি ও আ ক ম গোলাম হোসেন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। সর্বশেষ নির্বাচিত কমিটি হয় ১৯৯২ সালে। কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন যথাক্রমে রুহুল কবির রিজভী ও ইলিয়াস আলী। এ কমিটি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র খুনের ঘটনা ঘটে। এরপরই কমিটি ভেঙে দেয়া হয়। তখন বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায়। পরের বছর, ১৯৯৩ সালে ফজলুল হক মিলনকে সভাপতি ও নাজিম উদ্দিন আলমকে সাধারণ সম্পাদক করে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। সেই থেকে ছাত্রদলের অনির্বাচিত কমিটির যাত্রা শুরু। সর্বশেষ রাজীব আহসান-আকরামুল হাসান কমিটি পর্যন্ত ১০টি কমিটিই ছিল অনির্বাচিত। এবার ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে কাউন্সিলরদের প্রত্যক্ষ ভোটে নেতা নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত ৩ জুন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আসন্ন কাউন্সিলে প্রার্থী হওয়ার জন্য তিনটি যোগ্যতা নির্ধারণী শর্ত দেয়া হয়। সেখানে বলা হয় প্রার্থীকে ছাত্রদলের প্রাথমিক সদস্য হতে হবে, তাকে অবশ্যই বাংলাদেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী হতে হবে এবং ২০০০ সালের পরে এসএসসি/সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। কাউন্সিলের তফসিলও ঘোষণা হয়। কিন্তু এ নিয়ে বিলুপ্ত কমিটির একটি অংশ আন্দোলন করতে থাকে। একপর্যায়ে ১২ নেতাকে বহিষ্কার করা হয়। এখন তাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত হয়।

