আন্তর্জাতিক ডেস্ক : পরিবহন খাতে বৈপল্লবিক পরবর্তনের লক্ষ্যে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের দেশ নরওয়ে। বিশ্বে এই প্রথম তারা পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকে বৈদ্যুতিক জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তরে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
পরিকল্পনায় রয়েছে, ২০৪০ সাল নাগাদ নরওয়ের সব স্বল্প দূরত্বের বিমান ইলেকট্রিক ব্যাটারি দিয়ে চালানো। ২০২৫ সাল নাগাদ দেশটিতে বৈদ্যুতিক ব্যাটারি চালিত গাড়ি ছাড়া আর সব গাড়ি নিষিদ্ধ করা।
কিভাবে এই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে নরওয়ে, তা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি। অসলো বিমান বন্দরের এক হ্যাঙ্গারে জড়ো হয়েছেন সাংবাদিকরা। ইলেকট্রিক ব্যাটারি চালিত যে বিমানটি একটু পরে আকাশে উড়বে, তার প্রস্তুতি চলছে।
বিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছে এই বিমান। আকারে একেবারেই ছোট। তার ভেতর একজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ বসতে পারবে। একটা কাগজের মতো যেন নিজেকে ভাঁজ করতে হলো বিমানের সিটে বসতে গিয়ে। যেন অনেকটা বাচ্চাদের পার্কের কোন রাইডে চড়ার মতো ব্যাপার। কিন্তু এটি আসলে বিশ্বের সবচেয়ে অত্যাধুনিক বিমানগুলোর একটি।
এই বিমানটির ইঞ্জিনের শব্দ অন্য বিমানের মতো নয়। মনে হবে যেন কোন বড় ফ্যান ঘুরছে। আর কোন ধোঁয়া বের হয় না এই ইঞ্জিন থেকে।
২০৪০ সাল নাগাদ নরওয়ে চাইছে তাদের সব স্বল্প দূরত্বের ফ্লাইট এই ব্যাটারি চালিত বিমান দিয়ে চলবে। এটা কি আসলেই বাস্তবে সম্ভব?
এই ইলেকট্রিক বিমানের উদ্ভাবক টিনা টিমোজোয়েকি বলছেন, খুবই সম্ভব। নরওয়ে স্বল্প দূরত্বের যেসব ফ্লাইট ইলেকট্রিক ব্যাটারি চালিত বিমান দিয়ে পরিচালনার কথা বলছে, সেগুলো মূলত দুশো হতে তিনশো কিলোমিটারের পথ পাড়ি দেয়।
টিনা টিমোজোয়েকির ভাষায়, ‘আমাদের হাতে এখনই যে প্রযুক্তি আছে সেটাকে কিন্তু আরও বড় পরিসরে ব্যবহারের বিরাট সুযোগ আছে। আমাদের স্বপ্ন হচ্ছে এমন একটি মেশিন তৈরি করা বোতাম চাপা মাত্র যেটি আপনাকে নিঃশব্দে এবং অনেকটা অগোচরে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাবে। এটা হবে এক নতুন প্রজন্মের ফ্লাইং মেশিন।’
শুধু বিমান নয়, নরওয়েতে আরও অনেক ধরনের যানবাহনকেই ইলেকট্রিক ব্যাটারি চালিত বাহনে পরিণত করা হচ্ছে। পশ্চিম নরওয়েতে ইলেকট্রিক ব্যাটারি চালিত ফেরি চলাচল শুরু হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। এই ফেরিটিতে শব্দ বলতে গেলে শোনাই যায় না। কেউ ফেরিটিতে চড়লে মনে করতে পারেন, তিনি ফেরিতেই নেই।
স্টাইন ইয়োহানসন এরকম একটি ফেরির ক্যাপ্টেন। একটা মজার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কয়েক মাস আগে আমি আমাদের একটি পুরোনো ফেরিতে ওভারটাইম করতে যাই। সেই ফেরিটি ছিল ডিজেল ইঞ্জিন চালিত। এক সপ্তাহ আমি সেই জাহাজে ছিলাম। তারপর আমি এখানে এসে এই ব্যাটারি চালিত ফেরি চালাতে শুরু করলাম। তো শুরুতে আমার মনে হলো, আমি বোধহয় আমার ফেরির ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে ভুলে গেছি। কারণ এই ফেরির ইঞ্জিন শব্দ অনেক কম। আমি আসলে ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে ভুলিনি। আমি ভুলে গিয়েছিলাম যে এই ইঞ্জিনে আসলে প্রায় কোন শব্দই হয় না… আর এই ইঞ্জিন থেকে কোন ধোঁয়াও বের হয় না।’
বার্গেনের রাস্তায় উনিস ফেয়ারেন একটি ইলেকট্রিক কার চালান। নরওয়ের সরকার এই ইলেকট্রিক কার চালানোর জন্য তাকে বেশ ভালোই ভর্তুকি দেয়। এটিতে করেই তিনি বাচ্চাদের স্কুলে আনা-নেয়া করেন।
তিনি বলেন, ‘এটি দামে সস্তা, এটির চালানোর এবং মেরামত করার খরচও বেশ কম। নরওয়েতে সরকার আমাদেরকে ইলেকট্রিক কার চালানোর জন্য প্রচুর ভর্তুকি দেয়। ইলেকট্রিক কারের জন্য এমনকি পার্ক এবং ফেরি পারাপারের ফি পর্যন্ত কম। এটা তো পরিবেশের জন্যও খুব ভালো।’

