নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি : নারায়ণগঞ্জে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবির দুই নারী জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-১১)। রাজধানী ঢাকার আরামবাগ থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে উগ্রবাদী বই ও লিফলেট উদ্ধার করা হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে র্যাব-১১ এর সিনিয়র সহকারী পরিচালক শেখ বিল্লাল হোসেন এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান।
তিনি জানান, র্যাব-১১ এর আওতাধীন এলাকায় ইতোপূর্বে করা মামলাসমূহের এজাহারনামীয় পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্নস্থানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
এই ধারাবাহিকতায় র্যাব-১১ এর একটি টিম গত বুধবার রাত ১০টার দিকে রাজধানীর আরামবাগে অভিযান চালায়। এসময় গ্রেপ্তার করা হয় দুই নারী জঙ্গিকে। তারা হলেন- জেএমবির নারী সদস্য ময়মনসিংহ সদর থানার কাচিঝুলি এলাকার হামিদ উদ্দীন রোড়ের রুবাইয়া বিনতে নূর উদ্দিন ওরফে হুরের রাণী ওরফে লাবিবা ও একই জেলার ফুলবাড়িয়া থানার শ্রীপুর এলাকার নাঈমা আক্তার ওরফে হিমালয়ের কন্যা।
র্যাব আরও জানায়, রুবাইয়া বিনতে নুর উদ্দিন ওরফে হুরের রাণী ওরফে লাবিবা ২০১১ সালে ময়মনসিংহের একটি গার্লস স্কুল হতে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে। তারপর ২০১২ সাল হতে মাদ্রাসায় লেখাপড়া শুরু করে। বর্তমানে সে স্থানীয় একটি বালিকা মাদ্রাসায় নাহবেমীরে অধ্যায়নরত। সে মূলত ইন্টারনেটের মাধ্যমে উগ্রবাদীতার প্রতি আকৃষ্ট হয়। ২০১৬ সালে ইন্টারনেটে সামাদ ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে জাকির নামক এক জেএমবি সদস্যের সঙ্গে তার পরিচয় সূত্রে সে জেএমবির নারী শাখায় অন্তর্ভুক্ত হয়। পরে র্যাব-১১ কর্তৃক ইতোপূর্বে গ্রেপ্তার নারী জঙ্গি সদস্য মিতুসহ বেশ কয়েকজন সক্রিয় নারী জঙ্গি সদস্যদের সাথে পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে।
গ্রেপ্তার নারী জঙ্গি রুবাইয়া জেএমবিতে অন্তর্ভুক্তির পর সে জেএমবির নারী শাখার দাওয়াতি ও প্রচার কার্যক্রম চালাত। সে ও তার মা ফিরোজা বেগম, গ্রেপ্তার নাঈমাসহ তার নিকট আত্মীয়, প্রতিবেশী সহপাঠী ও বন্ধুদের জেএমবির দাওয়াত দেয়। তার মধ্যে তার মা, নাঈমাসহ বেশ কয়েকজনকে সে জেএমবিতে অন্তর্ভুক্ত করে। তবে রুবাইয়ার বাবা, নানা-নানি ও বেশ কয়েকজন নিকট আত্মীয় জেএমবির দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে আইন-শৃঙখলা বাহিনীর ভয় দেখালে সে তাদেরকে এড়িয়ে চলতে থাকে এবং পরে সে ও তার মা কঠোর গোপনীয়তার মাধ্যমে নিজেদের জেএমবির সাথে সম্পৃক্ত রাখে।
ইতোপূর্বে রুবাইয়াকে ইতোপূর্বে বর্ণিত জঙ্গি সামাদ ওরফে আব্দুল্লাহ ওরফে জাকির হিযরত করার প্রস্তাব দিলে তাকে তার মা স্বাচ্ছন্দে অনুমতি দেয়। ফলশ্রুতিতে তার মায়ের অনুমতিক্রমে এই জঙ্গিকে বিয়ে করে হিজরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করে। কিন্তু ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে ওই জঙ্গি জাকিরের সাথে তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে হিজরতে গমনের বিষয় বিলম্বিত হয়। পরবর্তীতে গত বছরের জুলাই/আগস্টে ইতোপূর্বে গ্রেপ্তার জঙ্গি শরফুল আওয়াল রুবাইয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে রুবাইয়ার মা ও রুবাইয়া শরফুলের পূর্বে গ্রেপ্তারের রেকর্ড দেখে খাঁটি মুজাহিদ হিসেবে বিবেচনা করে তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়, কিন্তু এর মধ্যে জঙ্গি শরফুল আওয়াল আবারও গ্রেপ্তার হলে সে পরিকল্পনাও ভেস্তে যায়। কিছুদিন পর পুনরায় জেএমবি সদস্য জাকিরের সাথে রুবাইয়ার যোগাযোগ হয়। ফলশ্রুতিতে মা ও মেয়ের পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রুবাইয়া হিজরতের উদ্দেশ্যে গত ১৬ মার্চ গৃহত্যাগ করে।
প্রসঙ্গত, রুবাইয়া হিজরতের উদ্দেশ্যে গৃহত্যাগের বিষয়টি তার মা অবগত থাকলেও তার বাবা বিষয়টি জানতেন না।
হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পর সে জঙ্গি সামাদ ও বেশ কয়েক জঙ্গি সদস্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্রমাগত অভিযান ও নজরদারি এড়াতে দেশ ত্যাগের পরিকল্পনা করে। ইতোমধ্যে জঙ্গি সামাদ কৌশলে গ্রেপ্তার রুবাইয়াকে ভুয়া নাম ঠিকানায় একটি পাসপোর্ট করিয়ে দেয়। দেশত্যাগের উদ্দেশ্যে তারা বিদেশে অবস্থানরত জঙ্গি সদস্য নূর ইসলাম ওরফে ভানু প্রতাপ সিং ওরফে সাইফ আল ইসলামের সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখত। দেশত্যাগের উদ্দেশ্যে তারা বেশ কয়েকদিন খুলনা, যশোর, বেনাপোলে অবস্থান করার পর তারা বুঝতে পারে যশোর দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে; এ লক্ষ্যে তারা আবার দেশের অভ্যন্তরে অন্যত্র কয়েকদিন গা ঢাকা দেয়ার পরিকল্পনা করে।
এদিকে নাঈমা আক্তার ওরফে হিমালয়ের কন্যা ময়মনসিংহের একটি কলেজে পদার্থ বিজ্ঞানে মাস্টার্সে অধ্যায়নরত। মূলত সে তার এক বান্ধবীর সহচার্যে এসে ধর্মীয় বিষয়ের প্রতি আগ্রহের সৃষ্টি হয়। জসীম উদ্দিন রাহমানীর কিছু লেকচার ও অন্যান্য উগ্রবাদ সংক্রান্ত বই পড়ে উগ্রবাদীতায় আকৃষ্ট হয়। পরে সে গ্রেপ্তার রুবাইয়ার দাওয়াতের মাধ্যমে জেএমবির নারী শাখায় অন্তর্ভুক্ত হয়। গ্রেপ্তার নাঈমা ইন্টারনেট ও ফেসবুকে প্রচুর ধর্মীয় উগ্রবাদিতা বিষয়ে লেখালেখি ও প্রচুর স্ট্যাটাস দিত। সে তাদের কলেজের ছাত্রী হোস্টেলে অবস্থানরত ছাত্রীদের উগ্রবাদের দাওয়াত দিত এবং ওই হোস্টেলে সে ও রুবাইয়াসহ কয়েকজন নারী জঙ্গি মিলে মাঝেমধ্যে গোপন বৈঠক করত। ওই গোপন বৈঠকে তারা অনলাইনে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নিত। তাদের পরিকল্পনা ছিল নারী সদস্য দ্বারা কিভাবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা পরিচালনা করা যায়। ইতোমধ্যে রুবাইয়া হিজরতে চলে গেলে তার উগ্রবাদে সম্পৃক্ততার বিষয়টি জানাজানি ও জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। ফলশ্রুতিতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর গ্রেপ্তার এড়াতে সে আত্মগোপনের পরিকল্পনা করে। গোপনে সে বিভিন্ন মাধ্যমে রুবাইয়ার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র চালানোর কৌশলের ব্যাপারে তথ্য বিনিময় করত বলেও জানা যায়।
র্যাব আরও জানায়, গত বছরের এপ্রিল হতে এ পর্যন্ত র্যাব-১১ বেশ কয়েকটি সফল জঙ্গিবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে। এ সকল অভিযানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতা এবং তিনজন নারীসহ ৮৪ জন বিভিন্ন পর্যায়ের সদস্য ও পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বিভিন্ন অভিযানে গ্রেপ্তার এ সকল জঙ্গিকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের নেটওয়ার্ক এবং কার্যক্রমের অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। প্রাপ্ত সেসকল তথ্যাদি যাচাই-বাছাই ও বিশ্লেষণের পর জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত যে সকল সদস্য এখনও গ্রেপ্তার হয়নি তাদেরকে আইনের আওতায় আনার জন্য অব্যাহতভাবে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

