নিজস্ব প্রতিবেদক : রাজধানীতে এখনো অটোরিকশায় ভাড়া নৈরাজ্য ও যাত্রী হয়রানি চরমে বলে যাত্রীকল্যাণ সমিতি এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। এতে বলা হয়েছে, এখনো রাজধানীতে চুক্তিতে চলে ৬২ ভাগ অটোরিকশা। বকশিস দাবি করে ৮১ ভাগ, মিটারবিহীন চলে ৩৮ ভাগ এবং ৭৩ ভাগ অটোরিকশা পছন্দের গন্তব্যে যায় না।
রোববার গণমাধ্যমে পাঠানো এই প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের যাত্রী সাধারণের বাহন হিসেবে পরিচিত দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসে নামমাত্র খরচে পরিচালিত সিএনজি চালিত অটোরিকশায় মালিক, চালক, সরকার মিলে যাত্রী স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে এক লাফে যাত্রী ভাড়া ৬০ ভাগ বাড়িয়েও এই সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে।
মালিক-চালকদের মনমতো ভাড়া কার্যকরের পর ‘কেমন চলছে অটোরিকশা?’ এই শিরোনামে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য পর্যবেক্ষণ উপকমিটির সদস্যরা গত ২০ থেকে ২৮ জানুয়ারি সপ্তাহব্যাপী রাজধানীর ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ স্পটে ১০৯৩টি অটোরিকশায় যাত্রী সেবার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে এই সময়ে ১১৬০ জন অটোরিকশা যাত্রীর সাথে কথা বলে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকায় চলাচলরত অটোরিকশার ৬২ ভাগ চুক্তিতে চলাচল করে। মিটারে চলাচলকারী অটোরিকশার ৮১ শতাংশ ২০ টাকা থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত বকশিস দাবি করে। যাত্রীদের চাহিদার গন্তব্যে যেতে রাজি হয় না ৭৩ ভাগ অটোরিকশা।
এছাড়া পর্যবেক্ষণকালে প্রাইভেট অটোরিকশা ভাড়ায় যাত্রী বহন এবং ঢাকা জেলার অটোরিকশা বেআইনিভাবে ঢাকা মহানগর এলাকায় প্রবেশ করে ৩৮ শতাংশ গাড়ি মিটারবিহীনভাবে চলাচল করতে দেখা গেছে। পর্যবেক্ষণকালে ঢাকার সদরঘাট, গুলিস্তান, প্রেসক্লাব, পল্টন, কাকরাইল, দৈনিকবাংলা, মতিঝিল, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, খিলগাঁও চৌরাস্তা, ফকিরাপুল, ফার্মগেট, মালিবাগ, মিরপুর-১০, ধানমন্ডি, এলিফেন্টরোড, শাহবাগ, বিমানবন্দর, মহাখালী এলাকা ঘুরে উপরোক্ত চিত্র দেখা গেছে। এসব অনিয়ম প্রতিরোধে পর্যবেক্ষণকালীন সময়ে সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত উক্ত এলাকায় বিআরটিএ বা অন্যকোনো সংস্থার কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি। পর্যবেক্ষণকালে যাত্রীরা অভিযোগ করে বলেন, রাত ৯টার পর এবং সকাল ৮টার আগে কোন অটোরিকশা মিটারে চলে না।
এর আগে ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর সিএনজি চালিত অটোরিকশার বর্ধিত ভাড়া কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি গণপরিবহনে ভাড়া নৈরাজ্য পর্যবেক্ষণ উপকমিটির সদস্যরা ঢাকা মহানগরীতে একই বছরের ১ ও ২ নভেম্বর দুই দিন ধরে পল্টন, প্রেসক্লাব, শাহবাগ, গুলিস্তান, মতিঝিল, ফার্মগেট, মহাখালী, মিরপুর, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, কমলাপুর রেল স্টেশন, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল এলাকা পর্যবেক্ষণ করে। এসব এলাকায় প্রায় ২২৫টি অটোরিকশাচালক ও ২৪৭ জন যাত্রীর সাথে কথা বলে। এতে ১৯৮টি সিএনজি অটোরিকশা মিটারে চলাচল করছে বলে চালক-যাত্রী প্রতিনিধিদল জানিয়েছে। বাকি ২৭টি অটোরিকশার ১০টিতে কোনো মিটার পাওয়া যায়নি। ১৭টি অটোরিকশাচালক বা যাত্রীর ইচ্ছায় চুক্তিতে চলাচল করতে দেখা গেছে।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষার দিন নতুন বর্ধিত ভাড়া কার্যকর করায় ওদিন মিটার জটিলতাসহ নানা কারণে অর্ধেকেরও বেশি অটোরিকশা চলাচল বন্ধ থাকায় পরীক্ষার্থীসহ নগরীর যাত্রী সাধারণ চরম ভোগান্তিতে পড়ে যা যাত্রীকল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে উঠে আসে। এছাড়া পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মিটার চালু করে চলাচল করলেও অধিকাংশ অটোরিকশা গোপনে চুক্তিতে চলাচল করছে। সরকার নির্ধারিত বর্ধিত দৈনিক জমা ৯০০ টাকা হলেও সিংহভাগ অটোরিকশার মালিকরা ইচ্ছেমতো জমা আদায় করছে বলে চালকরা জানিয়েছেন। ৯২ শতাংশ যাত্রীর অভিযোগ অটোরিকশা চালকরা এখনো যাত্রীদের পছন্দের গন্তব্যে যেতে রাজি হয় না।
পর্যবেক্ষণকালে প্রতীয়মান হয় যে, যাত্রীদের চাহিদার তুলনায় এই বাহনের সংখ্যা কম। ফলে চালকদের ইচ্ছার কাছে যাত্রীরা জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি ভাড়া দিয়েও গোপন চুক্তিতে যাতায়াতে বাধ্য হচ্ছে যাত্রীরা। অতিরিক্ত দৈনিক জমা ও আনুসঙ্গিক খরচের পুরোটাই যাত্রীদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে যাত্রীরা অভিযোগে জানান।
যাত্রীকল্যাণ সমিতি পর্যবেক্ষণোত্তর কিছু সুপারিশও তুলে ধরেছে প্রতিবেদনে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ২০ হাজার করে ৪০হাজার নতুন অটোরিকশা নামানোর উদ্যোগ নেওয়া। গণমালিকানার পরিবর্তে কোম্পানিভিত্তিক অথবা অ্যাপসভিত্তিক অটোরিকশা পরিচালনার ব্যবস্থা করা। মিটারবিহীন ও প্রাইভেট অটোরিকশা চলাচল বন্ধে উদ্যোগ গ্রহণ। জমা ও ভাড়া বৃদ্ধি, সিলিং নির্ধারণ, মনিটরিং কমিটিতে যাত্রীসাধারণের প্রতিনিধিত্ব রাখা। নীতিমালা লঙ্ঘন করে চলাচলকারী অটোরিকশা ১ বছর আটক রাখার বিধান করা। আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করে দেওয়া এবং নতুন অটোরিকশা নিবন্ধনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা ও অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করা।

