নিউজ ডেস্ক : ১১ মার্চ, ১৯৭১। এদিন বর্ষীয়ান মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী টাঙ্গাইলে এক জনসভায় সকল রাজনৈতিক পক্ষকে উদ্দেশ্য করে বলেন, সাত কোটি বাঙালির নেতা শেখ মুজিবের নির্দেশ পালন করুন।
১৯৭১-এর মার্চের এদিনটি ছিল বৃহস্পতিবার। দেশজুড়ে মানুষের মনে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের অবিচল সংগ্রামী মনোভাব বিরাজ করতে থাকে।
হাইকোর্টের বিচারপতিসহ সরকারী ও আধা সরকারী প্রতিষ্ঠানের সকল স্তরের কর্মচারীগণ অফিস বর্জন করেন। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো, অসহযোগ সমর্থনকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংস্থা, পেশাজীবীগণ, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচীর সমর্থনে সোচ্চার হয়ে ওঠে।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান অনেক আগেই পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে। একমাত্র সেনা ছাউনি ছাড়া টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কোথাও পাকিস্তানীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। পুরো দেশ, মানুষ চলছিল একমাত্র এক ব্যক্তির নির্দেশে, এক ব্যক্তির অঙ্গুলী হেলনে- তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক জান্তার রক্তচক্ষু ও আদেশ উপেক্ষা করেই সব দোকানপাট, অফিস-আদালত, কল-কারখানা, কোর্ট-কাছারি বন্ধ রাখা হয়। দেশজুড়ে চলতে থাকে মিটিং-মিছিল। সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা আরও জোরালো হয়। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় দল গঠনের কাজ চলতে থাকে। শহরগুলোতে প্রতিদিনই মিছিল-মিটিং চলতে থাকে। পাক বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন অনেকে। বাড়তে থাকে শহীদদের তালিকা। একেকটি মৃত্যু বীর বাঙালির রক্তে প্রতিশোধের ইচ্ছা আরও বাড়িয়ে তোলে। চারদিক উত্তেজনা বাড়তে থাকে। দেশের স্বাধীনতা আনতে অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতে সবাই প্রস্তুত।
এই দিনে ছাত্র ইউনিয়ন দেশবাসীকে সংগঠিত করতে একটি লিফলেট ছাড়ে। সেখানে তারা পাক হানাদারদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়। এভাবে একেকটি দিন যেতে থাকে আর বাড়তে থাকে উত্তেজনা। সংঘবদ্ধ হতে থাকে বাঙালি। বাড়তে থাকে বাঙালির মনের জোর।
অন্যদিকে ১৯৭১ সালের রক্তঝরা মার্চের উত্তাল অসহযোগ আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের আজ ছিল চতুর্থ দিবস। সারা দেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর ডাকে শান্তিপূর্ণভাবে সর্বাত্মক অসহযোগ পালন করে। বিদ্রোহের আগুনে টালমাটাল পুরো দেশ। শান্তিপূর্ণভাবে অসহযোগ আন্দোলন সফল হওয়ায় বঙ্গবন্ধুর ওপর দেশবাসীর আস্থা বেড়ে যায় অনেকগুণে। একাত্তরের এই সময়ে বাঙালি জাতির চিন্তা ও লক্ষ্য তখন একটাই ‘স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।’
গত কয়েক দিন ধরেই বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সর্বত্র ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গড়ে তোলার কাজ চলতে থাকে। কোন গণশত্রু বা স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি যেন কোথাও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য দলের স্বেচ্ছাসেবকগণ বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাজধানীতে নৈশকালীন টহল কার্যক্রম শুরু করে।
এদিন ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘের উপ-আবাসিক প্রতিনিধি মি. কে. উলফ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার বাসভবনে সাক্ষাত করেন। বঙ্গবন্ধু তাকে যতদিন খুশি বাংলাদেশে থাকার অনুরোধ করে বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী দেশে গণহত্যা চালানোর পাঁয়তারা করছে। এ অবস্থায় মানবতা রক্ষায় তাদের দেশ না ছাড়তে অনুরোধ করেন।
বরিশালে এদিন কারাগার ভেঙ্গে ২৪ কয়েদী পালিয়ে যায় এবং পুলিশের গুলিতে ২ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়। কুমিল্লাতেও অনুরূপ ঘটনায় পুলিশের গুলিতে ৫ জন নিহত ও শতাধিক লোক আহত হয়।
এভাবে অনিবার্য স্বাধীনতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পূর্ব পাকিস্তান হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে, এটা বুঝতে পেরে পাক সামরিক জান্তারা গোপনে বাঙালি নিধনে ঘৃণ্য খেলায় মেতে ওঠে। যে কোন মূল্যে স্বাধীনতা ঠেকাতে পাকি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বাঙালির রক্তের হোলি খেলার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। গোপনে পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানী সামরিক শক্তি ও অস্ত্র-গোলাবারুদ মজুদ করতে থাকে। এই ঘৃণ্য পরিকল্পনার কথা সামরিক বাঙালি অফিসাররা জানতে পেরে তারাও ভেতরে ভেতরে স্বাধীনতার জন্য লড়াইয়ে শক্তি-সাহস সঞ্চয় করতে থাকেন।

