নিউজ ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক সাত মাস আগের কথা। রড আইল্যান্ডের এক জনসমাবেশে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে টুইটার অ্যাকাউন্টটি আর ব্যবহার করবেন না তিনি। ২০১৬ সালের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ওই জনসমাবেশ থেকে প্রশ্ন এসেছিল, কেন? ট্রাম্পের উত্তর, এটা প্রেসিডেন্ট-সুলভ আচরণ নয়।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার এক বছরের মাথায় দেখা গেল ট্রাম্প শুধু টুইটার ব্যবহারই করেননি বরং এর পেছনেই দিচ্ছেন দিনের অনেকখানি সময়। হোয়াইট হাউসে আসার পর টুইটার ব্যবহারে তিনি হয়েছেন আগের চেয়ে বেশি সক্রিয়। এই এক বছরে ট্রাম্প অন্তত দুই হাজার ছয় শ আটবার টুইট করেছেন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে সাতটিরও বেশি টুইট করেছেন তিনি। এই টুইটগুলোর কিছু সাময়িক, কিছু সাধারণ, কিছু হিংসাত্মক, কিছু বিদ্বেষপূর্ণ আবার কিছু উত্তেজক বা বিস্ফোরক।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরও কেন তিনি টুইটার ব্যবহার করছেন? এর উত্তরটাও তিনি টুইটারেই দিয়েছেন। কারণ হিসেবে জানিয়েছেন, আধুনিক যুগের প্রেসিডেন্টের কর্মকা- এ রকমই নাকি হয়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজেকে খুবই আধুনিক বলে দাবি তার।
তো এই আধুনিক প্রেসিডেন্ট গত এক বছরে তার করা টুইটের বেশিরভাগই করেছেন ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টার মধ্যে। বার্তা সংস্থা সিএনএন গত ২১ জানুয়ারি ট্রাম্পের করা টুইট নিয়ে দীর্ঘ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, শতকরা ৩২ শতাংশ টুইটই ওই সময়ে করা। তবে এটা যে ঠিক কাকতালীয় তা নয়। ওই সময়েই তার প্রিয় টেলিভিশন শো ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস প্রচারিত হয়।
তবে তার টুইটের বেশিরভাগই সমালোচনামূলক। অন্যের প্রশংসা তাতে কমই রয়েছে। তার করা টুইটের মধ্যে এক হাজার ২৩৮টি টুইটে তিনি অন্যের নিন্দা বা সমালোচনা করেছেন। আর ৫২৭ বার করেছেন অন্যের বা নিজের বা আর পরিবারের প্রশংসা। এক টুইটেই সাতটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের উল্লেখ করতে দেখা গেছে তাকে। তবে প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প কার প্রশংসা করলেন আর আক্রমণই বা কাকে করলেন?
এর উত্তরটও খুবই সোজা। ট্রাম্পের সব রাগ তো যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার কিছু গণমাধ্যমের ওপরই। আর তাই আক্রমণের শিকারও হয়েছে তারাই বেশি। সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী ট্রাম্প অন্তত ১৯৬ বার গণমাধ্যমের প্রতি ক্ষোভ ঝেড়েছেন। এর মধ্যে ১৪৭ বার গণমাধ্যমের নাম উল্লেখ করেছেন। অন্তত ১০০ বার সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, তার সময়ের কর্মী ও তার স্বাস্থ্য বীমা ওবামা কেয়ারের সমালোচনা করেছেন। ৯৫ বার যুক্তরাষ্ট্রের আইন আদালত ও এ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে টুইট করেছেন। ৭৯ বার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে নিয়ে টুইট করেছেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার চারদিনের মাথায় গণমাধ্যমকে আক্রমণ করেন ট্রাম্প। তার শপথ অনুষ্ঠান ভালোভাবে কাভারেজের জন্য প্রশংসা করেন ফক্স নিউজের। তা না করার জন্য কড়া ভাষায় আক্রমণ করেন সিএনএনকে।
সিএনএনের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কটা যেন সাপে-নেউলে। আগেও বহুবার সিএনএনের নাম উল্লেখ করে সরাসরি আক্রমণ করেছেন তিনি। একবার তো সিএনএনের লোগোকে ঘুষি মেরেই বসলেন! ব্যাপারটা ছিল এরকম। গত বছরের ২ জুলাই সকালে নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে ২৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করেন ট্রাম্প। সেখানে দেখা যায়, সিএনএনের লোগো লাগানো এক রেসলারের মাথায় আঘাত করছেন ট্রাম্প! আসলে এটি রেসলিংয়ের ডব্লিউডব্লিউইর একটি সম্প্রচারিত অংশের ভিডিও। ভিডিওটি এডিট করা হয়েছে। তাতে এক রেসলারের মুখ, মাথার ওপরে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে সিএনএনের লোগো। আর সেই লোগোকে খুব কিল-ঘুষি মারছেন ট্রাম্প! মনের ঝাল মিটিয়ে নিচ্ছেন আর কি! এটা থেকেই বোঝা যায়, গণমাধ্যমগুলোর ওপর কতটা ক্ষ্যাপা তিনি। ট্রাম্পের এই টুইটটি সবচেয়ে বেশিবার শেয়ার করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি লাইকও এয়েছে এটি। এতে রি-টুইট পড়েছে অন্তত তিন লাখ ৬১ হাজার।
স্বাভাবিকভাবেই খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ধরনের ভিডিওতে ক্ষুব্ধ বহু মানুষ। ক্ষুব্ধ সিএনএনসহ বহু গণমাধ্যম। এই টুইটের পর ট্রাম্পের সঙ্গে মার্কিন মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর লড়াইটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এছাড়া গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে তার মনোভাবটাও ফুটে উঠেছে। সম্ভবত ট্রাম্পই প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট যার সঙ্গে সে দেশের গণমাধ্যমগুলোর লড়াইটা এত স্পষ্ট। এতটা সরাসরি। এ কারণেই কি ট্রাম্পের খুঁটিনাটি সব বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন দেখা যায় সিএনএনের পাতায়?
তবে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে তার টুইট আক্রমণ চরম পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় গত ২৮ মে। ওইদিন সকালে মাত্র ১২ মিনিটের মধ্যে ছয়টি টুইট করেন ট্রাম্প। তার জামাতা জারেড কুশনার রাশিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন এ রকম একটি খবর সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এসব টুইট করেছিলেন ট্রাম্প। এই খবরটিকে তিনি ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। এর জেরে পরবর্তীতে ভুয়া খবর পরিবেশনের জন্য কয়েকটি সংবাদমাধ্যমকে পুরস্কার দেওয়া যেতে পারে বলে কটাক্ষ করেন তিনি। টুইটারে জানান, এবিসি নিউজ, ওয়াশিংটন পোস্ট, সিএনএন, নিউইয়র্ক টাইমসসহ বেশ কিছু গণমাধ্যম নাকি ফেক নিউজ অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার যোগ্য!
গণমাধ্যমকে আক্রমণ করে টুইট করার ক্ষেত্রে কিছুটা বিরতি আসে গত আগস্ট মাসে। ওই সময় পরপর দুটি শক্তিশালী ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি রাজ্য। এছাড়া এই সময়ে তিনি মেতে ওঠেন উত্তর কোরিয়া নিয়ে। টানা দু সপ্তাহ তিনি ব্যস্ত থাকেন উত্তর কোরিয়াকে আক্রমণ করে টুইট করতে। তবে ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম সাত মাসে উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং উন সম্পর্কে মাত্র একবার টুইট করেছেন ট্রাম্প এবং সেই টুইটে তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতার প্রশংসা করেছিলেন। কিন্তু তার এক মাস পরেই কিম জং উনকে তিনি ‘মেডম্যান’ বা ‘উন্মাদ’ এবং ‘বেটে ও মোটা’ বলে উল্লেখ করেন। আর পরবর্তীতে উনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বাগযুদ্ধে।
এছাড়াও হরহামেশাই টুইটে অন্যের সঙ্গে বাকবিত-ায় জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় ট্রাম্পকে। গত এক বছরে তিনি বিবাদে জড়িয়ে পড়েছেন সাবেক মার্কিন অভিনেতা এবং ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের সাবেক গভর্নর আর্নল্ড সোয়ার্জনেগার, লন্ডনের মেয়র সাদিক খান এমনকি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-র সঙ্গেও।
‘দ্য নিউ সেলিব্রেটি অ্যাপ্রেনটিস’ নামের টেলিভিশনের একটি রিয়ালিটি শো থেকে আর্নল্ড সোয়ার্জনেগার নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার পর থেকেই টুইটারে ট্রাম্পের সঙ্গে তার বাগযুদ্ধ শুরু হয়। ২০০৮ সালে ‘দ্য অ্যাপ্রেনটিস’ নামের ওই শো শুরু করেন ট্রাম্প। এনবিসি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত শোটি গত এক যুগ ধরেই বেশ জনপ্রিয়। শো-য়ের কার্যনির্বাহী প্রযোজক ছাড়াও তার সঞ্চালনায় ছিলেন স্বয়ং ট্রাম্প। তবে রাজনীতির আঙিনায় পা রাখার পর থেকেই সঞ্চালনা ছেড়ে দেন তিনি। সেই ভূমিকায় আসেন হলিউড অভিনেতা ও ক্যালিফোর্নিয়ার সাবেক রিপাবলিকান গভর্নর সোয়ার্জনেগার।
হোয়াইট হাউসে এসেই সোয়ার্জনেগারের পেছনে লাগেন ট্রাম্প। ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ অনুষ্ঠানে মজা করে বলেন, ‘আর্নল্ডের জন্য দোয়া করুন।’ এতেই চটে যান টারমিনেটর তারকা। এক ভিডিও বার্তায় ট্রাম্পকে দায়িত্ব বদলের প্রস্তাব দেন। রেটিং অর্জনে ট্রাম্পের দক্ষতার কথা উল্লেখ করে টিভির দায়িত্ব ট্রাম্পকে নিতে বলেন, আর তার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব তাকে দিতে বলেন সোয়ার্জনেগার। জনপ্রতিনিধি সোয়ার্জনেগার ট্রাম্পের চেয়ে সেই দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করতে পারবে উল্লেখ করে বলেন, এতে মানুষ আবারও শান্তিতে ঘুমাতে পারবে।
এছাড়াও এর জেরে ওই শো থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন সোয়ার্জনেগার। কিন্তু তা নিয়েও টুইটারে তাকে ব্যঙ্গ করতে থাকেন ট্রাম্প। প্রথমে ট্রাম্প বলেন, স্বেচ্ছায় নয়, আসলে সোয়ার্জনেগারকে ওই শো থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ট্রাম্প দাবি করেন, হলিউড অভিনেতার জন্যই নাকি ওই টেলি-শো-য়ের রেটিং পড়ে যাচ্ছিল। এরও জবাব টুইটারে দেন অভিনেতা। ট্রাম্পকে নিজের চরকায় তেল দিতে বলেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে জনপ্রিয় হওয়ার দিকে মনোযোগ দিতে বলেন। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পই সবচেয়ে কম জনপ্রিয়। এর পর থেকেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই দুজনের বাকযুদ্ধ চলে আসছে।
লন্ডনের মেয়র সাদিক খানের সঙ্গেও বাগযুদ্ধে জড়ান ট্রাম্প। গত ৩ জুন লন্ডন ব্রিজ ও বারা মার্কেটে হামলা চালায় জঙ্গিরা। ওই হামলায় অন্তত আটজন নিহত হয়। এ সময় লন্ডনবাসীকে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন মেয়র সাদিক খান। আর এর সমালোচনা করে ট্রাম্প বলেন, লন্ডনের হামলাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি মেয়র। তবে সাদিক খানের সঙ্গেও ট্রাম্পের দ্বন্দ্ব নতুন নয়।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচার চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রস্তাব করেন ট্রাম্প। তবে তিনি এটাও বলেন, লন্ডনের প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে সাদিক খানের ব্যাপারটি ব্যতিক্রম। এতেই চটে যান মেয়র। এর পর থেকেই চলে দুজনের দ্বন্দ্ব। আর সম্ভবত এর জেরেই গত ফেব্রুয়ারিতে লন্ডন সফর বাতিল করেন ট্রাম্প। যদিও জানানো হয়, লন্ডন সফরে ট্রাম্পকে ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে পড়তে হতে পারে এমন আশঙ্কা এবং এই সফরকে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সফরের মর্যাদা দেওয়া হবে না এমন বিবেচনায় সফর বাতিল করেছেন ট্রাম্প।
এমনকি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-র সঙ্গেও বিবাদে জড়িয়ে পড়েন ট্রাম্প। ব্রিটেনের উগ্র ডানপন্থি গোষ্ঠী ‘ব্রিটেন-ফার্স্ট’ এর পোস্ট করা তিনটি মুসিলিম-বিদ্বেষী ভিডিও রি-টুইট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এই পদক্ষেপকে ‘ভুল’ হিসেবে আখ্যা দেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী। কিছুক্ষণের মধ্যেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আবারও টুইট করেন ট্রাম্প। মে-কে তার টুইট নয়, নিজ দেশের সন্ত্রাসবাদের দিকে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন।
টুইটে ট্রাম্প যে কতটা মগ্ন আর কতটা সক্রিয় তা বোঝা যায়, মে-কে উদ্দেশ্য করে দেওয়া তার টুইট থেকেই। প্রথমে ‘থেরেসা মে’ নামের একটি টুইটার একাউন্টকে মেনশন করে টুইট করেন ট্রাম্প। কিন্তু ওই একাউন্টটি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর নয় তা বুঝতে পারেন কিছুক্ষণের মধ্যেই। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা মুছে দিয়ে নতুন করে ‘থেরেসা মে’ নামের সঠিক একাউন্টকে মেনশন করে টুইট পোস্ট করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যেন দেরি হলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে তার!
এসব দেখে বোঝা যাচ্ছে, মেয়াদের বাকি সময়টাও টুইট আর রি-টুইটের মাধ্যমেই প্রেসিডেন্টের কর্মকা- চালিয়ে যাবেন আধুনিক এই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

