পাবনা প্রতিনিধি : অনেক কষ্ট বুকে নিয়ে বেঁচে আছে পাবনার ১১ শহীদ পরিবার। স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও তাদের খোঁজ খবর নেয়নি কেউ। এসব পরিবারের অনেকেই বর্তমানে অন্যের বাড়িতে ঝিঁয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
পাবনা সদর উপজেলার দোগাছি ইউনিয়নের চর আশুতোষপুর গ্রামে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন নির্মম হত্যার শিকার এই ১১ শহীদ পরিবার সরকারি কোনও সুযোগ সুবিধার আওতায় আসেনি আজও।
এলাকাবাসী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা মাঝ নদীতে নিয়ে এই ১১ জনকে একসাথে গুলি করে হত্যা করে ।
প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, বাংলা সনের ৭ আশ্বিন আশুতোষপুর গ্রাম থেকে সকাল ১১টায় ১৩ জন নৌকাযোগে পাবনা শহরতলীর পাশে হাজিরহাটে যায়। এরপর হাটের কাজ শেষে তারা বেলা ৩টার দিকে বাড়ি ফেরার পথে তাদের আটক করে পাক বাহিনী। ওইদিনই রাত ১২টার দিকে তাদের হত্যা করে হাজিরহাটের দক্ষিণে (যেটাকে নদীর কোল বলা হয়) মাঝ নদীতে ফেলে দেয়। এ সময় তাদের সঙ্গে থাকা দুই শিশুকে ছেড়ে দেয় পাক বাহিনী।
পরদিন সকালে এলাকার লোকজন ১১ জনের লাশ উদ্ধার করে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করে। পাক বাহিনীর হাতে ওইদিন নিহতরা হলেন, কফেজ উদ্দিন শেখ, মাহাম শেখ, আজগর আলী শেখ, কুটু খাঁ, কুরান শেখ, কামাল মালিথা, গুলাই শেখ, আমোদ আলী মোল্লা, তাছের ব্যাপারি, নদু সরদার ও হোসেন মন্ডল।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা মকছেদ আলী জানান, ঘটনার দিন শুক্রবার শার্ট গেঞ্জি পরিহিত অবস্থায় প্রতি হাটের দিনের মত তারা ১৩ জন কেনাকাটার জন্য সকালে হাজিরহাটে যান। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আলী আকন্দকে পাবনা হাজিরহাট এলাকায় হত্যা করার জন্য অভিযান চালালে বন্দুকের গুলি না বের হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা এদিক সেদিক চলে যায়। পরে রাজাকার বাহিনী প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের এদিক সেদিক খোঁজাখুঁজি শুরু করে। এই ১১ জনকে মুক্তিযোদ্ধা ভেবে ধরে এনে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে।
শহীদদের মধ্যে ৫ জনের স্ত্রী বর্তমানে বেঁচে আছেন। তারা সবাই বৃদ্ধ বয়সে মানুষের বাড়িতে ঝিঁয়ের কাজ করে দিনযাপন করছেন। এরা হলেন আমোদ আলী শেখের স্ত্রী সুন্দরী বেগম (৮৫), কালাম মালিথার স্ত্রী সাইসুনা খাতুন (৭৮), হোসেন মন্ডলের স্ত্রী খোদেজা খাতুন (৭৯), নদু শেখের স্ত্রী জয়দা খাতুন (৮৫), কুরান শেখের স্ত্রী ছামিরন বেগম (৮৬)।
শহীদ গুলাই ব্যাপারীর মেয়ে জাহানারা আক্তার আবেগজড়িত কন্ঠে বলেন, ‘আমার বাবা হানাদার বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার পর থেকে আজও আমরা মানবেতর জীবন যাপন করছি। আজ পর্যন্ত কোন সরকারি সহযোগিতা পাওয়া তো দুরের কথা, আমাদের খোঁজ খবর পর্যন্ত কেউ নেয়নি।’
একজন শহীদের ছেলে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘দেশের অনেক মুক্তিযোদ্ধার প্রজন্ম মুক্তিযোদ্ধা কোঠায় সরকারি চাকরি পেলেও, আমাদের পরিবারে শিক্ষিত ছেলে-মেয়ে থাকার পরও আমরা তা পাইনি।’
পাবনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার মো: আব্দুল বাতেনকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘সরাসরি যুদ্ধ না করলেও তাদের তো পাকবাহিনী হত্যা করেছে এবং যুদ্ধ চলাকালে তারা নিহত হয়েছেন, সেক্ষেত্রে এমন মানুষদের একটা তালিকা থাকা উচিত এবং নুন্যতম একটা সম্মানী তাদের দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। মুক্তিযুদ্ধের সরকার ইচ্ছা করলে সে ব্যবস্থা করতে পারেন। আমরা বিভিন্ন সভা সমাবেশে এ বিষয়টি সরকারের দৃষ্টিতে আনার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি।’

