ঢাকাFriday , 3 November 2017
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

চাকরিতে তিন লিঙ্গের মানুষের সম্মিলন

Link Copied!

নিজস্ব প্রতিবেদক : না নারী, না পুরুষ। তবে মুখের অবয়ব অনেকটা নারীর মত। শারীরিকভাবে নারী না হলেও বেশভূষায় নারী। আর বেশভূষা নারীর মতো হলেও আচরণে রয়েছে কিছুটা ভিন্নতা ।
জন্মের কয়েক বছর পর থেকে পরিবার-পরিজন আত্মীয়-স্বজন তাদের ভিন্ন চোখে দেখতে শুরু করে। আর সেই থেকে শুরু হয় সমাজের কাছে নেতিবাচক আচরণ পাওয়া। যে কারণে তারা আশ্রয় নেন তাদের কমিউনিটিতে। বন্ধ হয় লোখাপড়া, শুরু হয় আরেক জীবনের নতুন পথে চলা। কেউ ছিনতাইয়ে নেমে পড়েন, কেউ যৌন কর্মী সেজে প্রতারণা শুরু করেন, আবার কেউ চাঁদাবাজি শুরু করেন। পেটের দায়ে তারা এসব খারাপ পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। কারণ, প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষাদীক্ষা কম থাকায় তাদের চাকরির সুযোগ হয় না। তাদের দেখলে চাকরিদাতারা অস্বস্তি বোধ করেন। কেউ চাকরি দিতে চান না।
তবে দিন দিন সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে মন মানসিকতায়ও পরিবর্তন আসছে। কেউ কেউ এগিয়ে আসছেন তাদের জন্য, তাদেরকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে দেখছেন না; দেখছেন মানুষ হিসেবে।
জ্যোৎস্নার (৩২) বাড়ি ফদিরপুরের রাজবাড়িতে। তিনি দীর্ঘদিন থেকে থাকেন রাজধানী ঢাকায়। তার কাজ ছিলো তার কমিউনিটির মানুষের সঙ্গে রাজধানীর গুলশান-বনানী এলাকায় যানবাহন থেকে টাকা তোলা। ৫ টাকা, ১০ টাকা করে তুলতেন। টাকা দিতে না চাইলে অনেকের সঙ্গে জবরদস্তি করতেন, দুর্ব্যবহার করতেন।
শুধু জ্যোৎস্না নন, মুন (২৫), শান্তা (১৮), মুন্নি (৩৫) ও কনা (২৫) এরাও এমন করতেন। কিন্ত গত দুইমাস ধরে আর তারা রাস্তায় মানুষের কাছ থেকে জোর করে টাকা তুলছেন না। দুই মাস আগে থেকে তারা নতুনভাবে বাঁচতে শুরু করেছেন। টাকা তুলে নয়, পরিশ্রম করে জীবিকার পথ ধরেছেন। সেপ্টেম্বরে এই পাঁচ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ নতুন চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। রোদে রাস্তায় নয়, তারা এখন কাজ করছেন শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে।
নতুন চাকরিতে যোগদানের পর অনুভূতি জানাতে গিয়ে মুন জানান, তার বাড়ি ভোলায়। এলাকায় থাকতে না পেরে এবং আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে ১৩ বছর আগে ঢাকায় চলে আসেন। এসে কমিউনিটির সঙ্গে মিলে জ্যোৎস্নার মত টাকা তুলতে শুরু করেন। কিন্তু সেই জীবন ছিলো অনিশ্চয়তা আর অভিশাপের। নতুন চাকরি পেয়ে অনিশ্চয়তা আর অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছেন।
আরেকজন শান্তা (১৮)। তিনি টাকা তুলতেন বিজয় সরণিতে। তারও চাকরি হয়েছে এখানে। তিনি জানান, ৫ টাকা, ১০ টাকা করে তুলতেন। কেউ টাকা দিতে না চাইলে জোর করতেন। দুর্ব্যবহার করতেন। তার জোর জুলুমে অতিষ্ট ছিলো মানুষজন। শান্তা বলেন, ‘এই চাকরি আমাদের জীবনটাই বদলে দিয়েছে। এখন মনে হচ্ছে আমরা মানুষের মত মানুষ হিসেবে বাঁচতে পারছি।’
তারা একদিনে এখানে আসতে পারেননি। কয়েকজনের উদ্যোগ আর চেষ্টায় তারা এ পর্যন্ত এসেছেন। খারাপ এবং অশ্চিয়তার পথ থেকে তাদের ফিরিয়ে আনতে যাদের অবদান রয়েছে তারা হলেন পুলিশের ডিআইজি হাবিবুর রহমান, লুলু-আল-মারজান ও তৃতীয় লিঙ্গের রাখি রাকিব। তারা চাকরি করছেন লুলু আল মারজানের মালিকানাধীন লোগোস নামের প্রতিষ্ঠানে।
লোগোস-এর উদ্যোক্তা এবং প্রধান নির্বাহী লুলু–আল-মারজান জানান, সম্প্রতি তারা পাট দিয়ে রপ্তানিযোগ্য জুতা তৈরি করছেন, যেখানে অন্য নারী পুরুষের সঙ্গে তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের রেসপন্স খুবই ভাল।
তাদের চাকরি দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ওরা ক্যাপাবল বলেই চাকরিতে নেওয়া হয়েছে। কাজ না করে বেতন পাচ্ছে- এমন তো নয়। অন্য নারী পুরুষের পাশাপাশি বেশ যোগ্যতার সঙ্গেই তারা কাজ করছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরো অন্তত ৩০ জনকে চাকরিতে নেওয়ার কথা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এটা পুরোটাই একটা টিমওয়ার্ক। এখানে প্রশিক্ষণ রয়েছেন দিনা মিত্র, শ্বেরতাজ জাহান তিথি, ফারহানা ইয়াসমিন, নাজমুল করিম চৌধুরি। ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন আশিক বড়ুয়া ও নূর আলম। ডিআইজি হাবিব ভাই এবং রাখি আপার সহযোগিতা ছাড়া এই কাজ সম্ভব হতো না।’
লোগোস নামের ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায় সেখানে নারী-পুরুষ এবং তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ একসঙ্গে কাজ করছেন। তারা সবাই খুবই আন্তরিক। তিন লিঙ্গের মানুষের সম্মিলনের নেপথ্যে রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান।
তৃতীয় লিঙ্গের ওই পাঁচ জনের সহকর্মী হিসেবে অভিমত জানতে গিয়ে নাজমুল করিম চৌধুরি বলেন, ‘যখন আপু জানান, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের সঙ্গে কাজ করতে হবে, শুনে প্রথমে একটু ধাক্কাই খেয়েছি। কাজ শুরু করার পরে সেই ধারণা পাল্টে গেছে। আসলে তারা যথেষ্ট কো-অপারেটিভ। ২০ দিনের প্রশিক্ষণে চমৎকার রেসপন্স পাওয়া গেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে আরো বেশি।’
আশিক বড়ুয়া বলেন, ‘তাদের সঙ্গে কাজ করতে ভাল লাগছে। তাদের জন্য সকলের এগিয়ে আসা উচিত। তাদের অবস্থার উন্নতি হলে দেশেরও উন্নতি হবে।’
নূর আলম বলেন, ‘কাউকে না কাউকে তো ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। দুই মাস তাদের সঙ্গে কাজ করে মনে হয়েছে তারা খুবই ইতিবাচক।’
লুলু-আল-মারজান বলেন, ‘রাখি আপার চেষ্টায় আজ তারা চাকরি পেয়েছে। আমার সঙ্গে ২০১০ সালে তার দেখা হয়। তখন থেকেই তিনি চেষ্টা করে আসছেন। আমার মনে হয় এতে রাখি আপার ব্যক্তিগত কোন লাভ নেই। তিনি নিঃস্বার্থভাবে তৃতীয় লিঙ্গের জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।’
রাখি রাকিব বলেন, ‘আমি ২০১০ সাল থেকে এই অবহেলিত কমিউনিটির জন্য ভাল কিছু করার চেষ্টা করে আসছি। সফলতা পেলাম ২০১৭ সালে এসে। এজন্য ডিআইজি হাবিবুর রহমান স্যার ও মারজান আপার অনেক ভুমিকার রয়েছে। তাদের ধন্যবাদ জানাই। তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। তারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে না দিলে এদের চাকরি হতো না। তাদের মত যদি সমাজের অনেকে এগিয়ে আসতেন তাহলে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের অভিশপ্তের মত জীবনযাপন করতে হতো না।’ এই কমিউনিটির উন্নতির জন্য ডিআইজি হাবিবুর রহমানের উদ্যোগে আরো কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করার কথাও জানান রাখি।