নিউজ ডেস্ক : বসতবাড়িভিত্তিক সোলার হোম সিস্টেমে বাংলাদেশ হচ্ছে বিশ্বে পথপ্রদর্শক। এক্ষেত্রে সরকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু গ্রিডভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে সরকার। এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বেশির ভাগ প্রকল্পের কাজ এখনও শুরুই হয়নি। দরপত্র, চুক্তি আর দরকষাকষিতেই ঘুরপাক খাচ্ছে প্রকল্পগুলো।
সৌরশক্তি থেকে ২০১৬ সালে ২৫৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল বিদ্যুৎ বিভাগ। কিন্তু ওই বছর এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎও উৎপাদনে আসেনি। ২০১৭ সালে ১৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও এ পর্যন্ত মাত্র তিন মেগাওয়াট বিদ্যুৎ গ্রিডে সংযুক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা দেশের প্রথম গ্রিডভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রিডভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর ধীর গতির অন্যতম কারণ জমির অপ্রতুলতা। এছাড়া, জমি অধিগ্রহণে সরকারি অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণেও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এগুচ্ছে না।
সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাস্টার প্ল্যান অনুসারে ২০২১ সালে এক হাজার ৪০৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ২০০ মেগাওয়াট, ২০১৯ সালে ১৮০, ২০২০ সালে ১৯০ ও ২০২১ সালে ১৯৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদেনের কথা রয়েছে। এজন্য সরকার ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রায় অর্ধশতাধিক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ২০১১ সালের পর এ পর্যন্ত প্রায় ডজনখানেক কোম্পানিকে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বেশির ভাগ প্রকল্পের কাজ এখনও শুরু হয়নি। অনেক উদ্যোক্তা চুক্তি করলেও পরবর্তীতে সরে গেছে। যেমন ময়মনসিংহের ফুলপুরে দেশের প্রথম গ্রিডভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।১৮ মেগাওয়াটের এই কেন্দ্রের জন্য ২০১১ সালের ডিসেম্বরে একটি বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। পরে উদ্যোক্তা কোম্পানি প্রকল্প থেকে সরে যায়। এভাবে বিভিন্ন কারণে বেশির ভাগ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পই আলোর মুখ দেখেনি।
শেষ অব্দি চলতি বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর দেশের প্রথম সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প উৎপাদনে আসে। জামালপুরের সরিষাবাড়ীর ‘এনগ্রিন সরিষাবাড়ী সোলার প্ল্যান্ট লিমিটেডের এ প্রকল্প থেকে তিন মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি সাড়ে সাত মেগাওয়াটের একটি প্রকল্পের ঠিকাদার চূড়ান্ত করলেও জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় কার্যাদেশ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। একই সংস্থার ১০০ মেগাওয়াটের আরেকটি প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব ফরিদপুর জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় পিডিবির ৬০ মেগাওয়াটের প্রকল্পটিও ভূমি জটিলতায় আটকে আছে। এভাবে সরকারের পরিকল্পনার অধিকাংশ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বিভিন্ন কারণে ঝুলে রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সূত্র জানায়, এক মেগাওয়াট সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য চার একর জমি প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ১০০ মেগাওয়াটের জন্য ৪০০ একর জমির প্রয়োজন। বাংলাদেশের মতো জনবহুল ও কৃষি প্রধান দেশে এই বিপুল পরিমাণ জমির বন্দোবস্ত করাই বড় চ্যালেঞ্জ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবার অনেক সময় জমি পেলেও তা অধিগ্রহণে ভোগান্তি পোহাতে হয়। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৫০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এর আগে সংশ্লিষ্ট উপজেলা ভূমি অফিস, জেলা প্রশাসন এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের আগে তিনটি ধাপ পার হতে কোম্পানিগুলোকে বড় ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ কারণে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ কমে যায়।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সদস্য সিদ্দিক জোবায়ের বলেন, মূলত দুটি কারণে গ্রিডভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর কাজ এগাচ্ছো না। একটি কারণ হলো- এগুলো করতে প্রচুর জায়গার প্রয়োজন হয়। একসঙ্গে অনেক জায়গা পাওয়া যায় না। আবার একসঙ্গে জায়গা পাওয়া গেলেও দেখা যায়, একটি জায়গার অনেক মালিক। সবাইকে কনভিন্স করতে অনেক সময় লোগে। অন্যদিকে, জায়গা না পাওয়ার কারণে ব্যাংকগুলো বিনিয়োগ করতে চায় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে একটি প্রকল্প থেকে তিন মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে জাতীয় গ্রিডে। কক্সবাজারে ২০ মেগাওয়াট ও ময়মনসিংহে ৫০ মেগাওয়াটের দুটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতার কাজ চলছে।’
দেশে সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি ইনস্টিটিউট। এই ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল হক বলেন, মোটা দাগে সৌরবিদ্যুতের বড় প্রকল্পের জন্য তিনটি সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি বাংলাদেশে নতুন। এটি করতে হলে প্রচুর জমির প্রয়োজন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যারা প্ল্যান জমা দিয়েছে, তাদের জমি ছিল না। তারা বিভিন্নভাবে জমি লিজ নিয়ে পরিকল্পনাগুলো জমা দিয়েছে।’
দ্বিতীয়ত, প্রকল্পগুলো সরকারিভাবে বিতরণেও অনিয়ম দেখা গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজ পেলেও একাজে তাদের কোনও অভিজ্ঞতা নেই। আবার রাজনৈতিক বিবেচনায়ও কাজ পেয়েছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান প্রকল্পগুলো আদৌ বাস্তবায়ন করবে কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ জনপ্রিয় না হওয়ার আরেকটি বড় কারণ এর বেশি দাম। সম্প্রতি চুক্তি হওয়া সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম ধরা হয়েছে গড়ে ১৫ টাকা। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রতি ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে সর্বোচ্চ সাড়ে পাঁচ রুপি বা ছয় টাকা ৮৪ পয়সা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) স্টাডি অন এনার্জি সিকিউরিটি শীর্ষক গবেষণা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত ছয়টি কোম্পানির সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, ময়মনসিংহের সুতিয়াখালীতে ৫০ মেগাওয়াট, হাওর বাংলা-কোরিয়া গ্রিন এনার্জি সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় ৩২ মেগাওয়াট, ইন্ট্রাকো গ্রুপ রংপুরের গঙ্গাচড়ায় ৩০ মেগাওয়াট, কাপ্তাইয়ে পিডিবির ৭ মেগাওয়াট অন্যতম।
গ্রিডভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ বিভাগের শাখা পাওয়ার সেলের মহাপরিচালক মোহাম্মদ হোসাইন বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন আমাদের জন্য নতুন। সঙ্গত কারণে একটু দেরি হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, ‘জমিসংক্রান্ত জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’ এসব সমস্যা সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
গ্রিডভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক না হলেও নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক ছোট ছোট কিছু সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প আলোর মুখ দেখেছে। স্রেডার সূত্রে জানা গেছে, সরকার-বেসরকারি খাতে ২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সোলার মিনি গ্রিড স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে সোলার মিনি গ্রিডের জন্য ৩০টি দূরবর্তী এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে আগামী ১৫-২০ বছরের মধ্যে পিডিবির জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণের কোনও পরিকল্পনা নাই। এখন পর্যন্ত ১১টি সোলার মিনি গ্রিড স্থাপন করা হয়েছে, যাদের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ২ দশমিক ১৯ মেগাওয়াট। এছাড়া, আরও ১৫টি সোলার মিনি গ্রিড প্রকল্প স্থাপনের কাজ চলছে, যাদের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা ৩ দশমিক ১৭ মেগাওয়াট। ভবিষ্যতে এ ধরনের আরও ৬১টি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
এছাড়া, সুনামগঞ্জের শাল্লাতে পিডিবি ৬৫০ মেগাওয়াট পিক ক্ষমতার একটি সোলার মিনি গ্রিড স্থাপন করেছে। এই কেন্দ্রটি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সব চেয়ে বড় সোলার মিনি গ্রিড হবে বলে দাবি করছে স্রেডা কর্তৃপক্ষ।

