নিজস্ব প্রতিবেদক : চলে গেলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাক। সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ১৩মিনিটে তিনি রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। তিনি বেশ কিছুদিন ধরে নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন।
চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার ও ইউনাইটেড হাসপাতালের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস কর্মকর্তা সাজ্জাদুর রহমান শুভ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সাজ্জাদুর রহমান জানান, নায়ক রাজ্জাককে আজ বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে তার পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে নিয়ে আসেন। সে সময় তার পালস পাওয়া যাচ্ছিল না। চিকিৎসকেরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলেন। সন্ধ্যা ৬টা ১৩ মিনিটে আমরা নিশ্চিত হই তিনি আর নেই।
নায়করাজ রাজ্জাকের প্রকৃত নাম আব্দুর রাজ্জাক। তিনি ১৯৪২ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার টালিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই রাজ্জাক অভিনয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৬৪ সালে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন। তখন রাজ্জাক তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে ‘ঘরোয়া’ নামের ধারাবাহিক নাটকে অভিনয় করে দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হন।
এরপর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি পরিচালক আব্দুল জব্বার খানের সহযোগিতায় ইকবাল ফিল্মসে কাজ করার সুযোগ পান। পরে পরিচালক কামাল আহমেদের সহকারী হিসেবে ‘উজালা’ ছবিতে কাজ করেন। সালাউদ্দিন প্রোডাকশন্সের ‘তেরো নাম্বার ফেকু ওস্তাগার লেন’ চলচ্চিত্রে ছোট একটি চরিত্রে অভিনয় করে সবার কাছে নিজ মেধার পরিচয় দেন রাজ্জাক। পরবর্তীতে ’কার বউ’, ‘ডাক বাবু’, ‘আখেরী স্টেশন’সহ কয়েকটি ছবিতে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করে তিনি।
১৯৬৫ সালে প্রয়াত জহির রায়হান তাঁকে প্রথম ‘বেহুলা’ চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে কাস্ট করেন। এতে তাঁর বিপরীতে নায়িকা হিসেবে ছিলেন সুচন্দা। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি রাজ্জাককে। তাঁর অভিনীত ছবিগুলো বেশ দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করে। দর্শকের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে তিনি নায়করাজ হিসেবে পরিচিতি পান।
তার অভিনীত জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘ময়নামতি’, ‘মধু মিলন’, ‘পীচ ঢালা পথ’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘কী যে করি’, ‘ আলোর মিছিল’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘বাদী থেকে বেগম’, ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘এতটুকু আশা’, ‘নাচের পুতুল’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘অবুঝ মন’, ‘গুন্ডা’, ‘রংবাজ’, ‘আগুন’, ‘অশিক্ষিত’, ‘মাটির ঘর’, ‘ছুটির ঘণ্টা’, ‘বেঈমান’, ‘মহানগর’, ‘চন্দ্রনাথ’, ‘অভিযান’, ‘অনুরাগ’, ‘রাজা সাহেব’, ‘গাঁয়ের ছেলে’, ‘বেঈমান’, ‘আনারকলি’, ‘কালো গোলাপ’, ‘বদনাম’, ‘শুভদা’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘ঘর সংসার’, ‘যোগাযোগ’, ‘বড় ভাল লোক ছিল’, ‘বাবা কেন চাকর’ ইত্যাদি।
রাজ্জাক প্রায় ৩০০টি বাংলা ও উর্দু চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। নায়করাজ শুধু নায়ক হিসেবেই নয়, অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজক ও পরিচালক হিসেবেও চলচ্চিত্র অঙ্গনে সফল ছিলেন রাজ্জাক। তার প্রযোজনা সংস্থার নাম রাজলক্ষী প্রোডাকশন। পরিচালনা করেছেন প্রায় ১৬টি চলচ্চিত্র। সর্বশেষ তিনি ‘আয়না কাহিনী’ ছবিটি নির্মাণ করেছেন। চলচ্চিত্রের বাইরে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের শুভেচ্ছাদূত হিসেবে কাজ করেছেন নায়করাজ রাজ্জাক।
নায়ক রাজ্জাক প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন ‘কি যে করি’ ছবিতে অভিনয় করে। এরপর আরও চারবার তিনি জাতীয় সম্মাননা পান। ২০১১ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয় তাঁকে। এছাড়া বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার পেয়েছেন বেশ কয়েকবার।
রাজ্জাক পাঁচ সন্তানের জনক। তারা হলেন- রেজাউল করিম ওরফে বাপ্পারাজ, নাসরিন পাশা শম্পা, রওশন হোসাইন বাপ্পি, আফরিন আলম ময়না ও খালিদ হোসাইন ওরফে সম্রাট। এদের মধ্যে বাপ্পারাজ ও সম্রাট বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলচ্চিত্রে নাম লিখিয়েছেন।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এই কিংবদন্তি অভিনেতার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও বিশিষ্ট ব্যক্তি।
রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. জয়নাল আবেদীন জানান, সোমবার সন্ধ্যায় এক শোকবার্তায় রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শকপ্রিয়তা অর্জনে নায়করাজ রাজ্জাকের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাঙালি সংস্কৃতি চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তার অবদান প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম স্মরণ করবে।’
রাষ্ট্রপতি রাজ্জাকের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রজগতে রাজ্জাকের অবদানের কথা স্মরণ করে শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তার মৃত্যু দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য একটি অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র।’
শেখ হাসিনা নায়করাজের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।
নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুতে আরো শোক প্রকাশ করেছেন- জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ, অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম প্রমুখ।
এদিকে নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী।
তারা পৃথক পৃথক শোকবাণীতে বাংলা চলচ্চিত্রে রাজ্জাকের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। তারা বলেন, তার মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্রাঙ্গনের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তারা মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও কিংবদন্তি অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
সোমবার সন্ধ্যায় বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির খান এ তথ্য জানান।
শায়রুল কবির খান জানান, লন্ডনে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়করাজের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনাও জানান খালেদা জিয়া।
এছাড়া রাজ্জাকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

