আন্তর্জাতিক ডেস্ক : চলমান ক্রমাগত সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো একটি নতুন সংবিধান প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছেন। এর জন্য নাগরিকদের নিয়ে একটি সংসদ তৈরি করার ঘোষণাও দেন তিনি।
মে দিবসের এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে মাদুরো বলেন, নিজের সাংবিধানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তিনি একটি নতুন নির্বাচকমন্ডলীর সংসদ গঠন করবেন। পরে এই মর্মে একটি ফরমানও জারি করেন তিনি। সমাবেশে উপস্থিত হাজারো সমর্থকের উদ্দেশ্যে মাদুরো বলেন, নতুন সংবিধান দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনবে এবং বিরোধীদের অভ্যুত্থান সৃষ্টি করতে দেবে না।
ভেনেজুয়েলার বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, ‘ভেনেজুয়েলার জনগণ’ প্রয়োজনে একটি নির্বাচকমন্ডলীর সংসদ সৃষ্টি করতে পারে, রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিবর্তন, নতুন আইনি কাঠামো তৈরি ও নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য। মাদুরো দাবি করেন, ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বার্থেই তিনি তার সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন।
মাদুরো বলছেন, বিরোধীরা তার নির্বাচিত সরকারকে অসাংবিধানিকভাবে উৎখাতের ষড়যন্ত্র করছে। তিনি দাবি করেন, দেশটির অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণ তার বিরুদ্ধে সৃষ্ট ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’। নতুন সংবিধান বিরোধীদের ও ষড়যন্ত্রকারীদের ব্যর্থ করে দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনবে বলে তিনি আশাবাদ প্রকাশ করেন। সমর্থকদের উদ্দেশ্যে মাদুরো বলেন, ‘আমি গৃহযুদ্ধ চাই না’, ।
রোধীরা অবশ্য তার এই পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করছে। তারা বলছে, এর মাধ্যমে মাদুরো নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চাইছেন। তারা আরো বলছে, এতে এ বছর অনুষ্ঠিতব্য আঞ্চলিক নির্বাচন বা আগামী বছর হতে যাওয়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচন স্বভাবতই পিছিয়ে যাবে।
বিরোধীরা দাবি করেন, মাদুরো বিরোধী সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয় সংসদের ক্ষমতা খর্ব করছেন। নির্বাচকমন্ডলীর এই নতুন সংসদ বিরোধী-নিয়ন্ত্রিত জাতীয় সংসদকে পঙ্গু করে দেবে বলেই তাদের আশঙ্কা।
জাতীয় সংসদের প্রধান হুলিও বোর্হেস বলেন, এই চাল ভেনেজুয়েলার মানুষের সঙ্গে প্রতারণা। এটি ভেনেজুয়েলার অভ্যুত্থানকে দাবিয়ে রাখার পাঁয়তারা মাত্র। মাদুরোই দেশটির গণতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্র বিনষ্ট করতে চলেছেন। ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন যাবত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। গত ৪ সপ্তাহ ধরে নিয়মিত প্রতিবাদ সমাবেশ চলছে দেশটিতে। প্রতিবাদকারীরা দেশটির সংকটের জন্য দায়ী করছেন মাদুরোকেই। তারা মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়াতে বলছেন।
এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত বিক্ষোভ-সমাবেশে সহিংসতার প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৩০ জন। চলমান বিক্ষোভের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ‘অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস’-এর মতো আঞ্চলিক সংগঠনের তোপের মুখেও পড়েছেন মাদুরো। তবু বিরোধীদের দাবি অনুযায়ী, আগাম নির্বাচন দিতে নারাজ তিনি।
মাদুরো বিরোধীরা বলছেন, তিনি স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছেন। নিজের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে চাচ্ছেন। সমালোচকরা বলছেন, ‘জনতার সংসদ’ দেশটির সবার প্রতিনিধিত্বশীল হবে না। আর এটি কীভাবে গঠিত হবে তাও নিশ্চিত নয়। মাদুরোর দাবি, ৫০০ সদস্যের ‘জনগণের সংসদ’ মানুষের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে। শুধু শ্রমজীবীরাই এর সদস্য হবেন। পাশাপাশি নারী, আদিবাসী ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এতে অংশ নিতে পারবেন। কোন রাজনৈতিক দল এর অংশ হবে না।
সংসদের ২০০ থেকে ২৫০ সদস্য নির্বাচন করবে শ্রমিক সম্প্রদায়। যদিও তা কীভাবে হবে তা জানাননি মাদুরো। বাকিরা পৌরসভা পর্যায়ে সরাসরি গোপন ভোটে নির্বাচিত হবেন। মাদুরোর সমাজতান্ত্রিক দলের সমর্থক প্রধানত দরিদ্র জনগোষ্ঠী। তার ও পূর্বসূরি হুগো শাভেজের আমলে নেওয়া সামাজিক কর্মসূচির ফলে সমাজের নিচু তলার মানুষই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে।
নতুন সংবিধানের জন্য মাদুরোর প্রচেষ্টা একটু বিস্ময়কর। তার প্রয়াত রাজনৈতিক গুরু সাবেক প্রেসিডেন্ট শাভেজের আমলে রচিত ও গৃহীত হয় বর্তমান সংবিধান। তৎকালীন সংসদ রচিত এই সংবিধানটি বিপুল গণভোটে স্বীকৃত হয়। বিরোধীদের মতো মাদুরো নিজেও সংবিধানকে নিজের অবস্থানের সমর্থনে বারবার ব্যবহার করেছেন।
মাদুরো ঘোষণায় বিরোধী দল তাদের আন্দোলন আরো বেগবান করেছে। নতুন প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করছেন তারা। ‘রাস্তার সংগ্রামী জনতা! এই পাগলামি রুখে দাও!’ বিরোধী নেতা এনরিক ক্যাপ্রিলেস টুইট করেছেন। তিনি দাবি করেন, ‘এটি সাংবিধানিক জালিয়াতি’।
বিরোধী নেতারা বুধবার ‘মহা প্রতিবাদ’ সমাবেশের ডাক দিয়েছেন।

