পঞ্চগড় প্রতিনিধি : আজ (১ আগস্ট) ঐতিহাসিক ছিটমহল বিনিময়ের দিন। গত বছর এই দিনে বিলুপ্ত ছিটমহলের হাজার হাজার বাসিন্দা ৬৮ বছরের বন্দি জীবন থেকে মুক্তি লাভ করে। ওই দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে তারা মঙ্গলদীপ ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে। এবারো ছিটমহলবাসিদের মুক্তির দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিলুপ্ত ছিটমহলের নতুন বাংলাদেশিরা।
কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে বিলুপ্ত ছিটমহলের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছিটমহল আন্দোলনে শহীদ নেতাদের স্মরণে শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আনন্দ মিছিল ও খেলাধুলা।
ছিটমহল বিনিময়ের এক বছর পূর্তি হয়েছে। পতাকা উঠানো হয়েছে বিলুপ্ত ছিটমহলের মাটিতে। বলদে গেছে পঞ্চগড়ের ৩৬টি ছিটমহলের চিত্র। পুরানো নাম বদলে নতুন নামও দেয়া হয়েছে কিছু ছিটমহলের। পুটিমারী ছিটমহল এখন বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম নগর এবং গাড়াতি ছিটমহলের নাম দেয়া হয়েছে রাজমহল। ব্যক্তি থেকে প্রতিষ্ঠান সমকিছুতেই সরকারের উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। মৌলিক অধিকারের স্বাদ পেয়েছে বিলুপ্ত ছিটমহলের হাজারো নতুন বাংলাদেশি। বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত পঞ্চগড়ের ৩৬টি ছিটমহলের নতুন বাংলাদেশিদের ঘর। স্যানিটেশন ব্যবস্থা, সেলাই মেশিন, টিউবওয়েলসহ সরকারি নানা সহায়তা পেয়েছে নতুন বাংলাদেশিরা।
স্বাস্থ্য সেবাও দেয়া হচ্ছে নিয়মিত। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার আজও উন্নয়ন হয়নি। ব্রিজ, কালভার্ট ও সড়ক উন্নয়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এখনো কাজ শুরু করতে পারেনি। এ জন্য সংশ্লিষ্টরা অবশ্য বর্ষা মৌসুমকেই দায়ী করছেন।
এছাড়াও পঞ্চগড়ের ৩৬টি ছিটমহলে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে নির্মিত প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা ও কলেজসহ ৩২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মাত্র প্রাথমিকসহ ৬টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পাঠ দানের অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু বাকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠদান শুরু হলেও এখনো সেগুলোতে অনুমতি দেয়া হয়নি। ফলে বিপাকে পড়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর এ বিরাট অংশের শিশুরা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, যৌথ জনগণনা মতে পঞ্চগড়ের ৩৬টি ছিটমহলে বর্তমানে ১৯ হাজার ৮৭২ জন মানুষ বসবাস করছে। ছিটমহলগুলো বিনিময়ের পর সরকার গুরুত্বের সাথে বিলুপ্ত ছিটমহলের উন্নয়নের জন্য সকল দপ্তরকে নির্দেশ দেয়। তারই পরিপেক্ষিতে পঞ্চগড়ের বিলুপ্ত ছিটমহলের ৮ হাজার ৫০০ বাসিন্দার বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া হয়েছে। অনুমোদিত ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে মসজিদ, মন্দির, রাস্তা-ঘাট সংস্কারের কাজ চলছে।
তবে প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে কিছু অনিয়মেরও অভিযোগ উঠেছে বিলুপ্ত ছিটমহলের নেতাদের বিরুদ্ধে। দরিদ্র বাসিন্দাদের উপেক্ষা করে নেতারা নিজের স্বজনদের নামে সরকারি উপকরণ বরাদ্দ দিয়েছেন। এমনকি প্রশাসন কিছু না জানলেও বিলুপ্ত ছিটমহলে প্রাথমিকসহ ৩২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে তারা টাকার বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে নতুন বাংলাদেশিরা।
এরই মধ্যে বিলুপ্ত ছিটমহলে নতুন আরেক সমস্যা দেখা দিয়েছে। ২০১১ সালে হেডকাউন্টিংয়ের সময় যেসব ছিটমহলবাসী কাজের জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করেছিলেন এবং যারা ভারত যাওয়ার ফরম পূরণ করে ভারতে যায়নি এমন সহস্রাধিক বাসিন্দা এখনও পরিচয়হীনভাবেই বসবাস করছেন বিলুপ্ত ছিটমহলে। তারা না পারছে বাংলাদেশের ভোটার হতে আর না পারছে বিলুপ্ত ছিটমহলের অধিবাসী হিসেবে নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করতে। ছিটমহল বিনিময়ের এক বছর পূর্তির বিজয় উৎসবে তাই নিরাশ এসব বাসিন্দারা।
পঞ্চগড় গাড়াতি ছিটমহলের বাসিন্দা চাঁনমিয়া বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশি হিসেবে এক বছরে আমরা দীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনার কথা ভুলে গেছি। তবে সরকারে উন্নয়ন কার্যক্রম আরো তরান্বিত করা এবং যারা অনিয়ম করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।’
নাজিরগঞ্জ দৈখাতা ছিটমহলের রাজেন্দ্র নাথ (৬৫) জানান, তার জন্ম ছিটমহলে। জমিজমা সব ছিটমহলের ভেতরেই রয়েছে। ভারত যাওয়ার জন্য ফরম পূরণ করে না যাওয়ায় তার পরিবারের ৪ সদস্য এখন পরিচয়হীন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘জীবনটা ছিটমহলেই শেষ করে দিলাম। এখনও আমার কোনো পরিচয় নেই।’
নাগরিক অধিকার সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ ইউনিটের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মফিজার রহমান বলেন, ‘ছিটমহল চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই। তার চেষ্টার ফলেই আজ আমরা স্বাধীন। গত এক বছরে বিলুপ্ত ছিটমহলে দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়েছে। তবে ছিটমহলে স্থাপিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জরুরিভাবে পাঠদানে অনুমতি প্রয়োজন। আর তা না হলে পাঠদানে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটবে। একই সাথে যারা এখনো পরিচয়হীনভাবে আছে তাদের বাংলাদেশি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’
পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক অমল কৃষ্ণ মণ্ডল জানান, পঞ্চগড়ের অভ্যন্তরে বিলুপ্ত ৩৬টি ছিটমহলের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে মসজিদ, মন্দির নির্মাণ ও রাস্তা-ঘাট নির্মাণ ও সংস্কারের কাজ অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে বিলুপ্ত ছিটমহলের বাসিন্দাদের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এখনো যেসব কাজ বাকি রয়েছে তা দ্রুত শেষ করা হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
উল্লেখ্য, দেশের সর্ব উত্তরের প্রান্তিক ও তিন দিক থেকে ভারত বেষ্টিত জেলা পঞ্চগড়ে রয়েছে ৩৬টি ছিটমহল। পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলা, বোদা, দেবীগঞ্জ তিন উপজেলায় গাড়াতি, শিংগীমারী, নাটকটোকা, বেহুলাডাংগা, বালাপাড়া খাসবাড়ি, কোট ভাজনি, দহলা খাগড়াবাড়ি, কাজলদিঘি, পুটিমারী, নাজিরগঞ্জ, দৈখাতা ও শালবাড়িসহ ছোট বড় ৩৬টি ছিটমহল রয়েছে।
গত বছরের ৬ জুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঐতিহাসিক ছিটমহল চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। যা ৩১ জুলাই মধ্যরাতে বিনিময় করা হয়। বর্তমান পঞ্চগড়ের অভ্যন্তরে ৩৬টি ছিটমহলের জনসংখ্যা ১৯ হাজার ৮৭২ জন। এছাড়াও ইচ্ছে মতো দেশ বেছে নেয়ার সময় পঞ্চগড়ের ৩৬টি ছিটমহল থেকে গত বছরের নভেম্বরে ভারতে যায় ৪৭৮ জন বাসিন্দা।

