ভোলা প্রতিনিধি : জেলার চরফ্যাসনের মেঘনা নদীতে ভরা মৌসুমেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে জেলেরা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নদীতে জাল ফেলেও দুই বেলা ভাত ও সপ্তাহ শেষে এনজিওর কিস্তির টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
দিনের পর দিন ইলিশ শূন্য থাকায় হতাশাগ্রস্ত চরফ্যাসনের জেলে পাড়ার ৪০ হাজার জেলে ঘাটে বসেই বেকার সময় কাটাচ্ছে। দাদনের বোঝা ভারী হয়ে ওঠায় চৌদ্দ পুরুষের পেশা ছেড়ে পালিয়ে গেছে প্রায় ১০ হাজার জেলে। দাদনভুক্ত জেলেরা পালিয়ে যাওয়ায় আড়ৎ মালিকদের সহস্রাধিক ট্রলার ঘাটে পড়ে আছে। ফলে চরফ্যাশন উপকূলের মাছঘাটের ট্রলার এবং জেলেদের কেন্দ্র করে প্রায় ৭শ কোটি টাকার বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আড়ৎ মালিক, কেরিংপার্টি আর শহরকেন্দ্রীক মহাজনরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।
উপজেলার আছলামপুর ইউনিয়নের জেলে হারিছ মিয়াসহ মেঘনা-তেঁতুলিয়ার শতাধিক জেলে জানান, জেলেরা প্রভাবশালী আড়ৎ মালিকদের কারণে বাধ্য হয়ে বছরের অধিকাংশ সময় বেহুন্দি জাল, পাই জাল, চাই, পিটানো জাল, ধরা জাল, মশারি জাল, চর ঘেরা জাল, কারেন্ট জালসহ অবৈধ জাল দিয়ে জাটকা ও রেণুপোনা ধরেছেন। এ জন্য নদীতে এখন মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া গভীর নদীতে ঢেউ ও স্রোত কমে গেছে। এ কারণে মাছ দৌঁড়াতে পারছে না। অধিক জাল, ট্রলার, যত্রতত্র ডুবোচর ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে ভরা বর্ষায়ও ইলিশ নদীতে আসছে না।
ঢালচর ঘাটের খলিল মাঝি জানান, গত সোমবার ১৪ জন স্টাফসহ ট্রলার নিয়ে নিকট সমুদ্রে গেছেন। প্রায় ২৪ ঘণ্টা সমুদ্রে থেকে একশ লিটার ডিজেল এবং স্টাফদের খাওয়া খরচসহ প্রায় ১০ হাজার টাকা ট্রিপ খরচ হয়েছে। কিন্তু মাছ পেয়েছেন ৭টি। বিক্রি হয়েছে ১৩০০ টাকা।
ঢালচর ঘাটের বিসমিল্লাহ ফিসের কেরানী নুর-ই-আলম জানান, গতকাল মঙ্গলবার তার আড়তের দাদনভুক্ত মাত্র ২টি ট্রলার নদীতে গেছে। প্রায় ২০ হাজার টাকার ট্রিপ খরচ হলেও মাছ মিলেছে মাত্র ৭ হাজার ৩০০ টাকার। লোকসানের পর লোকসান অব্যাহত থাকায় আড়তের ৬০টি ট্রলারের প্রায় সাড়ে ৭শ জেলে অলস সময় কাটাচ্ছে। এসব জেলেদের কাছে আড়তের দাদনের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা।
চরফ্যাশন উপকূলে ঢালচর, সামরাজ, খাজুর গাছিয়া, বেড়িভাঙ্গা, কাঙ্গালী, তিলখালী, বেতুয়া, পাতিলা, মনুরা, ডাকাতিয়া, বকসী, কচ্চপিয়াসহ ছোট বড় ঘাটগুলোতে ইলিশের এই মৌসুমে ৩০ থেকে ৪০ হাজার জেলে রয়েছে। মৌসুমের শুরু থেকে আজ পযর্ন্ত একটানা ইলিশ শূন্যতার কারণে হতাশ জেলেরা এখন ঘাটে বসেই অলস সময় কাটাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী সমিতির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম মাঝি জানান, অবৈধজালে জাটকা ও পোনা নিধন করায় এখন জেলেরা মাছ পাচ্ছেন না। এছাড়া জেলার বাকি ৬ উপজেলায় লক্ষাধিক জেলে পরিবার ঋণে জর্জরিত। ভরা মৌসুমে তারা মাছ না পাওয়ায় অনাহারে-অর্ধাহারে আছেন।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির ভোলা সদর শাখার সভাপতি এরশাদ আলী জানান, প্রভাবশালী আড়তদাররা জেলেদের জাটকা-রেণুপোনা ধরতে বাধ্য করছেন। ওই সব আড়তদারকে আইনের আওতায় আনতে হবে। রেণুপোনা ও জাটকা না ধরলে ভোলা থেকে বর্তমানের কয়েক গুণ মাছ বেশি আহরণ হতো।
ভোলা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, জাটকা সংরক্ষণে ভোলায় ১ লাখ ১৭ হাজার জেলের মধ্যে ৫৫ হাজার জেলেকে ১৬০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে সব জেলেকে চাল দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে। এর পরেও জেলেরা জাটকাসহ পোনা ধ্বংস করছেন। এ কারণে বড় ইলিশ পাচ্ছেন না।
চাঁদপুর ইলিশ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ‘শুধু ভোলা নয়, বিভিন্ন জেলা থেকে খবর পেয়েছি, নদীতে ইলিশসহ সব মাছেরই আকাল। জুলাই-আগস্ট ইলিশের মৌসুম হলেও ভরা মৌসুম সেপ্টেম্বর-অক্টোবর। আশার কথা হচ্ছে, নদীতে মাছ আসবে। তবে এ জন্য পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও ঢেউ দরকার।’

