বিনোদন ডেস্ক : নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে দেশিয় চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার অনুপ্রবেশ ঘটে। দীর্ঘ আন্দোলন আর প্রতিরোধের মুখে তা এক সময় বিলীন হলেও, বিকল্প হিসেবে চালু হয় ‘আইটেম গান’ সংস্কৃতি। কিন্তু কয়েক বছর যেতে না যেতেই সেখানেও পড়েছে টান। ফলাফল হিসেবে গেল বছরের শেষ দিক থেকে কমতে থাকে চলচ্চিত্রের বিশেষ ধারার এ গানের কাটতি।
অবস্থাটা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তারকা বহুল ছবিতে এখন আর সেভাবে আইটেম গানের উপস্থিতি নেই। ফলে আইটেম কন্যারাও অনেকটা লাপাত্তা। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজেট ঘাটতি, মানহীন চিত্রায়ণ ও দর্শকদের অনাগ্রহের কারণেই চলচ্চিত্রের বিশেষ এ ধারাটি সংকটের মুখোমুখি।
২০০৭ সালে অনেকটা বলিউডের আদলে বাংলা চলচ্চিত্রে সংযোজিত হয় আইটেম গান। যেখানে আইটেম কন্যার সংক্ষিপ্ত পোশাক, বিভিন্ন রকম অঙ্গভঙ্গি, গানের মধ্যে বাজারি শব্দের ব্যবহার ও ইঙ্গিতপূর্ণ সুরই ছিলো মূল ভরসা। প্রথমদিকে দর্শকরাও এই সব আইটেম গানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
এমন অবস্থায়, মূল নায়িকার পাশাপাশি শুধু আইটেম গানে নাচ করার জন্য পরিচিতি পায় বেশ কজন আইটেম-কন্যা। এদের মধ্যে সিন্ডি রাউলিং শুরুতেই বাজিমাত করেন। রেদওয়ান রনির ‘চোরাবালি’ ছবিতে নেচে আলোচনায় আসেন তিনি। তারপর ‘কমন জেন্ডার’ ‘কিস্তিমাত’ ছবিতেও দেখা যায় সিন্ডি রাউলিংকে। প্রবাসী এই নারী, আইটেম গানকে ভালোবেসে প্রতিবারই উড়ে এসে ছবির শুটিংয়ে যুক্ত হতেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে সম্প্রতি মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মুসাফির’ ছবিতে আইটেম কন্যার রঙিন মোড়ক থেকে বেরিয়ে প্রথমবারের মতো খল নায়িকার চরিত্রে অভিনয় করেন সিন্ডি রাউলিং। আবেদনময়ী এই আইটেম কন্যার হঠাৎ এমন সিদ্ধান্তকে ছন্দপতন হিসেবেই দেখছেন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নতুন করে আর কোন আইটেম গানে কাজ করতে চান না সিন্ডি। এবার তারা লক্ষ্য অভিনয় করা।
অন্যদিকে পেশাদার আইটেম-কন্যা হিসেবে বিপাশা কবির ৪০টির অধিক ছবিতে পারর্ফম করে নিজেকে নিয়ে গেছেন ভিন্ন এক উচ্চতায়। তিনিও আইটেম গানে কাজ করেত অনিহা প্রকাশ করছেন। যার অংশ হিসেবে চলতি বছর নতুন কোন ছবিতে আইটেম গানে কাজ করেননি। উল্টো নিজেকে নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। সেক্ষেত্রে বিপাশা কিছুটা সফলও। গেল মার্চে প্রথমবারের মতো নায়িকা হিসেবে প্রেক্ষাগৃহে হাজির হয়েছেন তিনি। সাইমন তারিকের পরিচালনায় ‘গুণ্ডামী’ ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে আশা জাগাতে ব্যর্থ হলেও, বিপাশা তার অভিনয় দিয়ে কিছুটা হলেও দর্শকদের মন জয় করতে পেরেছেন।
আইটেম গানে অনিহা প্রসঙ্গে সরাসির কিছু বলতে রাজি হননি বিপাশা। তবে নায়িকা হওয়ার ইচ্ছা প্রসঙ্গে বলেন, ‘শুরু থেকেই নায়িকা হওয়ার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু ভালোবাসার রং ছবিতে যখন আইটেম গানে কাজ করার সুযোগ পেলাম, তখন আর না করতে পারিনি। কারণ আইটেম গানেও একটা গল্প থাকে। যা নানা রকম অঙ্গ ভঙ্গির মাধ্যমে পর্দায় ফুঁটিয়ে তুলতে হয়। যা আমি বেশ ভালোভাবেই করতে পেরেছিলাম। তারপর তো সবাই মিলে আমাকে আইটেম কন্যা করে তুললো। তবে এখন নতুন করে কোন আইটেম গানে কাজ করতে চাই না। আপাতত অভিনয় নিয়েই থাকতে চাই।’
এদিকে আইটেম গানের বর্তমান প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে বলেন, ‘আগেই বলেছি আইটেম গানে একটা গল্প থাকে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তার ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। এটা পাল্টাতে হলে, কোরিওগ্রোফার ও নৃত্যপরিচালকদের আরো মনোযোগী ও রুচিশীল হতে হবে।’
শুধু সিন্ডি কিংবা বিপাশা নয়, আইটেম কন্যার তালিকায় আরো আছেন সাদিয়া আফরিন, শিরিন শীলা, নায়লা নাঈম, জ্যাকুলিন মিথিলাসহ অনেকেই। কিন্তু এদের বেশির ভাগের বিরুদ্ধেই রয়েছে অশ্লীলতার অভিযোগ। বিশেষত গানের সঙ্গে পারর্ফম করার সময় সংক্ষিপ্ত পোশাকের পাশাপাশি রুচিহীন অঙ্গভঙ্গি করার কারণে অনেক দর্শকেই তাদের ছবিগুলোকে গ্রহণ করেনি।
বলিউডের মতো বাংলা চলচ্চিত্রের মূলধারার নায়িকাদের মধ্যেও অনেকে আইটেম গানের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছেন। সেই তালিকায় প্রথমেই যার নাম আসে সে মাহিয়া মাহি। গেল বছর প্রথমবারের মতো ‘অগ্নি টু’ ছবিতে ‘ম্যাজিক মামুনি’ শিরোনামের আইটেম গানটিতে পারর্ফম করেন। গানটি এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, এটাকে ২০১৫ সালের সেরা আইটেম গান বলা হয়ে থাকে।
মাহি ছাড়াও বিভিন্ন সময় আইটেম গানে পারর্ফম করেছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি, সিমলা, নিপুণ, মৌসুমী হামিদ, হ্যাপিসহ আরও অনেকে
এদিকে গেল বছরের শেষ পর্যন্ত আইটেম গান নির্মাণের হিড়িক দেখা গেলেও, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে তেমনটা দেখা যায়নি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আগের নির্মিত ছবির আইটেমগানগুলো মুক্তি পেয়েছে। যা খুব একটা সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়েছে।
পেশাদার আইটেম-কন্যা ও নায়িকারা যখন আইটেম গান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, তখন সেই শূন্যস্থার পূরণে উঠে পড়ে লেগেছে একশ্রেণীর মডেল ও অভিনেত্রীরা। এদের মধ্যে ফেসবুকে নগ্ন ও অশ্লীল ছবি প্রকাশের মাধ্যমে সমালোচিত জ্যাকুলিন মিথিলার নাম সবার আগে আসে। সম্প্রতি পি এ কাজলের পরিচালনায় ‘চোখের দেখা’ শিরোনামের একটি নতুন চলচ্চিত্রের আইটেম গানে পারর্ফম করেছেন। এর দৃশ্যধারণের সময়ই অশ্লীলতার অভিযোগ করে নির্মাণ সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে এক সময় অশ্লীল ছবির নায়িকা হিসেবে পরিচিত মুনমুন এবার আইটেম গানে যুক্ত হতে যাচ্ছেন। ‘কাঁসার থালায় রূপালি চাঁদ’ শিরোনামের একটি চলচ্চিত্রের তিনি প্রথমবারের মতো পারর্ফম করবেন বলে জানা গিয়েছে।
আইটেম গান প্রসঙ্গে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির মহাসচিব মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘আইটেম গান ছবির প্রচারণা চালাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অনেকে এটাকে এমন ভাবে উপস্থাপন করে, যা অশ্লীলতার পর্যায়ে পড়ে।’
আইটেম গানের কাটতি আগের মতো নেই বলেও মনে করেন এ নির্মাতা। তার ভাষায়, ‘মানুষ নতুন যেকোন কিছুতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কিছুদিন চলার পর সেটা নিয়ে আর মাতামাতি করে না। আইটেম গানের ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে। তবে এটা ঠিক, আইটেম গানগুলোর চিত্রায়নে আরো যত্নবান ও রুচিশীল হলে, দর্শককে বেশি বিনোদন দেয়া সম্ভব হতো।’

