নিউজ ডেস্ক : স্বল্প সময়ে দেশের যেকোন জায়গায় টাকা পাঠানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় জনপ্রিয়তা পেয়েছে মোবাইল ব্যাংকিং সিস্টেম। এখন এটি কেবল টাকা আদান-প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং অনেক নতুন নতুন সেবা যুক্ত হয়েছে এতে। সেবা খাতে এর বিস্তার হচ্ছে প্রতিনিয়তই; বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণও। এরই ধারবাহিকতায় এবার মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দৈনিক গড় লেনদেন ছাড়িয়েছে ৬শ’ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মার্চ মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬০৮ কোটি টাকা। আগের মাস ফেব্রুয়ারিতে যা ছিল ৫৫২ কোটি টাকা। মূলত কম সময়ে টাকা পাঠানোর সুযোগের ফলে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার দ্রুত প্রসার হচ্ছে। লেনদেন বাড়লেও গত কয়েক মাস ধরে চালু (অ্যাকটিভ) অ্যাকাউন্টের সংখ্যা কমছিল। সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে মার্চে সচল অ্যাকাউন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৪২ লাখে। আর গ্রাহক সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩ কোটি।
প্রতিবেদনটির তথ্যমতে, গত মার্চ পর্যন্ত মোট ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৪৫ হাজার অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। তবে এসব অ্যাকাউন্টের মধ্যে চালু রয়েছে ১ কোটি ৪২ লাখ। আগের বছরের একই মাস শেষে দুই কোটি ৫২ লাখ ৩৬ হাজার অ্যাকাউন্টের মধ্যে চালু ছিল এক কোটি ১০ লাখ ৫৩ হাজার। আর ২০১৩ সালে এক কোটি ৩১ লাখ অ্যাকাউন্টের মধ্যে চালু ছিল এক কোটির কম অ্যাকাউন্ট। কোনো অ্যাকাউন্ট থেকে টানা তিন মাস কোনো ধরনের লেনদেন না হলে তা ইন-অ্যাকটিভ বা নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট হিসেবে বিবেচিত হয়। অবশ্য বড় কোনো অনিয়ম না পাওয়া গেলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে না ব্যাংক।
ব্যাংকগুলো সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিং করতে পারে না বিধায় এ কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এজেন্ট নিয়োগ দেয়। মার্চ মাস শেষে ব্যাংকগুলোর মনোনীত এজেন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৮ হাজার ৯১২। এর আগের বছরে এজেন্টর সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৪১ হাজার। ২০১৩ সাল শেষে ছিল এক লাখ ৮৯ হাজার। মূলত নানা অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে অনেকের এজেন্টশিপ বাতিল করা হয়েছে। অনেক দেশে মোবাইল ফোন অপারেটরের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিং পরিচালিত হলেও বাংলাদেশে ব্যাংকের মাধ্যমে তা পরিচালিত হয়।
স্বল্প সময়ে এবং সহজে লেনেদের মাধ্যম হিসেবে মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এখন শুধু নগদ টাকা আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মোবাইল ফোনে ব্যালেন্স রিচার্জ থেকে শুরু করে সুপার শপ বা শো-রুমের কেনাকাটায়, স্কুলের বেতন দেয়া, কর্মচারীদের বেতন প্রদান, প্লেনের টিকিট ক্রয়, চিকিৎসার ব্যয় মেটানো, গ্যাস-বিদ্যুতের বিল পরিশোধ, ট্যাক্সি ক্যাবের বিল, ভিসা ফি’সহ বিভিন্ন সেবা বিল মেটানো যাচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় টাকার লেনেদের পাশাপাশি এসব বিল পরিশোধে প্রতিনিয়তই আগ্রহ বাড়ছে গ্রাহকদের।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ১৫৭ কোটি টাকার বেতন পরিশোধ করা হয়েছে। আগের মাসের তুলনায় যা ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ কম। এ সময় বিভিন্ন সেবা বিল পরিশোধ প্রায় ২৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ১৮২ কোটি ৭০ লাখ টাকা হয়েছে। বিভিন্ন সুপার শপ ও শো-রূমে কেনাকাটায়, স্কুলের বেতন পরিশোধ, হাসপাতালের বিল প্রদান, ট্যাক্সি ক্যাবের বিলসহ বেশ কয়েকটি বিষয় বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ২৯৯ কোটি টাকা। এ সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো রেমিট্যান্স সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছে দেয়ার হার ২৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোবাইল ব্যাংকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের মুখপাত্র জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রায় ১৭ হাজার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে হাসপাতাল, স্কুল-কলেজ, সুপার শপ, টেক্সি ক্যাব, শো-রুম, বিমানের টিকিটসহ সব প্রতিষ্ঠানের জিনিসপত্র ও সেবা ক্রয়ে বিকাশ দিয়ে বিল পরিশোধ করতে পারছে গ্রাহকরা। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মচারীদের বেতন পরিশোধও করছে এর মাধ্যমে। এ ধরনের লেনদেনের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।’
এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘মোবাইল ব্যাংকিং চালুর অল্প কিছুদিনের মধ্যে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এটি এখন একটি স্ট্যাবল পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমরা এখন যেটা করছি, সেবাদান প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলেছি তারা যেন ক্যাশ লেনদেনের পাশাপাশি কেনাকাটা বা বিভিন্ন ধরনের সেবা বিল পরিশোধে গ্রাহকদের বেশি করে সুযোগ করে দেয়। ধীরে ধীরে সেটার পরিধিও বাড়ছে।’
মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর লেনদেনে স্বচ্ছতা আনতে তাদেরকে নতুন কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কিনা- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা গ্রাহকদের নতুন ও পুরাতন অ্যাকাউন্টের ক্ষেত্রে ভোটার আইডির কপি সংরক্ষণ করতে বলেছি, যাতে গ্রাহকের পুরো পরিচিতি থাকে। এতে করে কারও ফেইক আইডি দিয়ে অ্যাকাউন্ট করে থাকলে সেগুলো চেইঞ্জ করার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এদিকে সিম নিবন্ধনের পরবর্তী সময়ে আমরা ফেইক কেউ থাকলে তাদেরকে আরো ভালোভাবে খুঁজে বের করতে পারবো। কারণ তখন মোবাইল সিম রেজিস্ট্রেশন ও আইডির কপি এক হয়ে যাবে। আর বেশ কিছুদিন ধরেই আমরা আমাদের নজরদারিও বৃদ্ধি করেছি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর।’

