বাগেরহাট প্রতিনিধি : পোড়া বনের আগুনের কালিতে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। সুন্দরবনের সুন্দর রূপ এখন আগুন, কয়লা, সার আর তেলে ম্লান হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বারবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা চিন্তায় ফেলেছে পরিবেশবাদীসহ সাধারণ মানুষকেও।
বারবার মানবসৃষ্ট দুর্ঘটনার ফলে একদিকে যেমন কমছে বনের বাঘ, হরিণসহ বিভিন্ন দুর্লভ প্রাণী। তেমনি নির্বিচারে নিধন হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৃক্ষরাজি।
গত দু’বছরে এ বনের অভ্যন্তরে মানুষ সৃষ্ট বড় ধরনের কয়েকটি দুর্ঘটনা বারবার বিশ্ব মিডিয়ার শিরোনাম হয়েছে। তারপরও থামছে না সুন্দরবনে অবাধ প্রবেশ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।
ফলে গত দু’বছরে তেলবাহী ট্যাংকার, ক্লিংকার, সার ও কয়লাবাহী জাহাজডুবির ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি চলতি বছর ২৭ মার্চ, ১৩ এপ্রিল, ১৮ এপ্রিল ও সর্ব শেষ আজ (২৭ মার্চ) ঘটেছে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড। একমাসে ৪টি অগ্নিকাণ্ড! সঙ্গত কারণেই গবেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন বনের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব নিয়ে।
সেভ দ্যা সুন্দরবন চেয়ারম্যান ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনে বারবার আগুন লাগায় জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়ছে। সুন্দরবন সুরক্ষায় বন বিভাগের কর্মকর্তা কর্মচারীরা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। যে কারণে একের পর এক বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। সুন্দরবন রক্ষায় সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে সরকার তথা বন বিভাগের কর্মকর্তাদের উদ্যোগী হতে হবে। তা না হলে প্রাকৃতিক এই সুন্দরবন।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. আবদুল্লাহ হারুণ চৌধুরী সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের তাপ যতদূর যায়, ততদূরই বন ও বন্যপ্রাণীর ক্ষতি হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বন থেকে অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ যেমন বন্ধ করতে হবে, তেমনি যারা এ সংগ্রহের কাজটি করেন তাদের সচেতন করতে হবে।’
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরবন স্টাডি সেন্টারের পরিচালক প্রফেসর ড.সরদার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এখানে কোনো ষড়যন্ত্র হয়েছে কিনা সেটি সুন্দরবনের সার্থে আমাদের বের করা দরকার। পাশাপাশি তদন্তের নামে যেনো দায়সারা কাজ না হয় বনের সার্থে সুষ্ঠু তদন্ত দরকার।’
এদিকে, সুন্দরবনে ঘটে যাওয়া একের পর এক দুর্ঘটনা বন্ধে এখনই সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে ভাবনার পরামর্শ সুন্দরবন একাডেমির পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদিরের। তবে সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি জাতীয় সুন্দরবন নীতিমালা তৈরির তাগিদ দিলেন গবেষকরা।
৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার বিস্তৃত প্রাকৃতিক বৈচিত্রের এ সুন্দরবনে গত ১৪ বছরে ২২টি অগ্নিকাণ্ডসহ সার, কয়লা ও তেলবাহী জাহাজ দুর্ঘটার কবলে পড়ে অস্তিত্ব সঙ্কটে সুন্দরবন।
গোটা সুন্দরবনের ৪টি রেঞ্জের মধ্যে কেন বা কোন যাদুবলে শুধুমাত্র চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জের নির্দ্দিষ্ট কিছু এলাকায় একের পর এক আগুন লাগছে? এ নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন অনেকের। এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে নারাজ খোদ পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও।
সুন্দরবনসহ উপকূলের অপরাধ জগতের হাল নাগাদ খোঁজখবর রাখেন এমন একাধিক সূত্র বলছে, দু’একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া অনেক সময় এক শ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে প্রভাবশালীরা সুন্দরবনের খাল-বিল কথিত ইজারার মাধ্যমে মাছ চাষে সহজ রাস্তা তৈরি করতে পরিকল্পিতভাবে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এছাড়া দেশি-বিদেশি চোরাকারবারী ও রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বন্যপ্রাণী পাচারকারী চক্র তাদের সুন্দরবনের মধ্য বা বিকল্প উপকূলীয় রুটকে নিরাপদ রাখতে দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে পরিকল্পিতভাবে এই বনে আগুন লাগিয়ে দেয়।
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগ প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের পুড়ে যাওয়া বন ও ক্ষয়ক্ষতি পরিমাণ দেয়া তথ্য মতে, সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে গত ১৪ বছরে ২২ বার আগুনে পুড়েছে।
বিগত ২০০২ সালের ২২ মার্চ ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড কটকা অভয়ারণ্যের প্রায় ১৫ দিন ধরে জ্বলতে আগুনের মধ্য দিয়ে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগে আগুনের সূত্রপাত হয়। বন বিভাগের হিসেব মতে, এই একটিমাত্র অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যায় ৬ একর বনভূমি।
এরপর ২০০৪ সালে ২৫ ও ২৭ মার্চ চাঁদপাই রেঞ্জের জিউধরা স্টেশনের নাংলীর মাদরাসার ছিলায় ও আড়িয়ার খাল এলাকায় বনের ভেতর দু’দফা অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ২০০৫ সালের ৮ এপ্রিল একই রেঞ্জের আমরবুনিয়া এলাকায় অপর একটি অগ্নিকাণ্ডে আড়াই একর এলাকার বন পুড়ে যায়। ১৩ এপ্রিল একই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের তুলাতলা এলাকায় আগুনে পুড়ে যায় সাড়ে ৪ একর বন।
২০০৬ সালের ১৯ মার্চ চাঁদপাই রেঞ্জের তেরাবেকা এলাকায় সৃষ্ট দাবানলে পুড়ে যায় প্রায় দেড় একর বনভূমি। ওই বছরের একই এলাকার ১২ এপ্রিল আমরবুনিয়া এলাকায় বন আগুনে পুড়ে যায়। একই দিন ওই এলাকার কলমতেজেতি পুড়ে যায় দেড় একর বনভূমি। ১ মে চাঁদপাই রেঞ্জের জিউধরা স্টেশনের নাংলীর ডালিয়া বিলের বন আগুনে পুড়ে যায়। ৩ মার্চ চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের ২৫ নম্বর কম্পার্টমেন্টের আড়াই একর বন পুড়ে যায়।
২০০৭ সালের ১৫ জানুয়ারি শরণখোলা রেঞ্জের ডুমুরিয়া ক্যাম্পের সাড়ে ৫ একর বন পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ওই বছরের ১৯ মার্চ ও ২৮ মার্চ চাঁদপাই রেঞ্জের নাংলীর পচাকুড়ালিয়া এরাকায় দুইদফা আগুনে ১০ একর বন পুড়ে যায়। ২০১০ সালের ২০ মার্চ চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের ২৭ নম্বর কম্পার্টমেন্টের ৫ একর বন পুড়ে যায়।
২০১১ সালে মার্চ মাসে তিন দফা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ১ মার্চ নাংলী এলাকার ২৫ নম্বর কম্পার্মেন্টে প্রথম দফা অগ্নিকাণ্ডে দুই একর এলাকার বনসম্পদ পুড়ে ছাই হয়। টানা ৩দিন পর এ আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ৮ মার্চ আড়িয়ার বেড় নদী থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটর ভেতরে আবার আগুন লাগে। এ আগুন নেভাতে না নেভাতেই ৯ মার্চ ভোলা নদী থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে গহীন বনে হঠাৎ আগুন জ্বলে ওঠে। বনবিভাগ দমকল বাহিনী এবং এলাকাবাসীর সহায়কায় ৪ দিনের মাথায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। ৩ দফা এ অগ্নিকাণ্ডে প্রায় দশ একর এলাকার বন সম্পদ পুড়ে যায়।
২০১৪ সালের ২১ মে চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের ৬৫ ছিলায় আগুনে সাড়ে ৩ একর বন পুড়ে যায়। এতে ভস্মীভূত হয় কোটি-কোটি টাকার, সুন্দরী, বাইন, আমুর, গেওয়াও বলাসহ অন্যান্য বৃক্ষরাজি ও লতাপাতা। চলতি বছরের গত ২৭ মার্চ বিকালে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাদঁপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের নাংলীর শিকদারের ছিলায় এলাকার আগুন লেগে সুন্দরবন বিভাগের মতে পুড়ে যায় ১০ একর বনভূমি।
এর পর ১৩ এপ্রিল বুধবার সকালে পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের চাদঁপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের নাংলী ক্যাম্পের আব্দুল্লার ছিলার আগুন, ১৮ এপপ্রিল একই স্থানে আবারও।
সর্বশেষ আজ (২৭ এপ্রিল) চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের পাশে পঁচিশ নম্বর কম্পার্টমেন্টের তুলাতলা এলাকায় আগুন লাগে। যা নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগ স্থানীয়দের সহায়তায় ফায়ারলাইন কেটে এখনও চেষ্টা চালাচ্ছে। এই অবস্থায় সুন্দরবনের জন্য বন বিভাগের নিজস্ব অগ্নিনির্বাপক ইউনিট চেয়েছে এই বনের কাছের জনগণ।

