বিনোদন ডেস্ক : উৎসব পার্বন আসলেই লোক গানের শিল্পী, বিশেষত বয়াতিদের কদর বাড়ে। দিকে দিকে তাদের ডাক পড়ে। গ্রামের বান্নি থেকে শহরের বৈশাখী মেলায়, সব জায়গায় তাতের দেখা মিলে। তেমনই এক শিল্পী কুদ্দস বয়াতি। তিনি মূলত লোকনাট্যের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ পালাগান গেয়েই পরিচিত লাভ করেছেন। মানুষের মুখে মুখে চর্চিত এ গান গুরুমুখী বিদ্যা। সে হিসেবে মনসুর বয়াতি কাছ থেকেই কুদ্দুস বয়াতির তালিম নেয়া। গুরু শিষ্য দুজনেই ‘মহুয়া মালুয়া’র পালা পরিবেশন করলেও, তাদের গায়কিতে রয়েছে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য। লোকমুখে শোনা যায়, মনসুর বয়াতি দুপাশে দুটো বালিশ রেখে বসে থেকে পালা করতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি পাল্টে দিয়েছেন কুদ্দুস বয়াতি। তিনি মূলত হাতে বালিশ নিয়ে ঘোড়া বানিয়ে কখনও আবার নারীদের মতো গায়ে শাড়ি জড়িয়ে পালা পরিবেশন করে থাকেন।
এক সময় গ্রামে গঞ্জে পালা গেয়ে বেড়ানো কুদ্দুস বয়াতিকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলেন কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। তার হাত ধরেই বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রচারণামূলক বিজ্ঞাপনে ‘এই দিন, দিন না, আরো দিন আছে’ গানটি গেয়ে সবার দৃষ্টি কাড়েন। তারপর একে একে দেশ ছেড়ে দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে এই বয়াতির কথা।
হুমায়ূন আহমেদ গত হয়েছেন কয়েক বছর হলো। তার মৃত্যুর পর কুদ্দুস বয়াতিও কোথায় যেন চাপা পড়লেন। মাঝে মধ্যে উৎসব পার্বণে টিভি পর্দায় আর কনসার্টের মঞ্চে তার দেখা মিললেও, নতুন কোন গানের সাড়া মিলছিলো না। সম্প্রতি আবারো নতুন করে আলোচনায় এসেছেন এই বয়াতি। নাম পাল্টিয়ে হয়েছেন মাইকেল কুদ্দুস। তার ভাষায়, ‘এক সময় লোকে আমারে ‘কুদ্দুইসসা’ কইতো, কিন্তু যওন আমার গান চারদিকে ছড়ায়া পড়লো, তখন হইলো কুদ্দুস বয়াতি। আর এইবার হিপহপ গান গাওয়ার পর থাইক্কা হইয়া গেলাম ‘মাইকেল কুদ্দুস’।
পালাগানের এই কারিগরের হঠাৎ করেই এমন প্রাশ্চাত্য নাম ধারণে পেছনের গল্পটা জানতেই তার মুখোমুখি হয়েছিলাম চৈত্রের কোন এক দগ্ধ দুপুরে। ইট কাঠ আর কংক্রিটের নগরীতে এসে এই পালাকারও যেন পাল্টে গিয়েছে। শেষবার যখন তার সঙ্গে দেখা হয়েছিলো তখন তার গায়ে থাকতো বয়াতিরদের মতো লম্বা হলুদ রঙের পোশাক, পায়ে ঘুঙ্গুর। সেই কুদ্দুস বয়াতিকেই দেখতে পেলাম সরু জিন্স প্যান্ট, কালো রঙ্গের টি-শার্ট-যাতে ইংরেজি হরফে কি যেন লিখা। আর মাথায় প্রাশ্চাত্য কাউ বয়দের মতো টুপি। তবে বেশ ভোসা দিয়ে যে নিজেকে আড়াল করা যায় না, তা কুদ্দুস বয়াতির ভাঙ্গা চোরা চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো। শুরুতেই জানালেন তার মাইকেল কুদ্দুস হওয়ার গল্প…
‘একদিন প্রীতম আমার কাছে আইসা কইলো আপনে আমার মামা। আমি কইলাম, আমি তুমার মামা হইলাম কেমনে। কিন্তু হে আমার কতার পাত্তা না দিয়া মামাই কইতে লাগল। যাই হোক তারপর সে কইলো, আমার লগে একটা গান করতে চায়। এক সময় গানের কতাও আমারে শুনাইলো। আমারও মনে দরলো। তারপর গাইয়া হালাইলাম’- নিজের আঞ্চলিক ভাষায় এভাবেই সরল স্বীকারোক্তি কুদ্দুস বয়াতির।
তারপরের গল্পটা ছিলো অকল্পনীয়। সম্প্রতি ইউটিউবে কুদ্দুস বয়াতির নতুন একটি মিউজিক ভিডিও মুক্তি পেয়েছে। সোমেস্বর অলির কথায় ‘আসো মামা হে’ শিরোনামের এই গানটি মূলত হিপহপ ঘরানার। গানের সুরে সুরে সেখানে গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি জমানো এক মামার গল্প তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে প্রাশ্চাত্য ঢং-এ নেচে গেয়ে মাত করেছেন আমাদের কুদ্দুস বয়াতি। আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের কল্যাণে তা মুহূর্তেই ঝড় তুলেছে।
কিন্তু একজন শেকড় সন্ধানী বয়াতি কেন এমন গানে নিজেকে যুক্ত করলেন? তার মতে, ‘সময় পাল্টেছে। দেশ এহন ডিজিটাল হইয়া গেছে। পোলাপান নতুন কিছু হুনতে চায়। যেইডা তাগো চিন্তা বাবনার লগে যায়। তাই আমিও ডিজিটাল হইয়া তাগো কাছে যাইতে চাই।’
তারমানে আগামীতেও কী এ ধরণের গানে কুদ্দুস বয়াতীর দেখা মিলবে? উত্তর তিনি বলেন, ‘আমি এহন থাইক্কা ডিজিটাল গানই গাইতে চাই। প্রীতমের লগে কাজ কইরা বালা লাগছে। গানে কতায় যদি বর্তমান সময়ডা তুইলা দরা যায়, তাইলেই মানুষ গান হুনবো।’
হঠাৎ গুনগুন করে মাইকেল কুদ্দুস গেয়ে উঠলেন, ‘ও মামু তুমি কই লইয়া আইলা আমারে, মানুষ তো না সবি যন্ত্রপাতি আহারে।
বড়লোকে চুরি করে গরিব না খাইয়া মরে, কেউত কাওরে দেহে না। ভেজালে ভরা খাবার খাইতাসে প্রতিদিন, জাইনাও যেন জানে না। আর ওই সিন্ডিকেটের ফাঁদ ফালাইয়া আঙ্গুল ফুইলা কলা গাছ, হইসে কত জনে রে..। মানুষ মানুষ আর নাইরে মামু সব এখন স্বার্থপর, টেহার ধান্দায় মরে রেঅ এইদিন সেইদিন আর দিন নাইরে, টিকেটটা কাইটা দাও দেশের বাড়ি যাইরে।’
ডিজিটাল কিংবা হিপহপ যে ধরণের গানেই তিনি কণ্ঠ দেন না কেন, গ্রাম বাংলার মানুষের কাছে তিনি বরাবরই কুদ্দুস বয়াতি। আর এ কারণেই হয় তো লোকগানের বিশাল এক সংগ্রহ আগলে রেখেছেন তিনি। এ প্রসঙ্গে কুদ্দুস বয়াতি বলেন, ‘আমার কাছে কয়েক হাজার গান আছে। যার বেসির বাগই সুর করা হয় নাই। এডি লইয়া একটা সংগ্রহ শালা করছি আমার বাড়িত। যাতে হারায়া না যায়। কুদ্দুস বয়াতি ফাউন্ডেশন এইডা দেখবাল করে।’
এদিকে প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের নামেও একটি জাদুঘর নির্মাণ করছেন বয়াতি। যার তত্ত্বাবধানেও রয়েছে কুদ্দুস বয়াতি ফাউন্ডেশন।

