নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতি দুর্বৃত্তায়িত হয়েছে। এ দুর্বৃত্তায়নের সুযোগে গুটিকয়েক স্বার্থবাদী ‘রেন্ট-সিকার’ অঢেল বিত্ত-সম্পদের মালিক হয়েছেন। রেন্ট সিকার যারা নিজেরা কোনো বিত্ত সম্পদ সৃষ্টি করেন না, তারা বিত্তশালী হন অন্যের বিত্ত-সম্পদ দখল, বেদখল, জবরদখল, হরণ, গ্রহণ, অধিগ্রহণ ও আত্মসাতের মাধ্যমে। দুর্বৃত্ত রেন্ট-সিকারদের সঙ্গে রাজনীতি ও সরকারের অশুভ সম-স্বার্থেও আঁতাতই বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান দারিদ্র্য-বৈষম্য-অসমতার প্রধান কারণ।
শুক্রবার (১৫ এপ্রিল) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে প্রকাশনা উৎসবে বাংলাদেশে দারিদ্র্য-বৈষম্য-অসমতা বাড়ার কারণ হিসেবে এটিকে চিহ্নিত করেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত।
অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশে দারিদ্র-বৈষম্য-অসমতার কারণ-পরিণাম ও উত্তরণ সম্ভাবনা : একীভূত রাজনৈতিক অর্থনীতির তত্ত্বের সন্ধানে’ শীর্ষক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এর রচিয়তা হলেন- অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। বইটি প্রকাশ করে মুক্তবুদ্ধি প্রকাশনী।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করেন। বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন- বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. অজয় রায়, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. কাজী খলিকুজ্জামান আহমদ, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, ইতিহাস বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. রশিদ-ই-মাহবুব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাপান স্টাডি সেন্টারের ভিজিটিং অধ্যাপক সাই কুরাসাওয়া, কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, নাট্যজন মামুনুর রশীদ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রকাশনা উৎসব কমিটির সমন্বয়ক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফউদ্দিন চৌধুরী।
অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘আবুল বারকাত সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে তুলে ধরে দারিদ্রের মূল কারণ অনুসন্ধান করেছেন। দারিদ্রের প্রকারভেদ হিসেবে তিনি যে ২৩টি কারণ উল্লেখ করেছেন তন্মধ্যে মানুষ কাঠামোর দারিদ্র প্রবণতা আমাদের আত্মজিজ্ঞাসাপ্রবণ করে তুলে। আজ যে অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, অন্যের সম্পদ জবরদখল, অসৎ কালোবাজারি ইত্যাদিকে দারিদ্রের একটি মৌলিক কারণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন। এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য শুধু অর্থনীতির ছাত্র নয়, সকলের জন্যই গ্রন্থটি অবশ্য পাঠ্য। প্রয়োজন শিক্ষার মাধ্যমে আবুল বারকাতের দর্শনের চিন্তাকে যুক্ত করে গণমানুষের অর্থনৈতিক প্রবণতাকে অনুসন্ধান করে দারিদ্র বিমোচনের প্রচেষ্টা গ্রহণ। অর্ন্তদৃষ্টিসম্পন্ন জনগণের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণ থেকে প্রকৃত মানুষ, সঠিক মানুষ, মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষার আবশ্যকতা আজ প্রয়োজন।
আবুল বারকাতের রচনা থেকে রবীন্দ্র শিক্ষা-চিন্তার উদ্বৃতি দিয়ে তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথ সাধারণ মানুষকে ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে সহায়তা করে তার জমিদারীকে বিলুপ্ত করে দিয়েছেন। আজ ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে তৈরি হচ্ছে জমিদারী। তাই কল্যাণ অর্থনীতির লক্ষ্যে আমাদের সচেতন করার জন্যে আবুল বারকাতের বই থেকে তত্ত্বজ্ঞান লাভ করা যাবে।
উপাচার্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেন, বঙ্গবন্ধু পর্যায়ক্রমে জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। একইভাবে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্যে, দারিদ্র বিমোচনের জন্যে আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে কাজ করে যেতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. অজয় রায় তার বক্তব্যে বলেন অধ্যাপক আবুল বারকাত গণমানুষের অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। এই পরিচিতি অত্যন্ত দূর্লভ এক সম্মানের বিষয়। রেন্ট সিকারদের বিষয়ে অধ্যাপক বারকাত এই গবেষণা গ্রন্থে বিদগ্ধ এক আলোচনার সূত্রপাত করেছেন। সংবিধানকে সামনে রেখে বারকাত যে সব বিশ্লেষণ করেছেন তা ভিন্নধর্মী।
অধ্যাপক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, আবুল বারকাত অঙ্গীকার নিয়ে লেখেন। চিন্তা-চেতনাকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই গ্রন্থের মূল প্রতিপাদ্য নিয়ে তিনি অনেক দিন ধরে গবেষণা করছেন। তার আলোচ্য গ্রন্থের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হলো বাস্তবতাকে তুলে ধরা। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, কিছু মানুষ সবকিছু ভোগ করছে। এই অবস্থায় টেকসই উন্নয়ন একটি দূরূহ বিষয়।
অধ্যাপক ডা. রশিদ-ই-মাহবুব বলেন,অধ্যাপক আবুল বারকাত যে নতুন দৃষ্টিতে দারিদ্র্য ও অসমতাকে দেখেছেন তা রূঢ় হলেও বাস্তব। রেন্ট সিকার পরিচালিত এই সমাজে দারিদ্র্য ও মানবিকতার বিভিন্ন মাত্রা বিশ্লেষণে এই গ্রন্থটি অদ্বিতীয়।
কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, বাংলাদেশে দারিদ্র্য-বৈষম্য-অসমতা বিশ্লেষণী গবেষণা গ্রন্থটি ভিন্নধর্মী। বারকাতের গ্রন্থ আমাদের সবার চিন্তাচেতনার জগতকে আলোড়িত করবে। এর মাধ্যমে আমরা জীবনের এক ভিন্ন মাত্রার সাথে পরিচিত হই। তিনি তার লেখায় সচেতনভাবে
জাপানের রিক্কো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাই কুরাসাওয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাপানের দারিদ্র্য যেভাবে বাড়ছে তার সাথে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের গতিপ্রকৃতির তুলনা করে অধ্যাপক বারকাতের এই গবেষণাগ্রন্থের অন্যন্যতার প্রসঙ্গটি তুলে ধরেন।
নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বক্তব্যে বলেন, আবুল বারকাত সাহসী লেখক। তার প্রতিটি বই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত। যে সমস্যগুলো প্রতিনিয়ত আমাদের সমাজকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে সেই মৌলবাদের অর্থনীতি নিয়ে তিনি গবেষণা করেছেন, লিখেছেন। রেন্ট সিকাররা আমাদের দেশের অর্থনীতিকে কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং মুষ্টিমেয় কিছু বিত্তবান নির্মাণ করছে এই বইতে তার উল্লেখ আছে।

