নিজস্ব প্রতিবেদক : ট্যারিফ নির্ধারণ, তরঙ্গ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে প্রস্তাবিত টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর (ডট) আইন- ২০১৫ এর পরিবর্তন চায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এ জন্য আইনের চারটি অনুচ্ছেদে সংশোধন ও ৫টি অনুচ্ছেদ বাতিলের দাবি জানিয়েছে কমিশন।
সংশোধন ও বাতিলের আবেদন প্রস্তাব আকারে গত সোমবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠিযেছে বিটিআরসি।
কমিশন খসড়া ডট আইনের প্রস্তাবনা, অনুচ্ছেদ-৩, অনুচ্ছেদ-৬, উপ-অনুচ্ছেদ-৭(১), (২), ও (৩) এবং অনুচ্ছেদ-৮ এর সংশোধন এবং অনুচ্ছেদ-৮(ছ), অনুচ্ছেদ-৮(ট), অনুচ্ছেদ-৮(ঠ), অনুচ্ছেদ-৮(ড) ও অনুচ্ছেদ-৮(ঢ) বাতিলের দাবি করেছে।
বিটিআরসি বলছে, ওই ধারাগুলো বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন-২০০১ এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও প্রকৃত রেগুলেশন ও বাজার প্রতিযোগিতার ধারণার পরিপন্থি, যা টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে চরম বাঁধার সৃষ্টি করবে। কারণ টেলিযোগাযোগ আইন অনুসারে কিছু ক্ষমতা, কার্যাবলী ও দায়িত্ব বিটিআরসি পালন করে। এসব কাজ যদি মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ একটি অধিদপ্তর চর্চা ও পালন করে তাহলে তা টেলিযোগাযোগ আইন-২০০১ , এবং টেলিযোগাযোগ নীতিমালা ১৯৯৮ ও প্রস্তাবিত টেলিযোগাযোগ নীতিমালা ২০১৫ এর উদ্দেশ্যের পরিপন্থি।
কমিশন আরো বলেছে, একই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অপারেটর এবং রেগুলেটরের দায়িত্ব পালন স্বার্থের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করবে। কারণ আইন অনুসারে বিটিসিএল (বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি) বিটিআরসির লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান। ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যদি সরকারি কর্মী হিসেবে ডট এ যোগে দেয় এবং আইনের মাধ্যমে গঠিত স্বাধীন কমিশনের নথিপত্র ও কার্যক্রম পরীক্ষা, তদারকি করে তা হবে নীতি বিরুদ্ধ । এটা আইনগত জটিলতার সৃষ্টি করবে।
সূত্র মতে, বিটিআরসি বলছে প্রস্তাবনায় বিটিআরসির বিকল্প হিসেবে ডট করার কথা বলা হয়েছে। ডট আইন চূড়ান্ত হলে বিটিসিএল বিলুপ্ত হবে। তাই প্রস্তবানার সংশোধন প্রয়োজন।
অনুচ্ছেদ তিন এ অন্যান্য আইনে যাই বলা থাকুক না কেন ডট আইনের বিধান প্রাধান্য পাবে তাই এ ধারা পরিবর্তন করতে হবে। এখানে টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ কে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিটিআরসির মতে, ডট আইনের খসড়ার অনুচ্ছেদ ৬ ও ৮ এক সঙ্গে করলে মনে হবে কমিশনের সব ক্ষমতা ও কার্যাবলী অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের হাতে ন্যস্ত হবে। এটারও পরিবর্তন প্রয়োজন। অনুচ্ছেদ ৭ এর ক্ষমতা অর্পণের বিষয়টির ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
কমিশন বলছে, টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ অনুসারে সরকারে সমস্ত সহায়তা সরাসরি বিটিআরসি কর্তৃক পাওয়ার কথা কিন্তু ডট আইনে তা অধিদপ্তরের ওপর ন্যস্ত হওয়ায় কমিশনের ক্ষমতা খর্ব হবে। কারণ এ ধারায় তরঙ্গ ব্যস্থাপনা, ট্যারিফ নির্ধারণ, নীতি প্রণয়ন, লাইসেন্স প্রদানে ডটকে অনেকখানি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যেসব বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া কথা বিটিআরসির । তাই অনুচ্ছেদ-৮(ছ), অনুচ্ছেদ-৮(ট), অনুচ্ছেদ-৮(ঠ), অনুচ্ছেদ-৮(ড) ও অনুচ্ছেদ-৮(ঢ) বাতিল প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, গত ফেব্রুয়ারিতে ‘ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমিউনিকেশন (ডিওটি)’ গঠনের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করে। এতে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ২৩৮। অনেকটা ভারতের টেলিকম অধিদপ্তরের আদলে এটি গড়ে তোলা হয়েছে।
ইতোমধ্যে ৩২ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারী গত সেপ্টম্বরে ডট কার্যক্রম শুরু করেছে । নব গঠিত অধিদপ্তরটি রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিটিসিএলের আঞ্চলিক কার্যালয়ে অফিস ভাড়া নিয়েছে ।
বলা হচ্ছে, টেলিযোগাযাগ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন, তরঙ্গ ব্যবস্থাপনা, ট্যারিফ নির্ধারণসহ নানান কাজে সরকারকে সহযোগিতা করবে ডট।
নানান সমালোচনায় সরকার ২০০৮ সালে ১ জুলাই বিটিবি বিলুপ্ত করে বিটিসিএল নামে পাবলিক কোম্পানি গঠন করে । কিন্তু টেলিযোগাযোগ খাতের সমস্যা রয়েই যায়।
সূত্র জানিয়েছে, বিটিসিএল ( লুপ্ত বিটিটিবি) কর্মকর্তা-কর্মচারিরা ডটে কাজ করবেন। এতে আগের সমস্যাই নতুন মোড়কে সরকারে ঘাড়ে সাওয়ার বলে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
প্রসঙ্গত, বিটিসিএল সৃষ্টির পর বিটিটিবিতে কর্মরত প্রথম শ্রেণির বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তারা কোম্পানিতে যোগদানের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে উচ্চ আদালতে যান। ওই সময় এ সমস্যা সমাধানে সরকার তৎকালীন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়। কমিটি আলাদা একটি বিভাগ গঠনের মাধ্যমে এ সমস্যার সুরাহার সুপারিশ করে। সেই সুপারিশের আলোকেই ডটের সৃষ্টি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ডটের কারণে সমস্যার সমাধান না হয়ে বরং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বাড়বে ।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেলিযোগাযোগ খাতের সাবেক এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ১৯৯৮ সালের টেলিযোগাযোগ নীতিমালা এবং ২০০১ সালে টেলিযোগাযোগ আইন অনুসারে স্বাধীন কমিশন হিসেবে বিটিআরসি গঠন করা হয়। এরমধ্যে ২০১২ তে কমিশনের অনেক ক্ষমতা মন্ত্রণালয় নিয়ে নেয়, যাতে প্রতিষ্ঠানটি অনেকটাই নখ দন্তহীন হয়ে পড়ে এর মধ্যে নতুন অধিদপ্তরের যে আইন সরকার করতে যাচ্ছে তা চূড়ান্ত হলে তা হবে বিটিআরসির কফিনে শেষ পেরেকের মতো। তিনি আরো বলেন, আর বিটিবি ও এর পরিবর্তিত রুপ বিটিসিএল হচ্ছে অনেকটা পচে যাওয়া বস্তু । এটার সংষ্কার না করে অধিদপ্তর সৃষ্টি করে নতুন বোতলে পুরোনো মদ হস্তান্তরের মতো পরিস্থিতির চেষ্টা চলছে, প্রকৃত পক্ষে এ বিষয়টি টেলিযোগাযোগ খাতে আরও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করবে।

