ডেস্ক রিপোর্ট : মঙ্গল গ্রহ। সূর্য থেকে দূরত্বের দিক দিয়ে পৃথিবীর পরেই এবং সৌরজগতের চতুর্থ গ্রহ হলো মঙ্গল। রোমান যুদ্ধ দেবতা ‘Mars’ এর নামানুসারে এর নাম ‘Mars’(মঙ্গল) রাখা হয়। মঙ্গলকে অনেক সময় ‘লাল গ্রহ’ (Red Planet) বলেও অভিহিত করা হয়। কেননা, এর মাটি আয়রন অক্সাইডের সমন্বয়ে গঠিত (যাকে মরিচা বলা হয়)।
সূর্যকে পরিভূমণ করতে মঙ্গল গ্রহের সময় লাগে ৬৮৭ দিন এবং নিজ অক্ষে একবার আর্বতন করতে সময় লাগে ২৪ঘন্টা ৩৭ মিনিট। মঙ্গলের এক বছর পৃথিবীর ৬৮৭ দিনের সমান। মঙ্গল গ্রহের দু’টি উপগ্রহ রয়েছে। একটির নাম ডিমোস (Deimos) এবং অপরটি ফেবোস (Phobos)। ফেবোস (Phobos) এর ব্যাস ১১ কিলোমিটার এবং মঙ্গলের পৃষ্ঠ থেকে মাত্র ৯ কিলোমিটার দূর থেকে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করে।
বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন নিকট ভবিষ্যতে (১০ থেকে ৫০ মিলিয়ন বছরের মধ্যে) ফেবোস (Phobos) মঙ্গলের বুকে আছড়ে পড়বে। কারণ প্রতি ১০০ বছরে Phobos আর মঙ্গলের দূরত্ব ১.৮ মিটার করে কমছে।
মঙ্গলে যাত্রাকারী প্রথম মহাকাশযান হল ‘মেরিনার-৪’ (১৯৬৫)। তবে মঙ্গলে অবতরণকারী প্রথম মহাকাশ যান হল ‘মার্স-২’ (১৯৭৬)। এরপর প্রায় দীর্ঘ ২০ বছর বিরতির পর ১৯৯৭ সালে মঙ্গলে অবতরণ করে পাথফাইন্ডার । বলা হয় পাথফাইন্ডার সবচেয়ে সফল মঙ্গল অভিযান। এরপর নিয়মিতই মঙ্গলের বুকে মহাকাশযান অবতরণ করেছে। সর্বশেষ ২০০৮ সালে ‘ফিনিক্স’ (Phoenix) মঙ্গলে অবতরণ করে পানির জন্য অনুসন্ধান চালায়। এ পর্যন্ত যত মঙ্গল অভিযান হয়েছে তার দুই তৃতীয়াংশ অভিযান অজানা কারণে ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য অনেকেই মঙ্গলকে সৌরজগতের ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’ বলে থাকেন।
মঙ্গলের ত্বক পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা কিছু অধিযুগে ভাগ করেছেন। এর ভিতরে তিনটি অধিযুগকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এগুলো হলো:
নোয়াচিয়ান অধিযুগ (Noachian epoch): এর ব্যাপ্তিকাল ৩৮০-৩৫০ কোটি বৎসর। এই সময় মঙ্গলের পৃষ্ঠতল গঠিত হয়েছিল। ধারণা করা হয়, এই অধিযুগে প্রচুর বিশালায়তন খাদের সৃষ্টি হয়েছিল। থারসিস বাল্জ (Tharsis bulge) নামক একটি আগ্নেয় উচ্চভূমি এই সময় সৃষ্টি হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই অধিযুগের শেষে দিকে জলসমৃদ্ধ তরল পদার্থের দ্বারা প্লাবিত হয়েছিল।
হেসপারিয়ান অধিযুগ (Hesperian epoch): এর ব্যাপ্তিকাল ৩৫০-১৮০ কোটি বৎসর। এই যুগে ব্যাপক অগ্ন্যুৎপাত ঘটে এবং বিপুল পরিমাণ বিশালায়তন লাভা দ্বারা এর উপরিতল আচ্ছাদিত হয়ে যায়।
আমাজোনিয়ান অধিযুগ (Amazonian epoch): এর ব্যাপ্তিকাল ১৮০ কোটি বৎসর থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত। এই যুগে কিছু বিশালায়তন খাদের সৃষ্টি হয়েছিল। ধারণা করা হয়, বড় বড় উল্কাপাতের কারণে এই খাদগুলো সৃষ্টি হয়েছিল। এই সময়ই সৌর জগতের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ অলিম্পাস মন্স (Olympus Mons) সৃষ্টি হয়েছিল।
ধারণা করা হয়. নোয়াচিয়ান অধিযুগে এই গ্রহটিতে নানাবিধ যৌগিক পদার্থসমৃদ্ধ তরল পানির অস্তিত্ব ছিল। কালক্রমে ভারি পদার্থ অধঃক্ষেপিত হওয়ার ফলে, সৃষ্ট স্বচ্ছ পানি, গ্রহটির বায়ুমণ্ডলীয় কম চাপে বাস্পে পরিণত হয়।
২০০৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ ভিশন অফ স্পেস এক্সপ্লোরেশন নামে একটি নীতিমালার ঘোষণা দিয়েছেন। এতে বলা হয়েছে, মঙ্গলে মনুষ্যবাহী অভিযান প্রেরণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুদূর প্রসারী স্বপ্নের সর্বপ্রধান অংশ। এই স্বপ্নকে সামনে রেখে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা এবং লকহিড মার্টিন যৌথভাবে অরিয়ন নভোযানের নকশা নির্মাণ শুরু করে দিয়েছেন। ২০২০ সালে চাঁদে ফিরে যাওয়ার জন্য যে অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছে তার ক্রু পরিবহন যান হবে এই অরিয়ন। মঙ্গলে মানুষ পাঠানোর পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে এই চন্দ্রাভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি তথা এসা ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে মঙ্গলে মানুষ প্রেরণের কথা ভাবছে। এর আগে অনেকগুলো সন্ধানী যান পাঠাবে তারা, একটার আকৃতি তার আগেরটা থেকে বড় হবে। এক্সোমার্স উৎক্ষেপণ এবং মার্স রিটার্ন মিশনের মাধ্যমে এই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হবে।
২০০৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর নাসার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর মাইকেল ডি গ্রিফিন বলেছেন, নাসা ২০৩৭ সালের মধ্যে মঙ্গলে মানুষ প্রেরণের কাজ সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর, যাতে ২০৫৭ (১৯৫৭ সালে স্পুটনিক ১ এর মাধ্যমে মহাকাশ যুগের সূচনা ঘটেছিল) সালে মঙ্গলে মানব বসতির ২০ বছর পূর্তি উৎসব উদযাপন করা যায়।

