নিজস্ব প্রতিবেদক : আর মাইরেন না আফা, আর করুমনা এমুন কাম, আমারে ছাইড়া দ্যান, আর মাইরেন না, মইরা যামু, মাফ কইরা দ্যান, আমি বাড়িত যাইবার চাই…।
সেদিন শিশুটির সেই গগনবিদারি চিৎকার একটুও নাড়া দেয়নি কর্তার পাষাণ হৃদয়কে। এভাবে কেটে গেছে বহুদিন। তবু রেহাই পায়নি সে। অবশেষে বাঁচার আশায় বাড়ি থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছিল সেই ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী মাহফুজা আক্তার হ্যাপী।
কন্যার সারাটি জীবন কাটবে হাসি আর আনন্দে এই আশায় বাবা-মা যার নাম রেখেছিলেন হ্যাপী, তার কেন হবে এমন পরিণতি! হ্যাপী, খাদিজাদের কেন শৈশব কৈশোরের প্রতিটা দিন বিষিয়ে ওঠে খুন্তির ছ্যাঁকায়, পোড়া ত্বকের গন্ধে!
বিদায়ী বর্ষের ৬ সেপ্টেম্বর এমন নির্যাতনের বিরুদ্ধে মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা হয়। অথচ বিচারের দীর্ঘসূত্রিতায় বছর পেরিয়ে যায় তবু হ্যাপী, খাদিজাদের আর্তনাদ ঘুরপাক খেতে থাকে আকাশে বাতাসে।
তবে আশার কথা, সদ্য বিদায়ী বছরের শেষ দিন অর্থাৎ ৩১ ডিসেম্বর শিশু গৃহকর্মী হ্যাপী নির্যাতনের মামলায় জাতীয় দলের ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন ও তার স্ত্রী জেসমিন জাহান নিত্যর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। যদিও ২৬ ডিসেম্বর পুলিশকে ওই প্রতিবেদনটি দাখিল করতে বলেছিলেন আদালত। কিন্তু প্রতিবেদন তৈরির কাজ শেষ না হওয়ায় সিএমএম আদালত আগামী ১২ জানুয়ারি পুলিশকে প্রতিবেদন দাখিলসহ নিপীড়কদের পরবর্তী হাজিরার দিন ধার্য করেন। তাই ওই দিন আদালতে অভিযোগপত্রটি উপস্থাপন করা হবে বলে জানানো হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে।
অভিযোগপত্রে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৪ এর (২) খ ধারায় শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়েছে শাহাদাত ও নিত্যর বিরুদ্ধে।
এ ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের সাত থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে।
কিন্তু বিচার পাওয়ার এই আর্তনাদ অবসন্ন হয়ে একসময় নিশ্চুপ হয়ে যায়, স্বয়ং বিচারকের বাসায় পনেরো মাস আটক রেখে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের অভিযোগ উঠে আসে যখন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য মতে, এ বছর ৬৩ জন গৃহপরিচারিকা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের পর মারা গেছে সাতজন। আর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের।
এছাড়া বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে নির্মম নির্যাতনের শিকার হলেও অভিযোগ করারই সাহস পায় না অনেক গৃহকর্মী। এছাড়া বিচার হচ্ছে না বলেই হয়তো নীরবে চলছেই এসব নির্যাতন।
এমনই এক জ্বলন্ত উদাহরণ ১২ বছরের শিশু গৃহকর্মী খাদিজা।
বহু ক্ষতচিহ্ন শরীরে নিয়ে হ্যাপীর মতো খাদিজাও গত ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার এক বিচারকের উত্তরার বাসা থেকে পালিয়ে এসেছিল অসুস্থ শরীরে, কিন্তু তীক্ষ্ণ বুদ্ধি খাটিয়ে।
বহুদিন আগে নিজের কাছে সযতনে জমিয়ে রাখা একটি দশ টাকার নোটই তাকে বাতলে দেয় পালানোর সে পথ। খর্বদেহ দীপ্ত বুদ্ধির খাদিজা বাড়ির দাড়োয়ানকে ১০ টাকার ওই নোট দিয়ে বলে- একটা পাউরুটি আইনা দ্যান। দাড়োয়ান তার কথা কানে নেয় না। শুনছে না দেখে খাদিজাও পিছপা হয়নি। কারণ সে ফিরে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি ভেঙে নেমে আসেনি। একজন বিচারকের বাসায় ১৫ মাসের দমবন্ধ ওই দোজখখানায় থেকে আজ তাকে পালাতেই হবে।
বাঁচার জন্য ব্যাকুল তার ছোট্ট মনের সঞ্চিত শেষ শক্তিটুকু কণ্ঠে এনে সে দাড়োয়ানকে এবার বলে, মেমসাহেব রুটি আনতে কইছে, তাড়াতাড়ি আইনা দ্যান।
এরপর দাড়োয়ানের সাধ্য কি খাদিজার কথার অবাধ্য হওয়ার! তাই টাকা নিয়েই সে দ্রুত বেরিয়ে যায় দোকানের উদ্দেশে।
আর এটাই চাইছিল খাদিজা! একছুটে বেরিয়ে পড়ে বাড়ি থেকে। সূর্য তো সেই কখন ডুবে গেছে। বাইরে তখন অন্ধকারে নিমজ্জিত নগরীর রাজপথ। বহুদিন পর প্রাণভরে শ্বাস নেয় খাদিজা। আঁধার কালো পথই যেন দেখা দিয়েছিল আলো হয়ে! ছুটতে থাকে ১২ বছরের একটি শিশু, একা! মুক্তির কী আকাঙ্ক্ষা!!
পরে সাভার হয়ে শুক্রবার রাতে পুলিশের সহায়তায় বাসে করে ২৪ অক্টোবর শনিবার ভোরে পৌঁছে বাড়িতে। মাগুরার শালিখা উপজেলার বাগডাঙ্গা গ্রামের বাবা সোলেমান সর্দার ও মা ডালিম বেগমের কাছে।
শিশু বয়সেই যে একদিন বাবা-মার অভাব অনটনের সংসারে একটু আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানোর জন্য শহরবাসী শিক্ষিত (!) গ্রাম্য প্রতিবেশীর হাত ধরে ঢাকায় গিয়েছিল। আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় আইন সহায়তা প্রদান সংস্থার উপ-পরচিালক (প্রশাসন) রকিবুল ইসলামের বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেয়। রকিবুল ইসলামের বাড়িও মাগুরায়; মহম্মদপুর উপজেলার বরুলিয়া গ্রামে।
তারপর দীর্ঘ পনেরো মাস পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করার কোনো সুযোগ পায়নি এই শিশু। নীরবে সহ্য করতে হয়েছে অসহ্য যন্ত্রণা।
খাদিজার কথায়, বিচারক ও তার স্ত্রী শামীমা ইসলাম নানা ছুতায় প্রতিদিন তাকে চড়, থাপ্পড়, শরীরে গরম খুনতির ছ্যাঁকা ও গরম পানি ঢেলে নির্যাতন করতো। মাঝে মাঝে বটি, ছুরির আঘাতও সহ্য করতে হয়েছে। এমনকি অসুস্থ হলে চিকিৎসাও করাতো না ওরা।
হ্যাপীর নির্যাতনের মামলা হলেও থানায় অভিযোগ পর্যন্ত করতে পারেনি খাদিজা। কারণ কার কাছে এই বিচার চাইবে সে!
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সালিশী বৈঠকের মাধ্যমে টাকা-পয়সার বিনিময়ে অভিযোগটিকে চিরতরে চাপা দেয় বিচারক আর খাদিজার পরিবার।
৭ নভেম্বর শনিবার সকালে রাজধানীর মালিবাগের পশ্চিম হাজীপাড়ার একটি বাসা থেকে মিতু (১২) নামের এক শিশু গৃহকর্মীর লাশ উদ্ধার করে রমনা মডেল থানা-পুলিশ। মিতুর বাবার নাম আবু সাঈদ, গ্রামের বাড়ি ভোলা সদরে।
সেদিন রমনা মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আলতাফ হোসেন গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, মিতু পশ্চিম হাজীপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত এক বিচারকের বাড়িতে কাজ করতো। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ওই বাড়ি থেকে পুলিশকে খবর দেয়া হয়। পরে পুলিশ ওই বাড়িতে গিয়ে ফ্যানের সঙ্গে মিতুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে। ওই বাড়িতে এক বছর আগে কাজ করতে আসে মিতু।
আর ওই পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশকে জানানো হয়েছিল, মিতু পারিবারিক সমস্যার কারণে মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত ছিল। আর এই হতাশা থেকে সে আত্মহত্যা করে থাকতে পারে।
আগের রাতে খাওয়া শেষে ১০টার দিকে মিতু ঘুমাতে গিয়েছিল। পরে সকালে তার লাশ পাওয়া যায়। মিতুর মৃত্যু কাহিনী আর প্রকাশ পায়নি কোনো সংবাদ মাধ্যমে।
যাইহোক অবশেষে বিগত বছরের ২১ ডিসেম্বর পাস হয়েছে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি-২০১৫। যা তিন মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যেগ হাতে নিয়েছে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাইল শিপার।
প্রণয়নকারীরা মনে করছেন, নীতিমালাটি বাস্তবায়ন হলে সুরক্ষা পাবে শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী গৃহকর্মী। আর নতুন বছরটি হয়ে উঠবে তাদের জন্য কল্যাণকর।
প্রসঙ্গত, শিশুদের গৃহকর্মী বানানোর প্রবণতা সামগ্রিকভাবে হ্রাস পেলেও দারিদ্র্যপীড়িত এলাকাগুলো থেকে এখনো প্রচুর শিশুকে শহরে পাঠানো হচ্ছে। অপরদিকে নগরবাসীরা গৃহের সার্বিক নিরাপত্তা এবং কর্তাসহ গৃহের সদস্যদের ইপ্সিত আনুগত্যের বিবেচনায় নারী গৃহকর্মী বিশেষত কিশোরী বা শিশু গৃহকর্মী নিয়োগে আগ্রহী হয়ে থাকে।

