রাজশাহী প্রতিনিধি : যেসকল দেশ থেকে নিয়মিত অভিবাসন হয় তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। রাজনৈতিক সুরক্ষার প্রয়োজন সেভাবে না হলেও অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ শ্রমিক হিসেবে অভিবাসীর মিছিলে যোগ হচ্ছে। এদের মধ্যে কেউ বৈধ পথে কেউবা অবৈধ পথে দালালের খপ্পরে পড়ে।
বাংলাদেশ থেকে আকাশ পথে ভিনদেশে পাড়ি দেবার পাশাপাশি সড়ক পথে ভারত হয়ে অন্য দেশে পাড়ি দেবার পথও রয়েছে। তবে সমুদ্র পথে প্রবাসযাত্রা এ সময়ের আলোচনার কেন্দ্রে।
মায়ানমারের জলসীমা থেকে শত শত বাংলাদেশিকে আটক করে দেশে ফেরত পাঠানো, থাইল্যান্ড সীমান্তে মালয়েশিয়ার বুকিট ওয়াং এর গহিন জঙ্গলে একের পর এক গণকবরে বাংলাদেশির লাশ, অবৈধ আটক কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশির দেহাবশেষ উদ্ধার, ইটালির সীমান্তে লিবিয়ায় নৌকা ডুবিতে বাংলাদেশের ২৬ জনের মৃত্যুর সংবাদ স্তম্ভিত করে। আর এর মধ্যে রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
২০১৫ সালে বিদেশে কাজের জন্য গিয়ে প্রতারিত হয়ে ফিরে আসা ভিকটিমদের মধ্যে মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট-এসিডি ৬৪ জনকে সনাক্ত করেছে। এরমধ্যে রাজশাহী জেলার ২৯ জন। এদের একটি বড় অংশে আছে নারী, যাদের অধিকাংশ দালালের মাধ্যমে গৃহ শ্রমিক হিসেবে বিদেশ গিয়েছে।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, এইসব গৃহশ্রমিকদের বিভিন্নভাবে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এছাড়াও শ্রমের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, অধিক কর্মঘণ্টা, কর্মস্থলে আটকে রাখা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে না দেয়া, কর্মস্থল পরিবর্তনের অধিকার না থাকা ইত্যাদি সমস্যা রয়েছে। ফিরে আসা শ্রমিকদের মধ্যে ১১ জন কারগার থেকে ফিরে এসেছে এবং ৭ জন নিজের অর্থে বা পরিচিতদের আর্থিক সাহায্যে ফিরে এসেছে। অধিকাংশ প্রবাসীরা ঋণ করে দালালের মাধ্যমে বিদেশ গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছে।
জেলার চারঘাট ও গোদাগাড়ী এলাকার প্রবাসীর সংখ্যা বেশি। এর অন্যতম কারণ নদী ভাঙন, কর্মহীনতা, সীমান্তবর্তী এলাকা। প্রতারণার এ ঘটনায় রাজশাহীতে পাচারের মামলা না হলেও এসিডি’র সহায়তায় নওগাঁ ও জয়পুরহাটে মামলা হয়েছে। রাজশাহীতে মামলা না হবার পেছনে যে কারণগুলো পাওয়া যায় তার মধ্যে রয়েছে, অধিক পরিচিত ও এলাকার প্রভাবশালী দালাল, অর্থ ফেরত দেবার প্রতিশ্রুতি, আবারও বিদেশ যাবার ইচ্ছা ইত্যাদি।
রাজশাহীর বাঘা থানার সরের হাট এলাকার দুই যুবক ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে স্থানীয় দালাল লিটনের মাধ্যমে জনপ্রতি ৩ লাখ টাকার বিনিমিয়ে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে কাতারে যান এবং সেখানে যাওয়ার পর লিটন তাকে অন্য এক দালালের কাছে বিক্রি করে দেয়।
সেখানে তাদেরসহ আরো ২০ জনকে একটি বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ডে আটকে রাখে। তাদের কাছে থাকা টাকা ও কাগজপত্র জোড় করে ছিনিয়ে নেয়। ৪ দিন না খেয়ে থাকার পর দরজা ভেঙে কোনো রকমে পালিয়ে স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ করে তারা দেশে ফিরে আসে। অর্থ ফেরৎ পাবার আশায় তারা কেউই মামলা করতে রাজি হয়নি।জেলায় এ বছর তিনটি পাচারের ঘটনার কথা জানা যায়। এর মধ্যে গোদাগাড়ী থানায় একটি ঘটনায় ৩ জন ভিকটিম ও রাজশাহী শহরে ২টি পাচারের ঘটনায় ২ জন ভিকটিমকে উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়। ২০১৫ সালের জুন মাসে ভারতে পাচারকালে গাজীপুরের কালিয়াকৈর থেকে গোদাগাড়ীর তিন কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়। গার্মেন্টসে কাজ দেবার নাম করে গোদাগাড়ীর পাকরি ইউনিয়নের রংপুর গ্রামের আখতারা খাতুন নামে এক পাচারকারী নারী ওই তিন কিশোরীকে ঢাকায় নিয়ে আসে এবং অন্য নারী পাচারকারীর কাছে বিক্রি করে দেয়। পরে সেখান থেকে ভিকটিমদের পুলিশ উদ্ধার করে। ঘটনাটি মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা হয়।
অন্যদিকে বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে চারঘাট এলাকা থেকে পাচারকালে নগরীর রাজপাড়া এলাকার ১৩ বছরের এক কন্যা শিশুকে উদ্ধার এবং পাচারকারী চক্রের হোতাসহ ৩ জনকে আটক করেছে রাজপাড়া থানা পুলিশ। বর্তমানে এসিডির আইনী সহায়তায় মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। পাচারের ঘটনায় অভিযুক্ত খাদিজা বেগমের কন্যা শিশুর নিরাপদ হেফাজতের জন্য এসিডি’র শেল্টারহোমে রয়েছে।
এদিকে বছরের নভেম্বর মাসে ঢাকার এক শিশু রাজশাহীর পদ্মার চর থেকে উদ্ধার হয়েছে। ১১ বছরের এই শিশুটি ঢাকার মগবাজার এলাকায় খালার বাড়িতে থাকতো বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। তার বাবা তাদের ছেড়ে চলে গেছে এবং মা কাজের জন্য বিদেশে থাকে। পাচারকারীরা তাকে বেড়াতে নিয়ে যাবার নাম করে ট্রেনে করে রাজশাহীতে নিয়ে আসে এবং ভারতে নিয়ে যাবার উদ্দেশ্যে পদ্মার চরে নিয়ে যায়।
শিশুটি সেখান থেকে পালিয়ে আসে। পরে বোয়ালিয়া থানা পুলিশ শিশুটির নিরাপদ হেফাজতের জন্য এসিডি’র শেল্টার হোমে পাঠায়। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করার পর এসিডি কর্তৃপক্ষ শিশুটিকে নিজ পরিবারে ফিরিয়ে দেয়।
মানবাধিকার কর্মী সালীমা সারোয়ার বলেন, ‘মানবপাচারের প্রকৃতি ও পরিধি পরিবর্তন হলেও আজও আগের মতোই বিদ্যমান রয়েছে। একটা সময় মনে করা হত শুধু নারী ও শিশুরাই পাচারের শিকার হয়। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে এদেশ থেকে প্রতি বছর কাজের জন্য হাজার হাজার পুরুষ অভিবাসনের নামে পাচার হয়ে যাচ্ছে। সাগরে, ট্রলারে বা গণকবরে এই সব বাংলাদেশি মানুষের ছবিগুলো প্রমাণ করে মানবপাচার নতুন রূপে আবর্তিত হয়েছে।’
নি আরো বলেন, ‘আজ মানবপাচার প্রতিরোধ দমন আইনে এই ঘটনাগুলোকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। আর এজন্য প্রয়োজন কমিউনিটির সক্রিয় সমর্থন, আইনের যথাযথ ও সুষ্ঠ প্রয়োগ এবং দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার।

