ঢাকাTuesday , 29 December 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

কারখানা ও ডিলাররাই তেলে ভেজাল মেশাচ্ছে

Link Copied!

oillনিজস্ব প্রতিবেদক : মিনহাজ সরকার । কাজ করেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। সাধারণত মহাখলীর ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন থেকে তার মোটর বাইকের জ্বালানি (অকটেন) কিনেন। জরুরি প্রয়োজনে গত মাসে একবার তেজগাঁওয়ের একটি পেট্রোলপাম্প থেকে অকটেন নেন। এরপরই তার মোটরবাইকে নানা সমস্যা দেখা দেয়। পরদিন মেকানিকের কাছে গেলে জানানো হয়, মূল সমস্যা তেলে। ভেজাল তেলের কারণেই বাইক ঠিক মতো চালু হচ্ছে না। কথা মতো তেল পরিবর্তন করায় সমস্যা দূর হয়।
সম্প্রতি নওগাঁর জেলা প্রশাসকের অনুরোধে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে অভিযান চালিয়ে দেখে পাম্পগুলোতে অতিরিক্ত তেল মজুদ রয়েছে। পাম্পগুলো তেল বিপণন কোম্পানির কাছ থেকে এক হাজার টন জ্বালানি কিনেছিল । কিন্তু তাদের কাছে মজুদ আছে দুই হাজার টন। অতিরিক্ত তেলের বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেনি পাম্প মালিকরা। পরে বিপিসি পরীক্ষা করে দেখে, বাড়তি তেল মূলত গ্যাসের উপজাত হিসেবে প্রাপ্ত কনডেনসেট।
এভাবে ভেজাল জ্বালানি তেলে সয়লাব সারা দেশ। অধিক লাভের লোভে কনডেনসেট মিশিয়ে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। এর ফলে বিপিসির তেল বিক্রি যেমন কমছে, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কম, দেশের বাজারে বেশি হওয়ায় একটি চক্র অধিক লাভের জন্য ভেজাল মিশিয়ে তেল বিক্রি করছে। তিনি জানান, প্রতি লিটার পেট্রোল ও কেরোসিন ৯৪ টাকা, অকটেন ৯৯ টাকা এবং ডিজেল ৬২ টাকায় বিক্রি করা হয়। এর বিপরীতে এক লিটার কনডেনসেটের দাম গড়ে ২২ টাকা। ফলে কনডেনসেট মিশিয়ে তেলের পরিমাণ বাড়িয়ে বিক্রি করছে তারা।
গত সেপ্টেম্বরে বিপিসির পরিচালক (বিপণন) মীর আলী রেজা দেশের বিভিন্ন স্থানের পেট্রোলপাম্পে অভিযান চালিয়ে তেলের বাড়তি মজুদ খুঁজে পান। এরপরই আসল রহস্য বেরিয়ে আসে।
মূল হোতা বেসরকারি রিফাইনারি ও ডিলার
তেলে ভেজালের জন্য বেসরাকরি ফ্রাক্শনেশন (কনডেনসেট প্রক্রিয়া পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপদন করে) কারখানা ও  ডিলারদের দায়ী করছে বিপিসি।
জ্বালানি বিভাগে পাঠানো বিপিসির এক পত্র থেকে জানানো হয়, কয়েকভাবে তেলে ভেজাল মেশানো হতে পারে। প্রথমত, কনডেনসেট ব্যবস্থাপনা, অর্থাৎ গ্যাসক্ষেত্র থেকে যখন কনডেনসেট সরবারহ করে তা চোরাই পথে ভেজালকারীদের হাতে পৌঁছতে পারে।
দ্বিতীয়ত: ফ্রাকশনেশন কারকাখানার উৎপাদন ব্যবস্থায় অনিয়ম রয়েছে। এ বিষয়ে বিপিসি বলছে, ফ্রাকশনেশন কারখানাগুলো কনডেনসেট থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্য (ডিজেল, অকটেন, কেরোসিন ইত্যাদি) ও সলভেন্ট উৎপাদন করে। পেট্রোলিয়াম পণ্য বিপিসি কিনে। কিন্তু সলভেন্ট বেসরকারি খাতে বিক্রি করা হয়। বিপিসির অভিযোগ, এই সলভেন্ট ও সলভেন্টের নামে বাড়তি কনডেনসেট তেলে মেশানোর জন্য পাচার করা হচ্ছে।
বিপিসির তথ্য মতে, দেশে সরকারি তিনটি ও ১২টি বেসরকারি ফ্রাকশনেশন কারখানা রয়েছে। বেসরকারি কারখানাগুলোতে গত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৯১ হাজার মেট্রিকটন কনডেনসেট সরবরাহ করা হয়। তাদের কাছ থেকে বিপিসি মাত্র ৩৫ হাজার মেট্রিকটন জ্বালানি তেল কিনে। বাকি অংশ থেকে সলভেন্ট উৎপাদন করা হয়।
বিপিসি আরো জানায়, উৎপাদন পরিমাণ নির্ধারিত (ইয়েল্ড প্যার্টান) না থাকায়, কারখানাগুলো সলভেন্টের আড়ালে জ্বালানি তেলও অন্যদের কাছে বিক্রি করছে। অনেক সময় সলভেন্ট ও কনেডেনসেট মিশিয়ে তেল বিক্রি করা হচ্ছে।
বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত একটি কমিটি ইতোমধ্যে চারটি কারখানা পরিদর্শন করেছে। কারখানাগুলো হলো : পেট্রোম্যাক্স রিফাইনারি, পিএইচপি  পেট্রো রিফাইনারি, অ্যাকুয়া মিনারেল টারপেন্টাইন অ্যান্ড সলভেন্টস প্ল্যান্টস এবং লার্ক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি। তবে তাদের প্রতিবেদন সম্পর্কে এখনো জানা যায়নি।
তবে বিপিসি বলছে, তেলে ভেজালের সঙ্গে ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটররাও জড়িত। অভিযুক্ত ডিলারদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। অনেক স্টেশনে তেল সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
বিভিন্ন গ্যাস কোম্পানি এবং তেল বিপণনের দায়িত্বে নিয়োজিত খোদ সরকারি প্রতিষ্ঠান পদ্মা, মেঘনা ও যমুনার বিরুদ্ধে তেলে ভেজাল দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশে জ্বালানি তেলের এজেন্ট, ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটরের সংখ্যা ৬ হাজার ২৪৫।
জ্বালানি তেলে ভেজাল প্রসঙ্গে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, ‘শুধু বেসরকারি কোম্পানিদের দোষ দিলে হবে না। এর সঙ্গে সরকারি কোম্পারির এক শ্রেণির দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারি জড়িত। যাদের কারণে অধিক দামে জ্বালানি তেল কিনেও প্রতারিত হচ্ছেন গ্রাহক। অনেক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি বেসরকারি ফ্রাকশনেশন কারখানার কর্মকর্তাও এ অভিযোগ করেছেন।
তবে বিপিসি চেয়ারম্যান এম. বদরুদ্দোজা সরকারি কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, পদ্মা, মেঘনা, যমুনার কেউ এ কাজে জড়িত নয়। নিজেদের দোষ ঢাকতেই সরকারি কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো এমনটাই দাবি বদরুদ্দোজার।
তেলে ভেজাল দেয়ায় শুধু ক্রেতাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তা নয় সরকারও বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। বিপিসির বিক্রিও কমে গেছে। বিপিসির তথ্য মতেই, ২০১৪ সালের তুলানায় চলতি বছর তেলের বিক্রি কমেছে ১৩ দশমিক ৬২ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি কমেছে পেট্রোল বিক্রি (১৫.৫৯ শতাংশ)। এতে সরকারের রাজস্ব কমেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। যদিও দেশে ফিলিং স্টেশনের সংখ্যা বাড়ছে। বিপিসি বলছে, ভেজাল প্রতিরোধ করা না গেলে আগামীতে তেল বিক্রি আরো কমবে।
বিপিসির চেয়ারম্যান এম বদরুদ্দোজা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘বেসরাকরি কোম্পানি ও ফুয়েল স্টেশনগুলো চুরি করছে। আমরা বিভিন্ন সময় তাদের ধরেছি। অনেকে ক্ষমা চাচ্ছে। চুরি রোধে ও ভেজাল মাঠ পর্যায়ে অভিযান পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়েছি।  বিপিসি, তেল বিপনণ কোম্পানি, জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)  সমন্বয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।’
অনিয়ম রোধে ‘গ্যাস কোম্পানিগুলো সব কনডেনসেট বিপিসির কাছে বিক্রি করবে, বেসরকারি রিফাইনারি বিপিসির কাছ থেকে কনডেনসেট কিনে নেবে’ এমন নির্দেশনার জন্য জ্বালানি বিভাগকে অনুরোধ করেছে বিপিসি।  এছাড়া বেসরকারি কারখানাগুলোতে উৎপাদিত সব জ্বালানি ও অজ্বালানি (সলভেন্ট) পণ্য বিপিসির কাছে বিক্রি বাধ্যতামূলক করার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি। গত ২৮ ডিসেম্বর জ্বালানি বিভাগে এ চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এখন বছরে গড়ে ৫৫ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে ১৪ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল পরিশোধন করা হয়। বেসরকারি রিফইনারিগুলো থেকেও কিছু তেল কেনা হয়। বাকিটা পরিশোধিত জ্বালানি তেল হিসেবে আমদানি করা হয়।
পেট্রোবাংলার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ৩ লাখ ২১ হাজার মেট্রিক টন কনডেনসেট উৎপাদন হয়েছে। গত অর্থবছরে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন। চলতি অর্থ বছরে এর পরিমাণ ৫ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছাবে বলে আশা করছে পেট্রোবাংলা।