ঢাকাSaturday , 26 December 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষরিত চুক্তি লঙ্ঘিত হচ্ছে না তো!

Link Copied!

RAMPALনিজস্ব প্রতিবেদক : ‘সঠিক আইনি প্রক্রিয়া’ অনুসরণ ছাড়াই বাস্তবায়নাধীন রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে সুন্দরবন নিয়ে শুধু দেশের ভেতরে নয় বহিরেও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা সুন্দরবন নিয়ে উদ্বেগের কথা সরকারকে অবহিত করেছে। পরিবেশবান্ধব নয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্র্থিক প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্প বিনিয়োগ করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে।
তবে সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, পরিবেশগত সব বিধান মেনেই এবং ক্ষতি হবে না- এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েই এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। উদ্বেগ প্রকাশকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রকল্পের পরিবেশবান্ধব কারিগরি দিক তুলে ধরে চিঠি দেয়া হয়েছে। প্রকল্পের অর্থায়নের বিষয়ও নিশ্চিত হয়েছে।
গত বছরের ১২ জুন জাতিসংঘের রামসার সচিবালয় রামপাল প্রকল্পের বিষয়ে সরকারের কাছে জানতে চায়। বনের ভেতর দিয়ে জাহাজ ও কার্গো চলাচলের প্রভাব সম্পর্কেও অবহিত করতে বলে সংস্থাটি। এ চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের ১ আগস্ট বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সুনির্দিষ্ট মতামত রামসারের কাছে পাঠায় সরকার।
জীববৈচিত্র্যপূর্ণ জলাভূমি রক্ষায় ইরানের রামসার শহরে ১৯৭২ সালে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সই হয়। শহরের নামে সেটি রামসার চুক্তি নামে পরিচিত। বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ চুক্তিতে সই করেন। মানুষের বা সরকারের কর্মকাণ্ডে রামসার স্বীকৃত এলাকার (বিশ্বের জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ) ক্ষতি হলে তা চুক্তির লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওর রামসার এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ওই চুক্তি লঙ্ঘন করেছে, এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে সুন্দরবন রামসার এলাকার সম্মান হারাবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘রামসার চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষা করা সরকারের কর্তব্য। তাই সরকারের উচিৎ সুন্দরবনের স্বার্থে রামপাল প্রকল্প বাতিল করা ।’
শুধু রামসার নয়, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারসহ (আইইউসিএন) আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এ প্রকল্পের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। আইইউসিএন রামপাল প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
রামপাল প্রকল্প বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের ক্ষতি করবে এমন আশঙ্কায় প্রকল্পের অংশীদার ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন (এনটিপিসি) বিনিয়োগ প্রত্যাহারের হুমকিও পেয়েছে। নরওয়ের সরকারি সংস্থা গভর্নমেন্ট পেনশন ফান্ড গ্লোবাল (জিপিএফজি) এনটিপিসিতে প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এই অর্থ নরওয়ের সরকারি কর্মচারীদের অবসর ভাতার টাকা। নরওয়ের সরকার রাষ্ট্রীয় অর্থ অনৈতিক, অমানবিক বা পরিবেশবিধ্বংসী কোনো খাতে বিনিয়োগ করে কি না তা কাউন্সিল অব এথিকস নামের আরেকটি সংস্থা খতিয়ে দেখে। সংস্থাটি গত বছরের ৩ ডিসেম্বর রামপাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে সুন্দরবনে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে তা নিয়ে ১৯ পৃষ্ঠার একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবনের বাঘ ও ডলফিনের জন্য সংরক্ষিত এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কয়লা সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে পরিবহন করা হবে, যাতে পরিবেশ দূষিত হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে নির্গত ছাইয়ের কারণে জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্থ হবে। সুন্দরবনের শ্বাসমূলীয় বৃক্ষ ও জলজ প্রাণী ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাবে।
এসব কারণে কাউন্সিল অব এথিকস তার সুপারিশে বলেছে, যেহেতু  রামপাল প্রকল্প সুন্দরবনের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে আর এনটিপিসি রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকল্পনা, নির্মাণ, পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত তাই এনটিপিসি থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করা উচিৎ।
জাতিসংঘের বিজ্ঞান ও পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোও একাধিকবার রামপাল প্রকল্প নিয়ে তাদের শঙ্কার কথা সরকারকে অবহিত করেছে।
এদিকে রামপাল প্রকল্পে বিনিয়োগ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। এ প্রকল্পে বিনিয়োগ করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে তিন ফরাসি ব্যাংক-ক্রেডিট এগ্রিকোল, সোসিয়েতে জেনারেলি ও বিএনপি পারিবাস ব্যাংক। গত জুনে ব্রিটেনের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার এক খবরে বলা হয়, ‘পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে ব্যাংকগুলো প্রস্তাবিত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ করবে না।
এছাড়া বিশ্বজুড়ে আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী জোট ব্যাংক ট্র্যাক রামপাল প্রকল্পের ব্যাপারে একটি সমীক্ষার ফল সম্প্রতি প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্পের সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণের জন্য ‘ইকুয়েটর প্রিন্সিপলস’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক যে মানদণ্ড রয়েছে, রামপালে প্রস্তাবিত তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র তাতে কোনোভাবেই উত্তীর্ণ হতে পারেনি ।
তবে এ বিষয়ে রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানির (বিআইএফপিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক উজ্জল কান্তি ভট্টাচার্য বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে আমরাতো কারও দ্বারস্থ হইনি। দরপত্র ডাকা হয়েছে। তাতে সাড়াও মিলেছে। অর্থায়নের নিশ্চয়তাও পাওয়া গেছে। শিগগিরই উপযুক্ত কোম্পানিকেই নির্মাণ কাজের দায়িত্ব দেয়া হবে। তাই কেউ বিনিয়োগ করতে না চাইলে সেটা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।’
কনজ্যুমার অ্যাসোয়িয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) এর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম বলেন, ‘এ  প্রকল্পের শুরু থেকেই বিতর্ক আছে। আইন ঠিকমত না মেনেই প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়েছে। পরিবেশ সমীক্ষা ঠিক মতো করা হয়নি। এ নিয়ে দেশি-বিদেশি পরিবেশবাদি সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময় প্রশ্ন তুলেছে।  ইউনেস্কো একাধিকবার সুন্দরবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে।’
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু নিয়ে কার্যক্রমের কারণে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছি। রামপালের কারণে এসব অর্জন যেনো ধুলিস্যাৎ না হয় তাই এ প্রকল্প নিয়ে বিকল্প ভাবনার সময় এসেছে।’
অবশ্য পরিবেশ ক্ষেতিগ্রস্ত হওয়ার যেকোনো ধরনের আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার উদ্বেগ প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, ‘পরিবেশের সব নিয়ম মেনেই এ প্রকল্পের কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাহিদা মতো সুন্দরবন রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেই রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে ।’