ঢাকাThursday , 24 December 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ফের মানবপাচারে সক্রিয় হচ্ছে দালালরা!

Link Copied!

Human Traffickingকক্সবাজার প্রতিনিধি : সাগর পথে মালয়েশিয়ায় মানবপাচারে চিহ্নিত দালালরা আবারো সক্রিয় হতে শুরু করেছে। আর এর মধ্যে বিজিবি সদস্যরা মালয়েশিয়াগামী ৪ যাত্রীকে উদ্ধার করেছে। এ ঘটনায় আটক করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত দুই দালালকেও। আর নতুন করে মানবপাচারের চেষ্টার ঘটনা শুনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট মহল।
টেকনাফ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে জানা যায়, বুধবার রাতে টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নে পৃথক অভিযান চালিয়ে ৪ জন মালয়েশিয়াগামীকে উদ্ধার এবং ২ জন দালালকে আটক করেছে বিজিবি ও পুলিশ।
বিজিবি টেকনাফস্থ ২নং ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. আবু জার আল জাহিদ জানান, গোপন সূত্রে তারা জানতে পারে সাবরাং কচুবনিয়া এলাকায় মানবপাচারকারীরা আবারো উপকূলীয় এলাকা দিয়ে পাচারের জন্য লোক জড়ো করছে। এমন খবরে  বুধবার রাতে ওই এলাকার একটি সুপারীবাগানে বিজিবির সদস্যরা অভিযান চালিয়ে ৪ যাত্রীকে উদ্ধার করে।
উদ্ধারকৃত যাত্রীরা হলেন- সুনামগঞ্জের ধিরাইয়ের মহব্বত আলীর ছেলে মো.ওয়াসিম আলী (১৯), একই এলাকার মৃত আব্দুস সত্তারের ছেলে মো. এখলাস মিয়া (৩৫), মৃত জমির উল্লাহের ছেলে মো.আবুল হোসেন (৪৫) ও ফরিদপুরের নগরকান্দার হালিম গাজীর ছেলে মো. টিটুল গাজী (২৫)।
উদ্ধারকৃতদের দেয়া তথ্যমতে, একই দিন ভোররাতে শাহপরীর দ্বীপ ডাঙ্গরপাড়ার মৃত অলি আহমদ ফকিরের ছেলে মানবপাচারকারী দালাল হোসেন আলীকে (৩৪) আটক করা হয়। এ ঘটনায় আরো ৪ জনকে পলাতক আসামি করে থানায় মামলা করা হয়েছে।
লে. কর্নেল মো. আবু জার আল জাহিদ আরো জানান, দালালরা গোপনে সক্রিয় হয়ে নতুন করে মানবপাচারের চেষ্টা করছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে বিজিবি টহল জোরদার করা হয়েছে।
টেকনাফ থানা হাজতে থাকা উদ্ধার যাত্রীরা সাংবাদিকদের জানান, তাদের গ্রামের বাড়ি থেকে বাসে প্রথমে কক্সবাজার আনা হয়। সেখান থেকে তাদের একটি ফিশিং ট্রলারে উঠানো হয়। সাগরে সাত দিন অবস্থান করার পর রাতের আঁধারে একটি ছোট নৌকা নিয়ে সৈকত দিয়ে টেকনাফের উপকূলে উঠানো হয়। সেখান থেকে দালাল হোসেন আলী একটি অটোরিকশায় সাবরাং কচুবনিয়া এলাকার একটি সুপারি বাগানে নিয়ে তাদের আটকে রাখে। পরে বিজিবি সদস্যরা তাদের উদ্ধার করে। এসব যাত্রীরা স্বীকার করেছে তাদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা ছিল।
টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান খন্দকার জানান, মানবপাচারকারীরা এলাকায় ফিরে এসেছে এমন খবর পায় পুলিশ। পরে বুধবার দুপুরে অভিযান চালিয়ে শাহপরীর দ্বীপ রাস্তার মাথায় অভিযান চালিয়ে দক্ষিণ পাড়ার মৃত আব্বাস মিয়ার ছেলে মো. ইসলামকে (৪৬) গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার দুই দালালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মানবপাচারের মামলা রয়েছে। তাদের আদালতে পাঠিয়ে রিমান্ডের আবেদন করা হবে। পাশাপাশি চিহ্নিত দালালদের গ্রেপ্তারের জন্য বিশেষ অভিযান অব্যাহত থাকবে। কোনোভাবে সাগর পথে মানবপাচার করতে দেওয়া হবেনা বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা মানবপাচারকারীরা সম্প্রতি ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এদের অনেকে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়ে মানবপাচারের চেষ্টার পাশাপাশি মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কথা বলা লোকজনকে নানাভাবে হয়রানি শুরু করেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক টেকনাফের এক ব্যক্তি জানান, ইতিমধ্যে টেকনাফের সাবরাং কচুবনিয়ার আবদুল হামিদ, সাব্বির আহমেদ, মো. আবদুল্লাহ, ইসলাম বাগু, সাদ্দাম, শাহপরীর দ্বীপের মো. ফেরুজ, আবু তাহের, হেলাল উদ্দিন, সৈয়দ উল্লাহ, আবুল কালাম, শাহাব মিয়া, মো. ইলিয়াছ, মো. কাশিম ও লম্বা সেলিম এলাকায় অবস্থান নিয়েছে। তারা নানাভাবে মানবপাচার করার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। তাদের আটক করা না হলে মানবপাচার ফের শুরু হবে পুরোদমে।
একই কথা বলেছেন উখিয়া ও রামুর একাধিক সূত্র। এসব মানুষ জানান, উখিয়া ও রামুর চিহ্নিত মানবপাচারকারী শীর্ষ গডফাদাররা জনসম্মুখে ঘুরতে শুরু করেছে।
এর মধ্যে উখিয়ার শীর্ষ মানবপাচারকারী রেজিয়া আক্তার বেবির স্বামী নুরুল কবির মানবপাচারের বিরুদ্ধে কাজ করা ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ- নুরুল কবিরের বাড়িতে মানবপাচারকারীরা প্রায় রাতে বৈঠক করেন। এরা নতুন করে মানবপাচারে চেষ্টাও করছে। এছাড়াও রামুর পশ্চিম গোয়ালিয়াপালং এলাকার তালিকাভুক্ত মানবপাচারকারী বাদশা ও মাহমুদুল হকের বাড়িতে দালালদের আনাগোনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রশাসনের একটি দায়িত্বশীল সংস্থার তথ্যমতে, গত এপ্রিল মাসে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় গণকবরের সন্ধান, গভীর সাগর থেকে দফায় দফায় ভাসমান অভিবাসী প্রত্যাশীদের উদ্ধার করা হয়। এরপর কঠোর অবস্থানে যান বাংলাদেশের প্রশাসন। বিশেষ করে মানবপাচারের রুট কক্সবাজারে শুরু হয় বিশেষ অভিযান। অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, বন্দুকযুদ্ধ এবং পাচারকারীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে নিহত হন ৬ জন মানবপাচারকারী।
এর মধ্যে গত ৮ মে টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন চিহ্নিত মানবপাচারকারী ধলু হোসেন, জাহাঙ্গীর আলম ও জাফর আলম। ১০ মে ডিবি পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ উখিয়ায় নিহত হন জাফর আলম মাঝি। ১২ মে কক্সবাজারের খুরুশকুলের বেলাল হোসেন সদর থানা পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ঈদগাঁওতে নিহত হন। ৮ জুন টেকনাফে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী দলের সদস্য রোহিজ্ঞা আমান উল্লাহ আনু নিহত হন। এরপর থেকে কক্সবাজারের চিহ্নিত এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত পাচারকারীরা আত্মগোপনে চলে যান। এতে ধারাবাহিক অভিযানে অনেক পাচারকারী আটকও হন। অনেকে পরে জমিনে মুক্তি পেয়ে এলাকায় অবস্থান করে মানবপাচার শুরু করার চেষ্টা করছে।
মানবপাচারবিরোধী কক্সবাজার জেলা ট্রান্সফোর্স কমিটির সদস্য দিদারুল আলম রাসেদ জানান, শীত মৌসুমকে মানবপাচারকারীরা টার্গেট করে থাকে। কিছুদিন মানবপাচার বন্ধ ছিল। এরপর নতুন করে পাচারের চেষ্টার খবরটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে পর্যটন মৌসুমে এমন চেষ্টা করা হলে পর্যটন খাতেও ক্ষতি হবে। এছাড়া বিভিন্নভাবে মানবপাচার বিরোধী কাজ পরিচালনাকারীদের হয়রানির খবরও পাওয়া যাচ্ছে। এর জন্য প্রশাসনকে আরো কঠোর হওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।
মানবপাচার নিয়ে কাজ পরিচালনাকারী বেসরকারি এনজিও সংস্থা ইপসার কর্মকর্তা সিরাজ উদ্দিন বেলাল জানান, ২ দালাল আটকের চেয়ে ৪ জন মালয়েশিয়াগামী যাত্রী উদ্ধারের ঘটনাটি আতঙ্কের। এতে করে মানবপাচারের চেষ্টা শুরু করার বিষয়টি প্রমাণ মিলেছে। এখন ভাবতে হবে মালয়েশিয়া কিংবা থাইল্যান্ডে নতুন করে মানুষ নেয়ার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে কিনা। এটা হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। এর জন্য প্রশাসনকে আরো বেশি সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার ন্যাশনাল প্রোগাম কর্মকর্তা আসিফ মুনীর জানান, শীতের মৌসুমে সমুদ্র শান্ত থাকায় পাচারকারীরাও সক্রিয় হয়। এসময় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। মানবপাচারের মতো ভয়াবহ ঘটনা যাতে না হয়, দালালরা যাতে নতুন করে সক্রিয় না হয় তার জন্য পুলিশ, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার শ্যামল কুমার নাথ জানান, ৪ জন উদ্ধারের বিষয়টি মানবপাচার শুরু হয়েছে বলা যাবে না। তবে এটিকে সতর্ক বার্তা হিসেবে নিয়ে পুলিশ আরো কঠোর অবস্থানে গেছে। এ সংবাদে পুলিশ বিশেষ অভিযানও শুরু করেছে।