আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরাক এবং সিরিয়াতে শক্ত ঘাঁটি তৈরি করা জঙ্গি সংগঠন আইএসকে রুখতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় শেষ পর্যন্ত সিরিয়া শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করেছে। শুধু ইরাক এবং সিরিয়াতেই নয় এই জঙ্গি সংগঠনটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য দিন দিন হুমকি হয়ে উঠছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সিরিয়াতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে কতটা কার্যকর হবে এই চুক্তি।
সিরিয়াতে বিবদমান দেশটির সরকার এবং এর বিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠিগুলোর ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে তাদের চাপ দিয়ে কোনো প্রতিশ্রুতিতে রাজি করানোর সুযোগ এই চুক্তিতে রাখা হয়নি।
বেসামরিক নাগরিক হত্যায় সিরীয় সরকারের বড় ধরনের দায় থাকা সত্ত্বেও পশ্চিমা দেশগুলো শুধু আইএসকে দমাতেই সিরিয়াতে হস্তক্ষেপ করবে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ফ্রান্স, ইরান, সৌদি আরব, তুর্কি এবং আরব লীগের সমন্বয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক সিরিয়া সহায়তা গোষ্ঠি (এইএসএসজি) আগামী জানুয়ারিতে শান্তি প্রক্রিয়া শুরুর জন্য একটি সীমা নির্ধারণ করেছে।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এটা আসলে একটা যুদ্ধ প্রক্রিয়া, কোনো শান্তি প্রক্রিয়া নয়। যুদ্ধ বিরতি প্রসঙ্গে দেয়া বিবৃতিতে দেখা যায়, আইএস, আল-নুসরা ফ্রন্ট বা অন্য সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর আওতার বাইরে থাকা সিরিয়ার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ এলাকায় এটি কার্যকর হবে। এই প্রক্রিয়ার ফলে সরকার এবং সরকারের পক্ষে আসতে রাজি বিরোধী সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবে এবং তারা ঐক্যবদ্ধভাবে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
জায়াশ আল ইসলাম এবং আহরার আল শামের মতো অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠিই আবার নতুন করে মূল ধারায় ফিরে আসছে। তারা এবং আসাদের নৃশংস বাহিনীও সিরিয়াতে গণহত্যা, ব্যারেল বোমা হামলা এবং রাসায়নিক বোমা হামলার মতো ঘটনার সাথে জড়িত।
এসব ঘটনায় আসাদের দায়-দায়িত্বে বিষয়টি আলোচনার টেবিলে আনা হয়নি। আলোচনা হয়েছে শুধু সিরিয়াতে নতুন একটি নির্বাচন নিয়ে। আলোচনায় রাখা হয়নি বিবদমান অন্য গোষ্ঠিগুলোকে। শুধু যুদ্ধ বিরতির জন্য নয়, যুদ্ধের আইন এবং বেসামরিক নাগরিদের প্রতি মানবাধিকার-সংক্রান্ত বিষয়গুলো মেনে চলার জন্য তাদের আলোচনায় রাখা দরকার ছিল।
এটাও স্পষ্ট করা দরকার, যেসব সিরীয় কর্মকর্তা নৃশংস তৎপরতায় জড়িত, নবগঠিত সিরিয়াতে তাদের কোনো ভূমিকা থাকবে না।
শান্তি নিশ্চিত করতে ১৪ নভেম্বরের ভিয়েনা স্টেটমেন্ট অনুসারে যেসব এলাকা সন্ত্রাসী হামলার বাইরে সেসব এলাকায় জাতিসংঘ-অনুমোদিত একটি পর্যবেক্ষক সংস্থা গঠন করা হবে। সন্দেহ নেই, এতে প্রতিবেশি দেশগুলো সিরীয় শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে একটি যৌক্তিকতা খুঁজে পাবে।
বেসামরিক লোকদের জন্য কোন এলাকাটি সত্যিকার অর্থেই নিরাপদ তা একটি জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। আর ওইসব ‘নিরাপদ এলাকার’ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে অবস্থা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী স্রেব্রেনিকার মতো ভয়াবহ হবে।
যুদ্ধ চলাকালীন সিরীয় নাগরিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি ভিয়েনা স্টেটমেন্টে উল্লেখ করা হয়নি। এক্ষেত্রে যদি যুদ্ধ বিরতি কার্যকর করা গেলে তা কিছুটা সহায়ক হতে পারে। তবুও সিরিয়ার সব জায়গায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একান্ত জরুরী।
সিরিয়ার আটককেন্দ্রগুলোতে বন্দি থাকা সাংবাদিক, আইনজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের মুক্তি এবং সব আটককেন্দ্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করার জন্যও দেশটির সরকারকে চাপ দেয়া উচিৎ।
প্রস্তাবিত চুক্তিতে ১৮ মাসে শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া অর্থবহ করতে হলে শান্তিপূর্ণ কার্যক্রম দমনে ব্যবহৃত আইন বাতিল করতে হবে।
শান্তি ফিনিয়ে আনার লক্ষ্যে নতুন সংবিধানের খসড়া প্রণয়নে ভিয়েনা স্টেটমেন্টে খুব সামান্য সময় নেয়া হয়েছে। ইয়েমেন, লিবিয়া, ইরাক এবং মিশরের ক্ষেত্রে এ ধরনের তাড়াহুড়া নতুন সমস্যা সৃষ্টি করেছে। নতুন সংবিধানের খসড়া প্রণয়নের আগে বিভিন্ন দেশে থাকা সিরীয় শরণার্থীসহ সিরিয়ার সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
সিরিয়ায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে এসব প্রক্রিয়া অনুসরণ করা না হলে শান্তি চুক্তি কোনো কাজে আসবে না। সিরিয়ার অবস্থা থেকে যাবে ভঙ্গুর এবং অনিশ্চিত।

