নিজস্ব প্রতিবেদক : বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নিয়ে বছরের অধিকাংশ সময়ই সবার দৃষ্টি ছিলো উচ্চ আদালতের দিকে। ঐতিহাসিক যুদ্ধাপরাধ মামলার আপিলের রায়, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগে জিয়া চ্যারিটেবল ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার আবেদন খারিজসহ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার অধিকাংশ খবরই মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। শুধু তাই নয় এ সরকারের আগের আমলের ঐতিহাসিক বিডিআর বিদ্রোহের মামলার আপিল, চাঞ্চল্যকর রাজন রাকিব ও ঐশীর মামলার বিষয়গুলোও ইতোমধ্যে উচ্চ আদালতে এসে পৌঁছেছে এবং সেগুলোর প্রতিবেদনও কাভারেজ দেয়া হয়েছে মিডিয়ায়। এ বছর উচ্চ আদালতের খবরের মধ্যে আরো স্থান পেয়েছে মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ও আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর মামলার খবরাখবর।
মায়ার মন্ত্রীত্ব নিয়ে রিট খারিজ: আওয়ামী লীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীত্ব পদে বহাল থাকার বৈধতা নিয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট আবেদন করা হয়। শুনানির এক পর্যায়ে হাইকোর্টের একটি ডিভিশন বেঞ্চ এ রিট আবেদনটির ওপর দ্বিধাবিভক্ত আদেশ দেন। এরপর এটি প্রধান বিচারপতির নির্দেশক্রমে চলে যায় তৃতীয় একটি বৃহত্তর বেঞ্চে। শুনানি শেষে আদালত এ রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন। যার ফলে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া মন্ত্রী পদে বহাল থাকেন। মায়ার মন্ত্রী পদের বৈধতা নিয়ে গত ৭ জুলাই এ রিট আবেদনটি দায়ের করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ।
২০০৭ সালের ১৩ জুন জরুরি অবস্থার সময় দুর্নীতি দমন কমিশনের করা ওই মামলায় সম্পদের তথ্য গোপন ও অবৈধভাবে ২৯ লাখ টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ আনা হয় মায়ার বিরুদ্ধে। পরের বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত দুই ধারায় মায়াকে মোট ১৩ বছরের কারাদণ্ড এবং পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করে। মায়া ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে গেলে তার আবেদনের শুনানি নিয়ে ২০১০ সালের ২৭ অক্টোবর একটি বেঞ্চ তাকে খালাস দেয়, যা বাতিল হয়ে যায় আপিল বিভাগের আদেশে। ওই আদেশের পর ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মায়ার মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য পদে থাকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আপিল বিভাগের আদেশের পর বিএনপিও মায়ার পদত্যাগের দাবি তোলো। এরই ধারাবাহিকতাই রিট আবেদনটি করা হয়।
মন্ত্রী পদ গেলেও উচ্চ আদালতে জামিন মিলল লতিফ সিদ্দিকীর : হজ্ব ও তাবলিগ জামায়াত নিয়ে কটূক্তিপূর্ণ মন্তব্য করায় এ সরকারের দাপুটে মন্ত্রী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক আন্দোলন। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে সারাদেশে প্রায় ৩৭টি মামলা হয়। এতে করে সরকার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রীত্ব ও দল থেকে পদত্যাগে বাধ্য করাতে। এক পর্যায়ে লতিফকে কারাগারে পাঠায় সরকার, কিছুদিন পার হতে না হতেই উচ্চ আদালত থেকে ১০ মামলায় জামিন পান লতিফ। পরে আরো ৭ মামলায় জামিন হয় তার। এক পর্যায়ে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বের হয়ে আসেন মন্ত্রীত্ব হারানো এই প্রভাবশালী নেতা। সম্প্রতি সেই ১৭ মামলায় জামিনের মেয়াদ বৃদ্ধি করেন লতিফ। হাইকোর্টের বিচারপতি মো. নিজামুল হক ও বিচারপতি মো. ফরিদ আহমদ শিবলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ লতিফকে জামিন দেন। আইনজীবী হিসেবে উচ্চ আদালতে লতিফ সিদ্দিকীর পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
গত বছর ২৯ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে টাঙ্গাইল সমিতির এক মতবিনিময় সভায় হজ্ব ও তাবলিগ জামায়াত নিয়ে কটূক্তিপূর্ণ মন্তব্য করে তখনকার টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। এ ঘটনায় ঢাকার সিএমএম আদালতে তার বিরুদ্ধে ৭টি মামলা দায়ের করে সংক্ষুব্ধ মানুষ। এছাড়াও সারাদেশে বিভিন্ন জেলায়ও অন্তত ২৯ মামলা হয়। দেশে ফেরার পরপরই ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠন ও রাজনৈতিক দল তার গ্রেপ্তার দাবি জানায়। পরবর্তীতে তীব্র সমালোচনার মুখে লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে সরানোর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ থেকে তার সদস্যপদ বাতিল করা হয়।
গত ২৩ নভেম্বর ভারত থেকে দেশে ফেরেন লতিফ সিদ্দিকী। গত ২৬ নভেম্বর ধানমণ্ডি থানায় আত্মসমর্পণ করার পর লতিফ সিদ্দিকীকে কারাগারে পাঠানো হয়। উচ্চ আদালত থেকে এ সব মামলায় জামিন পেয়ে তিনি বেরিয়ে আসেন। বর্তমানে তিনি কারাগারের বাইরে রয়েছেন।
‘বনখেকো’ ওসমান গনির ১২ বছরের সাজা বহাল : সাবেক প্রধান বন সংরক্ষক ওসমান গনিকে দুর্নীতির মামলায় নিম্ন আদালতের দেয়া ১২ বছরের কারাদণ্ডের রায় বহাল রেখেছেন হাই কোর্ট। দুর্নীতির দায়ে আলোচিত ‘বনখেকো’ গনির করা আপিল খারিজ করে বিচারপতি রুহুল কুদ্দুস ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ১৫ ডিসেম্বর এই রায় দেন।
জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও সম্পত্তির হিসাব বিবরণীতে তথ্য গোপনের অভিযোগে দুদকের করা এই মামলায় গনিকে ১২ বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে করা মামলায় ২০০৮ সালের ৫ জুন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-১০ এর বিচারক একেএম আরিফুর রহমান এ রায় দেন। ওই রায়ে স্বামীকে ‘দুর্নীতিতে সহযোগিতা’ করার দায়ে ওসমান গনির স্ত্রী মহসিন আরা গনিকেও তিন বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। গনি কারাগারে থাকলেও তার স্ত্রী পলাতক থাকায় ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ পাননি।
সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের মধ্যে ২০০৭ সালের ২৯ মে ওসমান গনির উত্তরার বাসায় অভিযান চালিয়ে যৌথ বাহিনীর সদস্যরা নগদ ৯৯ লাখ ৮৯ হাজার ৬০০ টাকা, ১৩০০ ডলার, ৩ হাজার মালয়েশিয়ান রিংগিত ও প্রচুর স্বর্ণালংকার উদ্ধার করে। ওসমান গনির বিছানার তোশক, বালিশ, চালের ড্রাম, স্টোর রুমে রাখা ট্রাংক ও স্টিল আলমারির চোরাকুঠুরিতে এসব মুদ্রা পাওয়া যায়।
এ বছরই শেষ হতে পারে বিডিআর বিদ্রোহ মামলার আপিল : বহুল আলোচিত বিডিআর বিদ্রোহ মামলার আপিল শেষ হতে চলেছে, বর্তমানে মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। গত ১৮ জানুয়ারি থেকে এ আপিলের শুনানি শুরু হয়। পিলখানা বিডিআর হত্যা মামলার চার ধরনের আপিল হয়েছে। সবগুলো আপিলের শুনানি একসঙ্গে চলছে। বাদিপক্ষের ৬৫৪ জন সাক্ষীর বক্তব্য ও বিচারিক আদালতের রায় আদালতে উপস্থাপন শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয় পেপারবুক পড়া। পিলখানায় বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মামলায় সব ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর এ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। আগামী ৪-৫ দিনের মধ্যেই যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হবে বলে আশা করছেন তারা। এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘আমারা আশা করছি, অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এ মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করতে পারব। ১৫২ জনের দণ্ড বিভিন্ন কারণে দেয়া হয়েছে। কেউ সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন, কেউ অস্ত্র নিয়ে দরবার হলের আশপাশে ছিলেন, কেউ পিলখানার আশপাশে ঘোরাফেরা করেছেন। আবার কেউ লাশ গুম করার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।’
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এ বিচার হচ্ছে সাধারণ আইনে। তাই সব রকমের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এ বিচার সম্পন্ন হয়েছে। নিয়ম হলো- নিম্ন আদালত কোনো আদেশ দিলে হাইকোর্ট যতক্ষণ সে মৃত্যুদণ্ড কনফার্ম না করে ততক্ষণ সে আদেশ কার্যকর হয় না।’
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। এ ঘটনায় ৮৫০ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর রায় দেন ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালত। এর মধ্যে বন্দি অবস্থায় চারজন মারা গেছেন। বাকি ৮৪৬ জন আসামির মধ্যে ১৫২ জনের ফাঁসি, ১৬১ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় ২৫৬ জনের। খালাস পান ২৭৭ জন। মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত ১৫২ আসামির মধ্যে ১৪ জন পলাতক। অন্যদিকে রায়ের পর মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত এসব আসামিদের মধ্যে কারাগারে থাকা ১৪১ জনের পক্ষে জেল আপিল এবং রাষ্ট্রপক্ষে ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের বিষয়ে হাইকোর্টে একটি আবেদন করা হয়। বাকি সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে ১১৪ জন আপিল করেছেন। আর খালাস পাওয়াদের মধ্যে ৬৯ জনের বিরুদ্ধে আপিল করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ। গত ১৮ জানুয়ারি চাঞ্চল্যকর মামলায় করা আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়।
রাজন-রাকিব হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স উচ্চ আদালতে : চাঞ্চল্যকর রাজন ও রাকিব হত্যা মামলায় ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে এসে পৌঁছেছে। সিলেট ও খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালত থেকে দুইটি হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্সের নথি হাইকোর্টে পাঠিয়েছেন। নথিগুলো উচ্চ আদালতে আসার পর সেগুলো নিয়ে পেপার বুক তৈরির কাজ চলছে। সাধারণত হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে নিম্ন আদালতের ফাঁসির রায় অনুমোদনের জন্য হাইকোর্টের অনুমতি লাগে। এবং নিম্ন আদালত থেকে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। গত ৮ নভেম্বর সিলেটের শেখ সামিউল আলম রাজন ও খুলনার রাকিব হাওলাদার হত্যা মামলায় ৬ জনের ফাঁসির রায় ঘোষণা করেন বিচারিক আদালত।
উচ্চ আদালতে আপিল করেছেন ঐশী : পুলিশ কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমান হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তাদের মেয়ে ঐশী রহমান খালাস চেয়ে হাইকোর্টে আপিল করেছেন। নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে ২৫টি যুক্তি দেখিয়ে ২৫ পৃষ্ঠার আপিল করেছেন এই ঐশী। ঐশীর আইনজীবীর দাবি, নিম্ন আদালতে ঐশীর ডিএনএ টেস্ট সঠিক ছিল না। ঐশী অপ্রাপ্তবয়স্ক। তাই তার বিচার হওয়া উচিত শিশু ট্রাইব্যুনালে। যে আদালতে বিচার হয়েছে, তা সঠিক ছিল না। বাবা-মাকে হত্যার দায়ে ঐশী রহমানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রদান করে বিচারিক আদালতের দেয়া রায়ের নথিসহ ডেথ রেফারেন্স ১৯ নভেম্বর হাইকোর্টে এসে পৌঁছে।
পুলিশ দম্পতি হত্যা মামলায় চলতি বছরের ১২ নভেম্বর নিহতদের একমাত্র মেয়ে ঐশী রহমানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেন ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাঈদ আহমেদ। ঐশীকে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি ২০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়। খুনের ঘটনার পর ঐশীদের আশ্রয় দেয়ার অপরাধে মামলার অন্য আসামি ঐশীর বন্ধু মিজানুর রহমান রনিকে দুবছরের কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানা অনাদায়ে তাকে আরও একমাস কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। এ মামলার আরেক আসামি ঐশীর বন্ধু আসাদুজ্জামান জনি খালাস পেয়েছেন। দুটি খুনের জন্য পৃথক দুটি অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। দুটি অপরাধের জন্য আলাদা করে ঐশীকে দুবার ফাঁসি ও দুবারে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ১৬ আগস্ট রাজধানীর মালিবাগের চামেলীবাগে নিজেদের বাসা থেকে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের (পলিটিক্যাল শাখা) ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রী স্বপ্না রহমানের ক্ষত-বিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এর পরদিন ঐশী গৃহকর্মী সুমীকে নিয়ে রমনা থানায় আত্নসমর্পণ করেন। সে মামলায় বিচারের পর ঐশীকে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসির সাজা দেয়া হয় তাকে। সে সাজার আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন ঐশী।
সাতখুনের মামলায় অথিকতর তদন্ত করা যাবে : নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলায় পুলিশ চাইলে অধিকতর তদন্ত করতে পারবে এজন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশনার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন হাইকোর্ট। নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটির করা এক আবেদনের নিষ্পত্তি করে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও আমির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ নির্দেশা দেন। আদালতের তার নির্দেশনায় বলেন, সাতখুনের এ মামলায় পুলিশের দেয়া চার্জশিটে যে সমস্ত ত্রুটি রয়েছে তা সংশোধন করতে আদালতের নির্দেশনার প্রয়োজন নেই। তদন্ত কর্মকর্তা ইচ্ছে করলে পুনরায় তদন্ত করে অভিযোগপত্র সংশোধন করতে পারবে। এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিকে বাদ রেখে পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে করা নারাজি আবেদন নিম্ন আদালতে খারিজ হলে গত ২৩ নভেম্বর হাইকোর্টে আবেদন করেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী বিউটি। এ বিষয়ে গত ১ ডিসেম্বর শুনানিতে মামলার অভিযোগপত্রে ‘ত্রুটি রয়েছে’ বলে আদালত পর্যবেক্ষণ দিলেও অধিকতর তদন্তের ফাঁকে বিচার যাতে বিলম্বিত না হয় সে বিষয়ে গুরুত্ব দেয় হাইকোর্ট।
২০১৪ সালের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জের কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও তার চার সঙ্গী এবং আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালককে অপহরণের পর হত্যা করা হয়। তখন নজরুলের স্ত্রী বিউটি নারায়ণগঞ্জের আরেক কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ছয়জনকে আসামি করে মামলা করেন। সেইসঙ্গে র্যাবের কর্মকর্তাদেরও হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলে নজরুলের পরিবার। প্রায় এক বছর পর গত ৮ এপ্রিল নূর হোসেন ও র্যাব কর্মকর্তাসহ ৩৫ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ, যাতে বাদ পড়েন এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামি। বাদ পড়া এ পাঁচ আসামি হলেন- সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন মিয়া, হাসমত আলী হাসু, আমিনুল ইসলাম রাজু, আনোয়ার হোসেন আশিক ও ইকবাল হোসেন। এজাহারভুক্ত আসামিদের বাদ দেয়ায় ভিযোগপত্র প্রত্যাখ্যান করে নারাজি আবেদন করেন বাদী বিউটি। নারায়ণগঞ্জের আদালত তা খারিজ করে দেয়ার পর হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন তিনি। পরে শুনানি করে হাইকোর্ট তার নির্দেশনায় এ আদেশ দেন।
জিয়া চ্যারিটেবল ও অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা চলবে : তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা জিয়া চ্যারিটেবল ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার কার্যক্রম বিচারিক আদালতে চলবে মর্মে গত ১৮ জুন রায় ঘোষণা করেছেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ।
প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বাধীন পাঁচ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এর আগে এ নিয়ে হাইকোর্টে দুটি রিট আবেদন করেছিলেন খালেদা জিয়া। হাইকোর্ট তা খারিজ করে দেন। ওই খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে দুটি লিভ টু আপিল করেন তিনি। সেটিও খারিজ করে দেয় আদালত।
প্রসঙ্গত, এই দুই মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশ বাতিল চেয়ে খালেদা জিয়া পৃথক দুটি আবেদন (রিভিশন) করেছিলেন। হাইকোর্ট তা খারিজ করেন। এ খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে গত ৭ জুলাই আরও দুটি লিভ টু আপিল করা হয়। যার ফলে এ দুটি মামলা খালেদার বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতে চলতে বাধা নেই বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তিনি বলেন, যেহেতু এই দুটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো স্থগিতাদেশ নেই, তাই মামলার কার্যক্রম চলতে বাধা নেই। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমানসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ মামলায় ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে তিন কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ এনে দুদক অপর মামলাটি করে ২০১১ সালের ৮ আগস্ট। তেজগাঁও থানায় করা এ মামলায় খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালতে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। চলতি বছরের ১৯ মার্চ ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩ এই দুটি মামলার অভিযোগ গঠন করেন। অভিযোগ গঠনের আদেশ বাতিল চেয়ে খালেদা জিয়া হাইকোর্টে দুটি আবেদন করেন। তা ২৩ এপ্রিল খারিজ হয়। এরপর দুই মামলায় বিচারক নিয়োগ-প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১২ মে দুটি রিট করেন বিএনপির চেয়ারপারসন। গত ২৫ মে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এ বিষয়ে বিভক্ত আদেশ দেন। পরে আবেদন দুটি নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টের একটি একক বেঞ্চে পাঠানো হয়। ১৯ জুন ওই একক বেঞ্চ রিট দুটি খারিজ করেন। এ খারিজ আদেশ স্থগিত চেয়ে লিভ টু আপিল করা হয়। এর ওপর ৪ সেপ্টেম্বর শুনানি শুরু হয়ে ১১ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। খালেদার বিরুদ্ধে এ মামলা দুইট পুরান ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসাসংলগ্ন মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত-৩-এর অস্থায়ী এজলাসে মামলা দুটি সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে।

