দিনাজপুর প্রতিনিধি : চুয়াল্লিশ বছরে করতোয়া ও পুনর্ভবার কত জল গড়িয়ে গেছে হিসেব নেই। দেশদ্রোহী রাজাকাররা অন্যের সম্পদ লুট করে আজ অঢেল সম্পদের মালিক। বহাল তবিয়তে আছে তারা। কিন্তু ১৯৭১ সালের খান সেনাদের হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হামিদার জীবন যেন অভাব আর অনটনের দুর্ভেদ্য জালে আটকা পড়ে আছে। আজও মেলেনি কোনো স্বীকৃতি বা পাননি কোনো সরকারি সাহায্য-সহযোগিতা।
দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার পৌর এলাকার স্বজনপুকুর বুন্দীপাড়া গ্রামের মৃত মনছুর আলীর স্ত্রী হামিদা। প্রায় ৭০ এর কাছাকাছি বয়স এবং ১০ বছর আগে স্বামী মারা গেলেও এখনও তার কপালে জোটেনি বয়স্ক কিংবা বিধবা ভাতা। তার ২ ছেলে দিনমজুর আনিছুর রহমান ও বেলাল হোসেন। দিনমজুরের কাজ করে নিজ নিজ পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় হামিদা বেওয়া জীবন চলে অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে।
৭১ সালের সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হামিদা। তিনি জানান, সেদিন বিকেলে হঠাৎ খানসেনারা তাদের গ্রাম আক্রমণ করে। গ্রামের অন্যান্য বাসিন্দারা পালিয়ে গেলেও তারা পালানোর আগেই খানসেনাদের হাতে ধরা পড়েন। তাদের ধরে নিয়ে যায় স্বজনপুকুর গ্রামের পাশে খানসেনাদের ক্যাম্প জিএম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে তার সামনে তার স্বামীকে বেদমভাবে মারপিট করে আহত করে। এ সময় তিনি খান সেনাদের পায়ে ধরে তার স্বামীর প্রাণভিক্ষা চান। কিন্তু কেউই তার আর্তনাদ শোনেনি। বরং খানসেনাদের বুটের লাথি আর বন্দুকের বাটের আঘাতে মারাত্মক আহত হয় তার স্বামী মনসুর আলী।
তিনি আরও জানান, এরপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে শুরু হয় তার উপর পাশবিক নির্যাতন। এভাবে কয়েক দিন কাটার পর তাদের শর্ত দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। সেই দিনের খানসেনাদের নির্যাতনের ফলে পরবর্তীতে তার স্বামী অন্ধ হয়ে যান। তারপর থেকে অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে হামিদা। গত ১০ বছর আগে স্বামী মনছুর আলী মারা যান। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার নামে হয়নি বিধবা কিংবা বয়স্ক ভাতার কার্ড। জীবনের এই শেষ সময় এসেও অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে তার জীবন চলছে।
হামিদা বেওয়া বলেন, ‘লোকলজ্জার ভয়ে সেই দিনের সেসব কথা কাউকে জানাইনি। তারপরেও গ্রামের লোকরা একে অন্যর কাছে বলাবলি করতো। ঘটনাটি সবাই জানে কিন্তু কেউ কোনোদিন আমার খবর নিতে আসেননি। আমার দু’ছেলে দিনমজুরি করে। তাদের আয় দিয়ে কোনোমতে জীবন চলে তাদের। কিন্তু আমি অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে বেঁচে আছি।’
দেশের জন্য সম্ভ্রম বিলিয়ে দেয়া হামিদা খাতুনরা কেন আজো রাষ্ট্রের চোখে অবহেলিত এ প্রশ্ন স্থানীয়দের।

