নিজস্ব প্রতিবেদক : ঘাসের ডগায় জমে আছে হেমন্তের শিশির। তেমন শীত নেই। তবু মনে হলো, হালকা শীতছোঁয়া সকালে আড়মোড়া ভাঙেনি অনেকের। রাজধানীর রাস্তাজুড়ে প্রায় নিরবতা। খটকা লাগল। নিরবতা কেন? রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে গিয়েই তা বোঝা গেল। এখানে লোকে লোকারণ্য। কুঁড়ি থেকে পাপড়ি, কচি-বুড়ো সবাই এসেছেন। সবার হাতে ফুলে। বুকে কালো ব্যাচ। মুখে দাবি, যারা নৃশংসভাবে জাতির সূর্যসন্তানদের হত্যা করেছিল তাদের কঠোর শাস্তি যেন হয়।
প্রতিবছরই ফুলভারে শ্রদ্ধার্পিত হয় শহীদবেদি। থাকে ভারাক্রান্ত মন। তবে এবার হারানোর বেদনার সঙ্গে আনন্দও যেন আছে। কিছুদিন আগেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে দুজন যুদ্ধাপরাধীর। সেই কলঙ্কমুক্তির আনন্দ যেন সবার চোখেমুখে ছড়িয়ে আছে।
রোববার মধ্যরাত থেকেই রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নির্মিত শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে মানুষ আসতে থাকে। রাত ১২টা ০১ মিনিটে স্থানীয় সাংসদ ও সাবেক স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের নেতৃত্বে ফুল দিয়ে ও মোমবাতি জ্বালিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু হয়। এ সময় অগণন মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে স্মৃতিসৌধ চত্বর।
রায়েরবাজারে আবার শ্রদ্ধা জানানোর পর্ব শুরু হয় সোমবার সকাল ৮টা থেকে। ফুলে ফুলে ঢেকে যায় স্মৃতিসৌধের বেদি। সেখানে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের মেয়ে শমী কায়সার, ডা. আবদুল আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী, সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে তৌহীদ রেজা নূরসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষেরা।
শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধার সঙ্গে শহীদবেদিতে ফুল দেন পরিবারের সদস্যবৃন্দ। ফুলেল শ্রদ্ধা শেষে তারা বেদির সামনে দাঁড়িয়ে তারা এক মিনিট নিরবতা পালন করেন।
বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাতে এসে হৃদয়-ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েন শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. আলিম চৌধুরীর কন্যা ড. নুজহাত চৌধুরী। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের বাবারা শুয়ে আছেন। এখানে আসলে খুব কষ্ট হয়। এখানকার শিশুদের দেখলে বাবাদের কথা মনে পড়ে।’
অন্যদিকে শ্রদ্ধা জানাতে মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধেও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ঢল নামে। ভোর থেকেই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতা ও সদস্যরা শ্রদ্ধা জানাতে আসেন সেখানে।
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সকাল ৮টা ০১ মিনিটে একসঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বেদিতে ওঠেন। এর পর প্রথমে রাষ্ট্রপতি ও পরে প্রধানমন্ত্রী ফুলেল শ্রদ্ধা জানান।
এর পর ৮টা ২৫ মিনিটে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে ফুলেল শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের হাতে ছিল ফুলের তোড়া আর মুখে ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি। অনেকে বুকে ধারণ করেছেন কালো ব্যাচ। শ্রদ্ধা জানানোর পর অনেকেই গেয়েছেন দেশের গান। তাদের চোখে দীপ্তি, কণ্ঠে দেশপ্রেমের নির্মল সুর।
শ্রদ্ধা জানাতে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জহুরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম রানা বলেন, ‘জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। বাঙালিকে মেধাশূন্য করার চক্রান্তের অংশ হিসেবে যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে সেইসব কুলাঙ্গার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানাই।’
রানার মতো একই দাবি করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাহাবুবুল আলম। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে হয়েছে তা আমি দেখিনি। একাত্তরের চেতনা ধারণ করে আমরা এসেছি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে।’
শ্রদ্ধা জানাতে এসে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান প্রতিশ্রুতি দেন, ‘আমরা যুদ্ধাপরাধীর বিচার শুরু করেছি। এই বিচার শেষ করব। পলাতক যুদ্ধাপরাধীদের দেশে এনে বিচারের সম্মুখীন করব।’
কিছুদিন আগেই দুই যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এতে আনন্দ ও কলঙ্কমুক্তির কথা জানিয়েছেন তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা। নৌ পরিবহনমন্ত্রীর এ আশ্বাসে তৃপ্ত নন তারা। তাদের দাবি, খুব দ্রুত যেন তাদের দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। না হলে এই আপন আলোয় আলোকিত মানুষগুলোর আত্মা শান্তি পাবে না। আর এ জাতি কখনোই যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করবে না।
এদিকে, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে জনতার স্রোত বাড়তে থাকে। স্মৃতিসৌধ চত্বরের দক্ষিণ পাশে বিশালাকার ডিজিটাল প্রিন্টে মুক্তিযুদ্ধের ছবি ও সংবাদপত্রের কাটিং প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। উত্তর পাশে বসানো হয় বুদ্ধিজীবীদের প্রতিকৃতি।
একাত্তরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে বধ্যভূমিতে যেভাবে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল, অভিনয়ের মাধ্যমে সেই প্রতীকী দৃশ্য রচনা করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা জানায় খেলাঘরের সদস্যরা।
সেখানে ইটের স্তূপ দিয়ে তৈরি করা প্রতীকী বধ্যভূমিতে রক্তমাখা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মরদেহ সেজে শুয়েছিল শিশুরা। এ সময় খোলা জায়গায় সারিবদ্ধভাবে রাখা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ছবি।
রাজধানীর রায়েরবাজার বধ্যভূমির দক্ষিণ প্রাঙ্গণে মূল বেদির পাশে একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে চন্দ্রালোক ও সূর্যালোক খেলাঘর আসরের শিশুরা এ প্রতীকী বধ্যভূমি রচনা করে। স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে আসা হাজারো মানুষকে সেখানেও শ্রদ্ধা জানাতে দেখা যায়।
সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী এ আয়োজন করে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর। স্থানীয় ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার তারেকুজ্জামান রাজিব প্রতীকী বধ্যভূমিতে অংশ নেয়া শিশুদের জলপান করিয়ে এ আয়োজনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

