রাজবাড়ী প্রতিনিধি : প্রতিটি বাঙালি মেয়েরই স্বপ্ন থাকে স্বামীর সংসারে সুখে ঘর বাঁধবার। তেমনই সুখের স্বপ্নে ঘরও বেঁধেছিলেন নুরজাহান বেগম। কিন্তু তাকে ফিরে আসতে হয়েছে শ্বশুরবাড়ি থেকে। তার অপরাধ তিনি বীরাঙ্গনা।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে দীর্ঘ ২ মাস বন্দি ছিলেন নুরজাহান। ফিরে আসেন ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি ধারণ করে। স্বাধীনতাযুদ্ধের ৪৪ বছরে এসে কিছু সুবিধা পেলেও সরকারিভাবে সেই বীরাঙ্গনার স্বীকৃতিটুকু মেলেনি তার।
যুদ্ধের সময় নুরজাহান বেগমের বয়স ছিল ১৪ বছর। তিনি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং মাগুরা উপজেলার শ্রীপুর উপজেলা চৌগাছি গ্রামের মনির উদ্দিন মোল্লার ছেলে মোকাররম মোল্লার স্ত্রী।
কথা হয় এই বীরাঙ্গনার সঙ্গে। তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় কিশোরী হলেও আমাকে রেহাই দেয়নি নরপশু রাজাকাররা। মা ও ছোট ভাইকে মারধর করে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় তাকে। তুলে দেয় অবাঙালি বিহারিদের হাতে। একটি বন্ধ ঘরে আটকে রাখা হয়। রাত হতেই নরপশুরা হায়েনার মতো হামলে পড়ত তার ওপর। চিৎকার করে কাঁদলেও বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি কেউ। দিনে এক বেলা অথবা দুই বেলা খাবার দিত। এমনি দুই মাস ধরে অমানবিক নির্যাতন সইতে হয়েছে তাকে। তার মতো আরো ১২-১৩ জন নারীকে সে সময় আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। তার মধ্যে দুজন মারাও যায়।
সেই ভয়ংকর দিনের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে মনের অজান্তে কেঁদে ফেলেন এই বীরাঙ্গনা।
বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা আমাকে উদ্ধার করে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পর শুরু হয় আমার আরেক জীবনযুদ্ধ। টানা এক মাস চিকিৎসা নিতে হয় আমাকে। সুস্থ হওয়ার পর বুঝতে পারি আমি যেন চিড়িয়াখানার কোনো জন্তু। প্রতিবেশীরা সামনে কিছু না বললেও লুকিয়ে লুকিয়ে আমাকে দেখত। মাঝেমধ্যেই বলত কটুকথা। মনের আবেগে জীবন ত্যাগের নানা রকম কথা চিন্তা করলেও আমার বৃদ্ধ মা মানু বিবির মুখের দিকে তাকিয়ে ভুলে যেতাম সেসব ভাবনা। চিন্তা শুধু আমিই করতাম না। আমাকে নিয়ে মা এবং ছোট ভাইও করত সমচিন্তা। নরপশুদের হাত থেকে জীবনে বেঁচে থাকা এই আমাকে কে করবে বিয়ে। অবশেষে ১৯৭৩ সালে মাগুরা জেলার মনির উদ্দিনের ছেলে মোকারম মোল্লার সঙ্গে বিয়ে হয় আমার। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস স্বামীর বাড়ি থেকে মেনে নেওয়া হয়নি আমাকে। যে কারণে ওই বাড়িতে যাওয়া হয়নি আমার। একই সঙ্গে আমার স্বামীকে ছেড়ে আসতে হয়েছে তার বাবার বাড়ি।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমি ভাইয়ের দেওয়া ১২ শতাংশ জমিতে কোনোরকমে ঘর করে বসবাস করছি। আমার এক ছেলে, চার মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি, আর ছেলেকে কাজের সন্ধানে ভাইদের সহযোগিতায় বিদেশ পাঠিয়েছি। সরকারিভাবে উপজেলা প্রশাসন জমি বন্দোবস্ত দিলেও তার দখলদারিত্ব এখনো বুঝে পাইনি।’
বীরাঙ্গনা নুরজাহানের স্বামী মোকারম বলেন, ‘বয়সে কিশোর হলেও স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মাগুরার চৌগাছিতে আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। তাই মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার প্রতি ছিল আমার দুর্বলতা। নুরজাহানের সন্ধান পেয়ে আমি সিদ্ধান্ত নেই ওকে বিয়ে করার। তবে বিয়ের পর নানাজনের কাছ থেকে শুনতে হয়েছে কটুকথা। আমি বাবা-মার একমাত্র ছেলে সন্তান হওয়ায় তারাও আমাদের বিয়ে মেনে নেননি। কোন উপায় না দেখে শেষ পর্যন্ত শ্বশুরালয়েই বসবাস শুরু করি।’
বালিয়াকান্দি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আ. মতিন ফেরদৌস বলেন, ‘নুরজাহান বেগম একজন বীরাঙ্গনা। সরকার থেকে তাকে সাহায্য করা হয়েছে। তবে আমি আশা করছি, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এই সরকার যেন মুক্তিযোদ্ধাদের মতো বীরাঙ্গনাদেরকেও স্বীকৃতি দেয়।’

