নিজস্ব প্রতিবেদক : গত বছর ও চলতি বছর অনুষ্ঠিত উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পথেই যাচ্ছে পৌরসভা নির্বাচন। ওই নির্বাচনগুলোতে ব্যালট বাক্স ছিনতাই, জাল ভোট, সঙ্ঘাত-সহিংসতা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে রাতভর ব্যালট পেপারে সিল মারে সরকারি দলের প্রার্থীর কর্মীরা। প্রচুর অভিযোগ ও প্রমাণ থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। দায়সারা বক্তব্য দিয়ে নিজেদের নিরপেক্ষ প্রমাণ করাই ছিল ইসির কৌশল।একইভাবে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে সরকার সমর্থিতরা আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেও ইসি কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। পোলিং অফিসারদের নিয়ে বৈঠক করেন রাজশাহী-৪ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক। এ ছাড়াও অধিকাংশ নির্বাচনী এলাকায় মন্ত্রী ও এমপিরা কৌশলে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন। গণমাধ্যমগুলোতেও সে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এর পরেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উপরন্তু তাদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছে ইসি কর্মকর্তারা। সারা দেশের রিটার্নিং অফিসারদের প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকা থাকলেও দুই-একটি জায়গায় প্রত্যাহার করে নিজেদের নিরপেক্ষ প্রমাণের চেষ্টা করছে ইসি।
গত বছরের শুরুতে পাঁচ ধাপে দেশের সাড়ে চার শতাধিক উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ব্যাপক সহিংসতা ঘটনা ঘটে। সহিংসতায় বিএনপি সমর্থিত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ নিহত হয় প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মী। আহত হয় কয়েক হাজার। ব্যালট ছিনতাই, জাল ভোট প্রদান, প্রতিপরে এজেন্টদের বের করে দেয়াসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটে। ভোটগ্রহণের আগের রাতেই কেন্দ্র দখল করে মতাসীন দলের প্রার্থীরা ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে রাখেন।
সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন এবং সহিংসতা রোধে ব্যবস্থা না নেয়ায় প্রশ্নের মুখে পড়ে ইসি। সঙ্ঘাত-সহিংসতার পেছনে কমিশনের উদাসীনতা ও সরকারের প্রতি নতজানু ভূমিকাকেই প্রধানত দায়ী করে নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা। নির্বাচনে আগের দিন ও ভোটের দিন কেন্দ্রে সেনাবাহিনী, র্যাব ও বিজিবির টহলও সহিংসতা রোধে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ইসি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। নির্বাচনে প্রচুর আচরণবিধি লঙ্ঘন তথা ব্যালট ছিনতাই, কেন্দ্র দখল ও জাল ভোটসহ নানা অনিয়মের ঘটনা ঘটে পুলিশ ও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সামনেই। কোনো কোনো যায়গায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের লাঞ্ছিত করে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা। যার ছবি ও সংবাদ গণমাধ্যমে আসে। এর পরেও ইসি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। উপরন্তু শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে বলে দাবি করে।
নির্বাচনের পর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো। তারা নির্বাচনে ইসির ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছিলেন, উপজেলা নির্বাচনে সহিংসতা ও কারচুপি বন্ধে ইসি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। অনেক প্রার্থী ও প্রশাসনের অভিযোগের পরও ইসি কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি; বরং তারা নীরব ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাদের নীরব ভূমিকা দেশবাসী উদ্বিগ্ন।
একইভাবে গত ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয় দেশের বৃহৎ তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। নির্বাচনে তিন সিটিতেই ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটদানে বাধা, ভোট কারচুপি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোলিং এজেন্টদের মারধর ও বের করে দেয় সরকার সমর্থিত প্রার্থীরা। ভোট গ্রহণের আগের দিনই কেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। ভোটের দিন কারচুপির অভিযোগে বিএনপি সমর্থিত ঢাকা উত্তরের প্রার্থী তাবিথ আউয়াল, দেিণর মির্জা আব্বাস এবং চট্টগ্রামের মনজুর আলম নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। নির্বাচনী কার্যক্রম শুরুর পর থেকে তিন সিটিতেই অনিয়মের অভিযোগ আসতে শুরু করে। সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরুর পর থেকেই একে একে দখল হতে থাকে কেন্দ্রগুলো। বের করে দেয়া হয় সরকারবিরোধী প্রার্থীর পোলিং এজেন্টদের। কিছু কেন্দ্রে ব্যালট বাক্স ভর্তি দেখা যায় ভোট শুরুর আগেই। অনেক কেন্দ্রের প্রিজাইডিং ও সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারও এ অপকর্মে শামিল হন। দুই-একটি জায়গায় প্রিজাইডিং অফিসার এই অনিয়মের প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলে সরকার সমর্থিতদের মারধরের শিকার হন। সাংবাদিক ও বিভিন্ন পর্যবেক কেন্দ্র পরিদর্শনে গিয়ে হামলার শিকার হন। গণমাধ্যমে এসব ঘটনা সরাসরি প্রত্যক্ষ করার পরেও নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে বলে দাবি করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নামছে আজ : পৌর নির্বাচনে আচরণবিধি তদারকিতে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একজন করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নামছেন আজ থেকে। সেই সঙ্গে ভোটের আগে-পরে চার দিন আরো এক হাজার নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্বে থাকবেন।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, পৌর ভোটে মোট ৯৭০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ২৩৪ জন বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন। গত বুধবার কমিশন সভায় ২৩৪ পৌরসভায় হাকিম নিয়োগের বিষয়টি অনুমোদন করা হয়। বৃহস্পতিবার প্রায় ১২শ’ নির্বাহী ও বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এবং হাইকোর্ট বিভাগের পরামর্শ নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেন ইসির আইন শাখার উপসচিব মহসিনুল হক। এ প্রসঙ্গে ইসি সচিব মো: সিরাজুল ইসলাম বলেন, ১৩ ডিসেম্বর থেকে প্রতি পৌরসভায় একজন করে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন। প্রতীক বরাদ্দের পর ১৪ ডিসেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘন হলে তাৎণিকভাবে ব্যবস্থা নেবেন তারা।
ইসির একজন উপসচিব জানান, পৌরসভা নির্বাচনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রা ও অপরাধ প্রতিরোধ কার্যক্রম পরিচালনায় প্রতিটি পৌরসভার জন্য ২৩৪ জন হাকিম প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৩ ডিসেম্বর থেকে ভোটের পরদিন ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাঠে থাকবেন।
আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর ভ্রাম্যমাণ ও ‘স্ট্রাইকিং ফোর্সের’ নেতৃত্ব দেবেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। নির্বাচনীবিধি লঙ্ঘন হলে তাৎণিক ব্যবস্থা নেবেন তারা। পৌর এলাকায় নির্বাচনী অপরাধ আমলে নিতে প্রতি পৌরসভায় একজন করে এবং আঠারোর বেশি ওয়ার্ডের পৌরসভায় দুইজন করে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হবে। ফলে ২৩৪ পৌরসভায় ২৩৯ জন ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ পাবেন। এ সময় প্রতিটি পৌরসভার তিনটি ওয়ার্ডের জন্য একজন করে ৭৩০ জন নির্বাহী হাকিম আচরণবিধি সংক্রান্ত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য থাকবেন।
ইসির আইন শাখার কর্মকর্তারা জানান, নির্বাচনীবিধি লঙ্ঘনের অপরাধে ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট নির্বাচনী অপরাধ ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত সাজা দেয়ার এখতিয়ার রাখেন। অন্য দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ছয় মাস থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর সাজা দিতে পারেন। এর সঙ্গে অর্থদণ্ডেরও বিধান রয়েছে। বিধি লঙ্ঘনের দায়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে প্রার্থিতা বাতিলের মতাও ইসির রয়েছে।
এবারের পৌরসভা নির্বাচনে সাড়ে তিন হাজার কেন্দ্রে ভোট হবে। এতে পুরুষ ভোটার ৩৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৫৬ জন এবং নারী ভোটার ৩৫ লাখ ৭৬ হাজার ৪০ জন। ৩০ ডিসেম্বর এসব পৌরসভায় মেয়র পদে ২৩৪ জন, সংরতি কাউন্সিলর পদে ৭৩৮ জন এবং সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২ হাজার ৯৫২ জনকে নির্বাচিত করবেন ভোটাররা। ভোট গ্রহণ করবেন ৬১ হাজার ১৪৩ জন কর্মকর্তা।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন আজ : পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন আজ। যেসব প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েও নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চান তাদের আজকের মধ্যে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এরপর আর কোনো প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের কোনো সুযোগ নেই। আইন অনুযায়ী প্রত্যাহারের শেষ দিনের পর যারা থাকবেন তারা নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন। তাদের নামে নির্বাচনে প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে। আগমীকাল সোমবার প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে। প্রতীক বরাদ্দ নিয়েই পূর্ণাঙ্গ প্রচারে নেমে পড়বেন প্রার্থীরা। ইতোমধ্যে মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরতি কাউন্সিলর পদে আলাদা প্রতীক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
গত ২৪ নভেম্বর পৌরসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দিন আহমেদ। রিটার্নিং কর্মকর্তা ৪ ও ৫ ডিসেম্বর প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাই করেন। পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে সহস্রাধিক এবং কাউন্সিলর পদে প্রায় ১২ হাজার প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করেছে ইসি। আজ মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী সংখ্যা চূড়ান্ত হবে।

