নারায়ণগঞ্জ প্রতিবেদক : নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুনের মামলার চার্জশিটে ‘মারাত্মক ত্রুটি’ রয়েছে হাইকোর্টের এমন মন্তব্যের পর ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় আসছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, চার্জশিটে প্রধান আসামি হিসেবে নূর হোসেনকে অভিযুক্ত করা হলেও ঘটনায় কোথাও তার উপস্থিতি ছিল না। তার জবানবন্দি কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই প্রধান আসামি করা হয়েছে।
এদিকে উচ্চ আদালত ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করলেও এর প্রতিক্রিয়ায় কোনো ধরনের বক্তব্য দিতে রাজি হননি জেলা পুলিশ প্রধান ও সাত খুন মামলার তদারক ড. খন্দকার মহিদউদ্দিন।
যদিও এর আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রতিবেদন শতভাগ নির্ভুল ও চমৎকার। কারণ আমাদের তদন্তের কোনো ঘাটতি ছিল না। চমৎকার একটি তদন্ত হয়েছে।’
গত ১ ডিসেম্বর সাত খুন মামলার চার্জশিটে নারাজি আবেদনের শুনানিতে হাইকোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম বলেন, ‘এ মামলার চার্জশিটে একটি মারাত্মক ত্রুটি আছে। আমি জানি, কিন্তু এখন বলবো না, খুঁজে বের করেন।’
নারাজি আবেদনটি করেন নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি শুনানি চলছে বলে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সাত খুনের ঘটনায় প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ ৫ জনকে অপহরণ করে হত্যার ঘটনায় নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। এ মামলায় ৬ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার ও গাড়িচালক ইব্রাহিমকে অপহরণ ও হত্যা মামলার বাদী ছিলেন চন্দন সরকারের জামাতা ডা. বিজয় কুমার পাল। এ মামলায় আসামিদের অজ্ঞাত পরিচয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
গত ২৯ অক্টোবর রোববার নিহত কাউন্সিল নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এ মামলার অধিকতর চদন্ত চেয়ে ও নুর হোসেনকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার আবেদনটি দায়ের করেন।
জানা গেছে, নজরুল ইসলামের স্ত্রী বিউটির করা মামলায় ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়া হয়েছে। যেখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ পড়ে গেছে।
চার্জশিটের ত্রুটি প্রসঙ্গে আদালতে দায়ের করা নারাজি আবেদনে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে :
১. ২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টার দিকে এজাহার নামীয় আসামি কাউন্সিলর নূর হোসেনের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে তার লোকজন নিয়ে নিহত নজরুলের বাসার সামনে অস্ত্র হাতে মহড়া দেয়। উক্ত মহড়ায় অত্র মামলার এজাহারনামীয় আসামি হাজী ইয়াসিন মিয়া, হাসমত আলী হাসু, আমিনুল ইসলাম রাজু, আনোয়ার হোসেন আশিক, ইকবাল হোসেন অস্ত্র হাতে অংশগ্রহণ করে। উক্ত ৫ জন এজাহারনামীয় আসামির নাম অন্যায়ভাবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে (চার্জশিটে) অব্যাহতির আবেদন করেছেন। প্রকৃতপক্ষে উক্ত আসামিগণ অত্র মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের প্রধান সহযোগী। নূর হোসেনের সঙ্গে উক্ত আসামিরাও উক্ত অপহরণ, খুন, গুম এর পরিকল্পনাকারী এবং অর্থের যোগানদাতা। র্যাবকে অপহরণ, হত্যা ও গুম এ তারাও প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেছে।
২. মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার প্রথম থেকেই অভিযোগপত্র (চার্জশিটে) থেকে বাদ দেয়া ৫ জন আসামির প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন। কারণ এজাহারে নাম থাকলেও ৫ জনের কাউকেই তদন্তকারী কর্মকর্তা গ্রেপ্তার করেননি। উক্ত আসামিরা গ্রেপ্তার হলে পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে ৭ খুনের সঙ্গে তাদের প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার বিষয়টি প্রকাশ পেত। এজাহারনামীয় ৬ আসামি পলাতক থাকলেও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তকালে শুধুমাত্র ১নং আসামি নূর হোসেন এর অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করার জন্য আবেদন করেন। অথচ অভিযোগপত্রে বাদ যাওয়া উক্ত ৫ আসামির নাম এজাহারে থাকলেও তাদের অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোকের কোন পদক্ষেপ নেননি।
৩. অত্র মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের মধ্যে বেভিরভাগই নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেছেন। আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে ৭ খুনের ঘটনাটি উদঘাটিত হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত অভিযোগপত্রের অন্তর্ভূক্ত আসামি আলী মোহাম্মদের আদালতে দেয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর ১১ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘এক বা দেড় মাস আগে মিজমিজি ২নং ওয়ার্ডের সিটি করপোরেশনের রাস্তার কাজে বড় ঝামেলা তৈরী হয়। ওই রাস্তার কাজ করার সময় নূর হোসেনের খালাতো ভাই মোবারক রাস্তার পাশে টিনের ঘর তৈরী করেছিল। নজরুল ইসলাম মোবারককে টিনের ঘর সরাতে বললে নিহত নজরুলের সঙ্গে নূর হোসেনের ঝগড়ার সূত্রপাত হয়। ওই সময় নূর হোসেন ৪০/৫০ জন লোক নিয়ে ওই রাস্তার পাশে যেয়ে গুলি ছুড়ে দোকানপাড় ভাঙচুর করে। ওই সময় নূর হোসেনের বাসায় ফিরে এসে নূর হোসেনের ভাই নূর ইসলাম, নূর সালাম, জজ মিয়া, নুরুদ্দিন, নুরুল হক এবং ভাতিজা বাদল বসা ছিল। ওইসময় নূর হোসেনকে আলী মোহাম্মদ বলেন, ভাই নজরুলকে নিয়ে এত ভাল লাগেনা। নজরুল খুব বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। আপনি হুকুম দেন ওকে শেষ করে দেই। তখন নূর হোসেনে বলে এটা আমার ব্যাপার এটি আমি দেখবো।’ আলী মোহাম্মদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী থেকে বোঝা যায় ৭ খুনের অপহরণ, হত্যা ও গুমের পরিকল্পনার নূর হোসেনের উপরোক্ত পাঁচ ভাই নূর ইসলাম, নূর সালাম, জজ মিয়া, নুরুদ্দিন, নুরুল হক এবং ভাতিজা কমিশনার বাদল জড়িত। অথচ তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করেনি এবং ঘটনার পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত থাকার পরেও তাদের অভিযোপত্রে অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি।
৪. অত্র মামলার গ্রেপ্তারকৃত আসামি আলী মোহাম্মদের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীসহ অন্যান্য জবানবন্দীতে রিয়াজ নামের একজন আসামির নাম এলও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি এবং অভিযোগপত্রে পিতার নাম ঠিকানা না থাকার মিথ্যা অজুহাতে আসামির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তার নাম অভিযোগপত্রে (চার্জশীট) অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি। পিতার নাম ঠিকানা পেলে পরবর্তীতে সম্পূরক অভিযোগপত্রে দাখিলের কথা বলা হয়েছে। অথচ ইতোপূর্বে এজাহারকারিনীর পক্ষে রিয়াজের নাম ঠিকানা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট সরবরাহ করা হয়েছিল। উক্ত রিয়াজের পিতার নাম মৃত মোসলেহ উদ্দিন। তার বাড়ি সিদ্ধিরগঞ্জের আটি এলাকায়।
৫. অভিযোগপত্রে উল্লেখিত আসামি আলী মোহাম্মদ নূর হোসেনের সহযোগি। ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে হাসান, বিডু, মুহিত, ফারুক, আসলাম, ভাগিনা মামুন, ফয়সাল, রুবেল, ক্যাশিয়ার কাশেম, জিত, নাজু, আলম, তাজিন বাবু, ছাদেক, সামাদ এবং আরিফুল হক হাসান (জাতীয় শ্রমিকলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল মতিন মাস্টারের পুত্র), সাইফুল ইসলাম, ইলিয়াছ, মাসুম, জব্বার, মিজানদের নাম আসলেও তাদের নাম অভিযোগপত্রে অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি। তাদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও কোন তদন্ত করা হয়নি।
৬. মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কয়েকজনকে স্বাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী রেকর্ড করিয়েছেন। অথচ উক্ত স্বাক্ষীদের কেউ কেউ প্রত্যক্ষভাবে হত্যাকান্ডে অংশগ্রহণ করেছেন। তাদেরকে আসামি হিসেবে অভিযোগপত্রে নাম অর্ন্তভুক্ত করা হয়নি।
৭. মামলার অভিযোগপত্রের স্বাক্ষীর কলামে আসামিপক্ষের কয়েকজনকে স্বাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়েছে। যার কারনে আসামিপক্ষে সুবিধা পাওয়ার সুযোগ থাকে।
৮. যেহেতু উক্ত অপহরণ খুন ও গুমের পেছনে পরিকল্পনা অর্থ যোগানকারীদের বিষয়টি তদন্তকারী কর্মকর্তা সম্পূর্ণরূপে উদঘাটন করার জন্য প্রধান আসামি নূর হোসেনকে দেশে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেননি। নূর হোসেনকে দেশে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে অবশ্যই এজাহারনামীয় আসামিদের নাম আসতো।

