নিজস্ব প্রতিবেদক : উপকূলীয় জাহাজ চলাচলের চুক্তির (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর-এসওপি) অংশ হিসেবে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।
এই চুক্তির ফলে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলের বন্দরগুলো থেকে পণ্যবাহী জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশের চট্টগ্রামবন্দরসহ অন্যবন্দরগুলোতে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। একইভাবে বাংলাদেশের পণ্যবাহী জাহাজও ভারতের বন্দরগুলোতে সরাসরি পণ্য নিয়ে যেতে পারবে। এতে দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনে খরচ কমবে।
এ বিষয়ে ভারতের পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, চুক্তির ফলে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় উপকূলের ৬টি বন্দর থেকে পণ্যবাহী ছোট জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মংলা বন্দরে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। এটি দু’দেশের বাণিজ্য উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবহন খরচও কমাবে।
দেশটির পরিবহন মন্ত্রী নিতিন গড়করি বলেন, ‘ফ্লাই অ্যাশ ছাড়াও বাংলাদেশে আরো পণ্য রপ্তানির ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। আমরা কমলা ও চিনি রপ্তানি করতে পারি।’ বাণিজ্য উন্নয়নের ফলে নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এসব বিষয় নিয়ে আজ সোমবার থেকে তিন দিনব্যাপী ভারতের নয়াদিল্লীতে দুই দেশের সচিব পর্যায়ে বৈঠক শুরু হচ্ছে। এ বৈঠক চলবে আগামী ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত।
আন্তর্জাতিক এই বৈঠকে যোগ দিতে বাংলাদেশ থেকে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ১৪ নভেম্বর বিকেলে নয়াদিল্লির উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করেছেন। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিক আলম মেহেদী প্রতিনিধিদলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
প্রতিনিধিদলের সদস্যরা হলেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক সুব্রত রায় মৈত্র, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নাসির আরিফ মাহমুদ, মংলা বন্দরের সদস্য (অপারেশনাল) মোহাম্মদ আলতাফ হোসেন, আইন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম-সচিব সাঈদ আহমেদ, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক ফখরুল ইসলাম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক মো. মনোয়ার হোসেন, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. সাইফুল ইসলাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য সুলতান মো. ইকবাল, চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল ম্যানেজার এনামুল করিম, বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক মো. শফিকুল হক এবং গালফ অরিয়েন্ট সিউজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মাহফুজ হামিদ।
সোমবার সকালে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম খান এ খবর নিশ্চিত করেছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এ চুক্তি ছাড়াও বৈঠকে প্রটোকল অন ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড (পিআইডব্লিউটিটি) এর আওতায় বাংলাদেশ-ভারত নৌ-প্রটোকল রুটে আশুগঞ্জ নৌবন্দরকে ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করে ট্রানজিট সংক্রান্ত সার্ভিস চার্জ নির্ধারণ, নৌ-প্রটোকল রুটের নাব্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তায় বাংলাদেশ, ভারত ও ভুটানের আর্থিক দায়-দায়িত্ব ও করণীয়, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দর ব্যবহার সংক্রান্ত প্রটোকল অনুস্বাক্ষর এবং বাংলাদেশে ও ভারতের মধ্যে যাত্রী ও পর্যটকবাহী নৌ-যান চলাচল সংক্রান্ত খসড়া সমঝোতা স্মারকপত্র নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এর আগে গত ২০-২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ ভারতের নয়াদিল্লিতে নৌরুটের বিষয়ে দুই দেশের সচিব পর্যায়ের চার দিনের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব শফিক আলম মেহেদীর নেতৃত্বে বাংলাদেশের ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি অংশ নেন।
বৈঠকে উভয় দেশের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য উভয় পক্ষ নৌ-প্রটোকল সংশোধনে সম্মত হয়েছে। এ বিষয়ে জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ কমিটির সুপারিশের প্রেক্ষিত্রে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেই আজ সোমবার থেকে ভারতের নয়াদিল্লিতে দ্বিতীয় পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে আন্তঃদেশীয় নৌ-যোগাযোগ স্থাপন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু করা হয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যাত্রী ও পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের দিকগুলো বিস্তারিত খতিয়ে দেখতে একমত হয়েছে দুই দেশ।
বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, খুলনার মংলা সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে নৌ-চলাচলের খুঁটিনাটি দিকগুলো এখন পর্যালোচনা করে দেখা হচ্ছে। কোন স্থানে কতটুকু ড্রেজিং প্রয়োজন হবে, সেগুলো পর্যালোচনা করে জানানোর জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডব্লিউটিএ)।
দুই দেশের মধ্যে নৌ রুটে জাহাজ চলাচল শুরু হলে দু’দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে পর্যবেক্ষক মহলের অভিমত।
টেলিফোনে নৌ-পরিবহন সচিব শফিক আলম মেহেদী’র সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘নৌ-সেক্টর উন্নয়নের ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে বর্তমান সরকারের। নদীপথে পণ্যবাহী জাহাজ ও যাত্রী পরিবহন যাতে নির্বিঘ্নে হয় তার জন্য ড্রেজিং কার্যক্রমও পুরোদমে চলছে।
নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘সারাদেশের নৌ-পথ সচল রাখতে ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়েছি। এসব পরিকল্পার মধ্যে ৪৩ নদী খনন হলো উল্লেখযোগ্য প্রকল্প। এসব নদী খনন কাজের গতি বাড়াতে সরকার আরও ২০টি ড্রেজার কেনার উদ্যোগ নিয়েছি। যা জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল (একনেক) অনুমোদন দিয়েছে। ড্রেজারগুলো এলে নদী খনন দ্রুত করা সম্ভব হবে।’
তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে বাংলাদেশ-ভারত নৌপথ চালু হলে দেশের অর্থনীতিতে আসবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এই নতুন এই নৌ-পথ চালু করতে দুই দেশের সচিবদের নিয়ে ভারতে নয়াদিল্লিতে বৈঠক বসছে।’ দুই দেশের স্বার্থসংরক্ষণে বৈঠকটি সফল হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এদিকে বিআইডব্লিউটিএ সূত্রে জানা গেছে, মংলা বন্দরের সঙ্গে সারাদেশের দূরত্ব কমানোর জন্য ১৯৭৪ সালে প্রায় ৬ কিলোমিটার কৃত্রিম পথ খনন করে প্রায় ৩১ কিলোমিটার দীর্ঘ মংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথ চালু করা হয়। এটি বাংলাদেশ ভারত নৌ-প্রটোকলভুক্ত ও বাংলাদেশ ভারত ট্রানজিট পথের একটি প্রধান অংশ।

