নিজস্ব প্রতিবেদক : সুজন পাটোয়ারী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় ব্যাচের শিক্ষার্থী। কলেজে পড়া অবস্থায় ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বাবার মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর বড় ভাইও একই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে গিয়ে ভিটে-মাটি ছাড়া সম্বল বলতে আর কিছুই রইল না। অভাব-অনটনের সংসারে টিউশনি করে ফিন্যান্স থেকে বিবিএ শেষ করেছেন ২০১৩ সালে। এমবিএ বাদ দিয়ে চাকরির জন্য শুরু করেন পড়ালেখা। আগে ৪টি টিউশনি করলেও চাকরির পড়ালেখার জন্য দুটি টিউশনি ছেড়ে দিয়েছেন। উদ্দেশ্য- ভালমানের একটা সরকারি চাকরি চাই তার। কিন্তু সরকারি চাকরির আবেদন করতেই লাগে এখন মোটা অংকের ফি। শুধু ফি দিয়েই কাজ সারলেতো বাঁচা যেতো। আবেদনের পর বাছাই পরীক্ষা, ইন্টারভিউ, তার জন্য ভাল প্রস্তুতি, পরীক্ষাস্থলে যাওয়া-আসা- এসবেও এখন টাকা-পয়সা লাগে প্রচুর। কিন্তু সেসবতো দিল্লীদুরস্ত ব্যাপার। আগেতো চাকরির আবেদন করতে হবে। যেখানেই চাকরির খবর, সেখানেই আবেদন করা চাই। কিন্তু এত আবেদন ফি কোথায় পাবেন সুজন? তিনি তো বেকার। ফলে অধিকাংশ সরকারি চাকরির আবেদনই করতে পারেন না তিনি।
সুজনের ভাষ্য- চাকরির বিজ্ঞাপনে যেসব পোস্টে লোক বেশি নেয়ার কথা থাকে, সেসব পোস্টেই তিনি আবেদন বেশি করেন। কারণ সেখানে প্রতিযোগীর হার অনুপাতে কম থাকে এবং চাকরির সম্ভাবনা রয়ে যায়। অন্যদিকে যেসব পোস্টে লোক কম নেয়ার কথা খাকে সেখানে তিনি আবেদনই করেন না। কারণ- আবেদন ফি’টা দেখেশুনে জলে ফেলতে নারাজ তিনি। এভাবেই বিচার বিবেচনা করতে গিয়ে অধিকাংশ সরকারি চাকরিতে আবেদন করা হয় না সুজনের।
একইরকম অবস্থা শাহ আলমের আরেক চাকরিপ্রার্থীর। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বাবার সন্তান শাহ আলম স্নাতকোত্তর পাস করে ২০১৪ সালে চাকরির আশায় নেত্রকোনা থেকে ঢাকায় আসেন। স্বপ্ন, বিসিএস কিংবা প্রথম শ্রেণির কোনো সরকারি চাকরি করা। ৩৫তম বিসিএসে লিখিত পরীক্ষা দিয়েছেন। বাড়ি থেকে পাঠানো সীমিত টাকাই খরচের একমাত্র সম্বল। সরকারি চাকরি পেতে হলে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। তাই মাস্টার্স শেষে তিনি কোনো বেসরকারি চাকরিতে যোগ দেননি। টাকার অভাবে তিনিও অধিকাংশ সরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারেননি। কারণ যে টাকা বাড়ি থেকে পাঠানো হয় তা দিয়ে নিজের খরচ চালাতেই হিমশিম খেতে হয় তাকে।
শাহ আলম বলেন, পড়ালেখা শেষ হওয়ার পর বেকার জীবনটাই এখন একটা বোঝা। বেকারদের ঘাড়ে পরীক্ষার ফি নামের বোঝাটা চাপিয়ে দেয়াটা অমানবিক।
সুজন, শাহ আলমের মতো একই দশা এ দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত শ্রেণি থেকে উঠে আসা লাখ লাখ শিক্ষার্থীর। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে আবেদনের ফি বেশি হওয়ায় টাকার অভাবে অধিকাংশ পরীক্ষায় বসতে পারেন যোগ্য শিক্ষার্থীরা। ফলে একদিকে বেকারত্বের বোঝা অন্যদিকে হতাশা আর গ্লানি বয়ে চলতে হচ্ছে তাদের।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে লিখিত প্রশ্নোত্তরে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার জানান, বর্তমানে দেশে সাড়ে ১৯ লাখ শিক্ষিত বেকার রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ২২ লাখ যুবক ও যুব মহিলা শ্রমবাজারে প্রবেশ করে।
বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থীর স্নাতকোত্তর পাস করতে বয়স ২৬ থেকে ২৭ পেরিয়ে যায়। সাধারণ শিক্ষার্থীর (কোটা বাদে) সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য এ সময় তাদের হাতে থাকে মাত্র দু’ থেকে তিন বছর সময় । ফলে অধিকাংশ মেধাবী তরুণ-তরুণী এ সময় কোনো বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশ না করে টিউশনি কিংবা বাসা থেকে পাঠানো টাকার ওপর নির্ভর করে সরকারি চাকরি পাওয়ার যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। সীমিত টাকায় যাদের জীবন চলে সেই অধিকাংশ শিক্ষিত বেকারকেই চাকরির আবেদনের জন্য ফি গুনতে গিয়ে পড়তে হচ্ছে বিপাকে। সময়মতো টাকা যোগাড় করতে না পেরে লাখ লাখ শিক্ষার্থী আবেদনই করতে পারছেন না।
কোন পরীক্ষায় কত ফি?
বিগত বছরগুলোতে বিসিএস পরীক্ষার জন্য ধার্যকৃত ফি ছিল পাঁচশ’ টাকা। ৩৫তম বিসিএস পরীক্ষায় তা বাড়িয়ে করা হয়েছে সাতশ’ টাকা (প্রতিবন্ধী ও উপজাতি কোটা বাদে)। কমিশন কর্তৃক এ্যাসিস্ট্যান্ট রেভিনিউ অফিসার, এ্যাসিস্ট্যান্ট থানা শিক্ষা অফিসারসহ নন-ক্যাডারের চাকরির আবেদনের জন্য নেয়া হচ্ছে পাঁচশত টাকা। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির (নন-ক্যাডার) প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে পরীক্ষার ফি বাবদ তিনশ’ এবং ফরম বাবদ একশ’ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
সম্প্রতি এনএসআইয়ে ৩১ টি শূন্য পদে আবেদনের বিপরীতে নেয়া হয়েছে সাতশত টাকা। সাব-রেজিস্ট্রার ও আনসারের উপজেলা এ্যাডজুটেন্ট পদের জন্য নেয়া হয়েছে পাঁচশত টাকা করে। এর আগে লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উপ-পরিচালক পদে দু’জন ও মূল্যায়ন কর্মকর্তা পদে চারজন লোক নিয়োগের জন্য পাঁচশ’ টাকা করে নেয়া হয়েছে। কর্মসংস্থান ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংকসহ অন্যান্য নিয়োগের জন্য পরীক্ষার ফি বাবদ নেয়া হয়েছে তিনশ থেকে চারশ টাকা।
বিভিন্ন চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকেই বিভিন্ন পদে বিনা ফি’তে আবেদন করা যায়। তাছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের মতোই অনেক বেসরকারি ব্যাংক, বীমা কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে ফি বাবদ ২ থেকে ৩শ’ টাকা দিতে হয়। যেসব শিক্ষার্থীর নিজস্ব কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সুবিধা নেই তাদের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যয় হচ্ছে অতিরিক্ত আরও একশ টাকা।
পরীক্ষার ফি’র ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের পরিচালক নিয়ামত উল্লাহ বলেন, ‘বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে নিয়োগ পরীক্ষার ফি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নির্ধারণ করা থাকে। পরীক্ষার ফি থেকে কেন্দ্র ভাড়া, শিক্ষকদের সম্মানীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করা হয়।’

