ঢাকাTuesday , 10 November 2015
  1. অর্থনীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. আবহাওয়া
  5. কৃষি ও অন্যান্য
  6. খেলাধুলা
  7. গল্প ও কবিতা
  8. জাতীয়
  9. তথ্যপ্রযুক্তি
  10. দেশজুড়ে
  11. ধর্ম ও জীবন
  12. প্রবাস
  13. বানিজ্য
  14. বিনোদন
  15. বিশেষ প্রতিবেদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

বাড়ছে মানুষ, কমছে গণপরিবহন

Link Copied!

Public-busচট্টগ্রাম প্রতিনিধি : সকাল ৮ টা। কর্মন্থলগামী মানুষের প্রচণ্ড ভীড়। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও বাস না আসায় উদ্বিগ্ন যাত্রীদের বাড়ছে সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছানোর জন্য উৎকণ্ঠা। একটু পরেই দেখা গেল বহদ্দারহাট থেকে আসছে ১০ নম্বর রুটের একটি বাস। বাসটি স্টপেজে এসে পৌঁছানোর আগেই অপেক্ষমান যাত্রীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছে গাড়ীতে ওঠার জন্য। এই নিয়ে রীতিমত মল্লযুদ্ধ চলছে। একজন আরেকজনকে ঠেলে-ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিচ্ছে, আবার কেউ অন্যর পা মাড়িয়েই নিজেকে এগিয়ে নিচ্ছে গাড়ির ভেতর। কেউবা গাড়ির ভেতরে জায়গা না পেয়ে ঝুলে পড়েছেন হ্যান্ডেল ও বাম্পার ধরে।
রোববার সকালে বন্দর নগরীর মুরাদপুর এলাকার দৃশ্য এ রকমই ছিল। গণপরিবহনে জনদুর্ভোগের এমন চিত্র শুধু মুরাদপুর এলাকায় নয়, বরং এটি বন্দর নগরীতে নিত্যদিনকার জনদুর্ভোগের একটি প্রতিকী চিত্র মাত্র।
পঞ্চম আদমশুমারির তথ্য অনুসারে গত এক দশকে চট্টগ্রাম জেলায় জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়েছে। চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যা ৮০ লাখ ২১ হাজার ৭৭৮ জন। বর্তমানে চট্টগ্রামে প্রতি বর্গকিলোমিটারে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ১ হাজার ৪৭২ জন। তবে মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি, প্রায় অর্ধকোটি লোক চট্টগ্রাম মহানগরে বাস করেন। এছাড়া নগরীর পার্শ্ববর্তী উপশহর ও গ্রাম থেকে আরো ৫০ হাজার মানুষ জীবিকার তাগিতে প্রতিদিন বন্দর নগরীতে আসা-যাওয়া করে।
এত সংখ্যক চলাচলকারী মানুষের কথা বিবেচনা করলে অন্তত চার হাজার গণপরিবহন থাকা দরকার এই নগরীতে। বাস্তবে আছে হাজার খানেক বাস-মিনিবাস আর হাজার খানেক হিউম্যান হলার-টেম্পু-সিএনজি অটোরিকশা। প্রয়োজনের চেয়েও অর্ধেকসংখ্যক গণপরিবহন যে নগরবাসীর প্রয়োজন মেটাতে পারছে না সেটা বলা বাহুল্য। বেসরকারি বাস-মিনিবাসের সংকট তো রয়েছেই, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) বাসও অপ্রতুল। কখনো কখনো কোনো কোনো রুটে বিআরটিসির বাস চালু করা হলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই সেগুলো বন্ধ হয়ে যায় বা নামমাত্র গোটাকয়েক বাস চলে।
শুধু পরিবহন সংকটের কারণেই নগরবাসী দুর্ভোগ পোহাচ্ছে না। ফিটনেসবিহীন এসব গণপরিবহনে যাত্রীসাধারণরা রডে ঝুলে, পাদানিতে দাঁড়িয়ে, ছাদে চড়ে যাতায়াত করছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পরিবহন মালিক-কর্মচারীদের অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতা।
নগরীর আগ্রাবাদে একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে কাজ করেন মোহাইমিনুল হক, থাকেন নগরীর বায়েজীদ ওয়াবদা গেইটে। অফিসে যাওয়া আসার প্রতিদিনকার দুর্ভোগের কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনের সকালটা শুরু হয় খুব আতঙ্কের মধ্যে দিয়ে। আগ্রাবাদ যেতে দুটো গাড়ি পাল্টাতে হয়। ওই গাড়ি ঠিকমত পাব কি না, চাকরিতে সময় মত পৌঁছাতে পারবো কি না-এই চিন্তায় অস্থির থাকি পুরো সকালটা। অন্যদিকে সময় মত অফিসে পৌঁছাতে না পারলে বসের ঝাড়িতো আছেই, রয়েছে চাকরি হারানোর ঝুঁকিও। রাতে ফিরতেও সেই একই বিড়ম্বনা। সন্ধার পর ওই রুটে (১০ নম্বর) গাড়ি পাওয়া আর সোনার হরিণ পাওয়া একই কথা। শত দুর্ভোগ ঠেলে যখন বাড়ি ফিরি, তখন রাতের নয়টা-দশটা বেজে যায়।’
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, বন্দর নগরীর ৬৮ টি রুটে বাস-মিনি বাসের ১১টি, হিউম্যান হলারের ১৪টি ও টেম্পুর ১৮টি রুট রয়েছে। রুটগুলোতে চলাচলকারী গণপরিবহনের সংখ্যা ৩ হাজার ৩৩০টি। বাস-মিনি বাসের সিলিংয়ের সংখ্যা ১ হাজার ২৮২ টি হলেও বাস আছে ৯৯৮ টি, হিউম্যান হলার এর সিলিংয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৮৮ টি হলেও আছে ৮৫৮টি, টেম্পু সিলিংয়ের সংখ্যা ২ হাজার ৩৫৭ টি হলেও আছে ১ হাজার ৪৮২।
এটি হচ্ছে, মোটা দাগের হিসেব। আলাদা ভাবে প্রতিটি রুটে চলাচলকারি গণপরিবহনের হিসাব মেলাতে গেলে এই অবস্থা আরো ভয়াবহ। বিআরটিএর হিসাব অনুযায়ী, নগরীর ১ নম্বর রুটে (শাহ আমানত সেতু থেকে নিউ মার্কেট) বাস-মিনি বাসের সিলিংয়ের সংখ্যা ১০০ টি, কিন্তু বাস আছে মাত্র ৬০ টি, ৩ নম্বর রুটে (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নিউ মার্কেট) মিনিবাসের সিলিংয়ের সংখ্যা ১০০ টি, কিন্তু বাস আছে মাত্র ৫৬ টি, ৫ নম্বর রুটে (বিমান বন্দর থেকে নিউ মার্কেট) বাস-মিনিবাসের সিলিংয়ের সংখ্যা ৭৫ টি, কিন্তু বাস আছে মাত্র ৩৮ টি। ৬ নম্বর রটে (মদুনাঘাট থেকে আমতল) মিনি বাসের সিলিংয়ের সংখ্যা ৮০ টি, কিন্তু আছে ৪৯ টি, ৭ নম্বর রটে (নতুন রেল স্টেশন থেকে কুমিরা) হিউম্যান হলারের সিলিংয়ের সংখ্যা ৮০ টি, কিন্তু আছে মাত্র ৩৩ টি, ৭ নম্বর রটে (মাদারবাড়ি থেকে সীতাকুন্ড) হিউম্যান হলারের সিলিংয়ের সংখ্যা ৮০ টি, কিন্তু আছে মাত্র ২৯ টি, ৮ নম্বর রটে (হালিশহর বি-ব্লক থেকে পতেঙ্গা) হিউম্যান হলারের সিলিংয়ের সংখ্যা ৬০ টি, কিন্তু আছে মাত্র ০৮ টি!
তবে পরিবহন মালিকদের সূত্রে জানা গেছে, বাস-মিনিবাস-হিউম্যান হলার মিলিয়ে বন্দরনগরীতে চলাচলকারী গণপরিবহনের সংখ্যা দুই হাজার-বাইশ’শ এর বেশি নয়। সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম শহরে চলাচল করে এমন গাড়ি গুলোর সমিতির সংখ্যা ৭টি। এর মধ্যে পরিবহন মালিকদের সংগঠন ‘চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মালিক গ্রুপ’ এর বাস-মিনিবাস-হিউম্যান হলার মিলিয়ে সর্বাধিক এক হাজারটি গাড়ি রয়েছে। সিটি বাস ওনার্স এসোসিয়েশনের রয়েছে সাড়ে চারশ বাস-মিনিবাস ও হিউম্যান হলার। যাত্রী সেবা এসোসিয়েশনের রয়েছে দুইশ গাড়ি। সিটি সার্ভিস এসোসিয়েশনেরও দুইশ গাড়ি রয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের রয়েছে ১৯টি বাস। এছাড়া বৈধ অবৈধ মিলিয়ে মোট ২১শ থেকে ২২শ গাড়ি থাকলেও, প্রতিদিন চলাচল করে হাজার দেড়েক।
পরিবহন মালিকরা বলছেন, তীব্র যানজট, ভাঙাচোরা রাস্তা, কম সুদে ব্যাংকঋণ না পাওয়া এবং শুল্ক সুবিধা না পাওয়ায় তাঁরা নতুন গাড়ি নামাতে পারছেন না। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তীব্র যানজটে ট্রিপ কমে যাওয়া, শিল্প হিসেবে পরিবহন খাতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা না দেওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ব্যবসা প্রভাবশালী বলয়ে জিম্মি থাকা এবং কম্পানিভিত্তিক বাস নেটওয়ার্কের বদলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিবহন ব্যবসার কারণেই মূলত বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গণপরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
সিলিং থাকার পরেও কেন রাস্তায় গাড়ি নামানো হচ্ছে না জানতে চায়লে মেট্রোপলিটন মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি ইকবাল মো. মনসুর বলেন, ‘২০০৫ সালের পর নগরীতে নতুন বাস নেমেছে মাত্র ৫ শতাংশ। বর্তমানে শহরে ১২শ এর মত বাস ও ৭শ হিউম্যান হলার চলাচল করে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। খারাপ রাস্তা, জ্বালানি, খুচরা যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধিসহ নানা সমস্যার কারণে মালিকরা নতুন গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছেন না।’
তিনি আরো বলেন, ‘গণপরিবহনের শৃঙ্খলা আনার জন্য আমরা টিকিট ব্যবস্থা চালু করেছিলাম। কিন্তু রাস্তায় যানজটসহ নানা সমস্যার কারণে তা নিয়মিত করা যায়নি। রাস্তার উন্নয়নে বিভিন্ন সময় দাবি তুললেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি সরকারি সংস্থাগুলো।’
এসময় তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘একটা মিনি বাস রাস্তায় নামাতে ২৫ লাখ টাকা লাগে। বিনিয়োগ লাভজনক না হলে কে এত টাকার ঝুঁকি নিবে?’
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, ‘২০০১ সালে এই ব্যাবসায় (পরিবহণ) এসেছি। গত পনের বছরে কম করে হলেও ছয় থেকে সাতশ গাড়ির মালিককে এই পেশা ছেড়ে যেতে দেখেছি। আমি যে সময় ব্যাবসা শুরু করেছি, ওই সময়ের বাঘা বাঘা বাস মালিকদের খুব কম সংখকই এখন ব্যাবসায় আছেন। গাড়ি ঠিকই আছে, কিন্তু মালিক বদলে গেছে। যেখানে নিজের পুঁজি ফেরত পাবার কোনো গ্যারান্টি নেই, সেখানে কে বিনিয়োগ করবে ভাই? সরকারের কোন প্রণোদনা নাই, শ্রমিক-পুলিশ থেকে নিস্তার নাই। শ্রমিকরা কোন দোষ করলে, মালিকের নামে মামলা হয়। এসব ঝুকি নিয়ে কেন আসবে এখানে বিনিয়োগ করতে?
এ বিষয়ে বিআরটিএ চট্টগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু গত ১০ মাসে বন্দরনগরীতে চলাচলের জন্য ১ হাজার ১শ ৯০ টি গণপরিবহনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এর অর্ধেকেরও কম গাড়ি রাস্তায় নেমেছে। আমরা চাই রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি হোক। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা এই বিষয়ে উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। ফলে রাস্তায় আসছে না নতুন গাড়ি।’
সিএমপির  ট্রাফিক  বিভাগ উত্তরের উপ কমিশনার মাসুদ উল হাসান বলেন, ‘যারা বেসরকারিভাবে গণপরিবহন ব্যবসা করেন তারা শুধুই লাভের কথা চিন্তা করেন। আর এটি করতে গিয়ে তারা নতুন বাস নামান না। আমরা সব সময় নতুন গাড়ি নামাতে উৎসাহিত করি। কিন্তু শহরে যে বাসগুলো চলছে এগুলোর অবস্থা অনেক খারাপ। গণপরিবহন সেবাকে আধুনিকায়ন করতে হলে সবার আগে বাস মালিকদের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। সরকার কিন্তু সব সময় তাদের সহযোগিতা করছে।’