লালমনিরহাট প্রতিনিধি : তিস্তা যেন এখন আর কোনো নদী নয়, একটি মরা খাল। এর বুকজুড়ে এখন শুধুই ধু-ধু বালুচর। ভারতের গজলডোবা নামক স্থানে প্রবেশ মুখে ও লালমনিরহাটের দোয়ানিতে ব্যারেজ নির্মাণ করে এ নদীর উচ্ছল দুর্বার গতিকে সভ্য সমাজের মানুষরা রোধ করে দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন ক্যানেলের মাধ্যমে তিস্তার স্রোত ঘুরিয়ে দিয়ে তার বুক থেকে তুলে নেয়া হয়েছে পানি।
ব্যারেজ থেকে শুরু করে তিস্তার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে পানি না থাকায় ভেঙ্গে পড়েছেন ব্যারেজের সুবিধাভোগী কৃষকরা। তারা বলছেন, বার বার দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে ব্যারেজে পানি প্রবাহের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও আজও এর কোনো সুরাহা হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র মতে,নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই তিস্তার পানি প্রবাহ এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে যেখানে প্রয়োজন চার হাজার কিউসেক পানি, সেখানে বর্ষা শেষ না হতেই ব্যারেজ এলাকায় পানি পাওয়া যাচ্ছে মাত্র আড়াই হাজার কিউসেক পানি। ৩১ অক্টোবর তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় পানির পরিমাণ ছিল মাত্র ১২শ কিউসেক পানি।
পাউবো কর্মকর্তারা বলেন,‘পর্যাপ্ত পানির অভাবে তিস্তা ব্যারেজের সেচ কার্যক্রম ভেঙ্গে পড়বে। তাই আসন্ন সেচ মৌসুমে তিস্তার পানির হিস্যা জরুরি হয়ে পড়েছে। আর এক মাস পরেই সেচ নির্ভর ইরি, বোরো ও রবি আবাদের কার্যক্রম শুরু হবে।’
কৃষকদের মতে, বোরো রোপন থেকে শুরু করে গাছের শীষ হেলে পড়া না পর্যন্ত সেচ দেয়ার প্রধান সময়। তাই চাষাবাদের জন্য তিস্তার পানি খুবেই গুরুত্বপূর্ণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, তিস্তা সেচ প্রকল্পের প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের সেচ কার্যক্রম চালাতে তিস্তায় পানির প্রয়োজন হবে শুস্ক মৌমুমে প্রায় ২০ হাজার কিউসেক পানি। কারণ দ্বিতীয় পর্যায়ের সেচ ক্যানেল বগুড়া পর্যন্ত নেয়া হচ্ছে। এ জন্য তিনটি ইউনিটে ভাগ করে এর কাজ চলছে। প্রথম ইউনিটের কাজ চলছে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত। এর পর দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শুরু হবে দিনাজপুরের ফুলবাড়ি ও বিরামপুর উপজেলা পর্যন্ত। এরপর তৃতীয় ইউনিটের কাজ শুরু হবে গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ হয়ে বগুড়ার ধুনট পর্যন্ত ।
কৃষি বিভাগ সূত্র মতে, আসন্ন মৌসুমে রংপুর বিভাগের আট জেলায় ৯ লাখ ৪৩ হাজার ৯১০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেওয়া হয়েছে। এই পরিমাণ জমিতে বোরো আবাদে বিদ্যুৎ, ডিজেল ও পা চালিত সেচ যন্ত্র ব্যবহার করা হবে মোট ৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৬১টি। এর মধ্যে ডিজেল চালিত গভীর নলকূপ রয়েছে ১৪৯টি, অগভীর নলকূপ ২ লাখ ৮৫ হাজার ৭০৪টি, পাওয়ার পাম্প ৮৪৩টি ও বিদ্যুৎ চালিত ৫৬ হাজার ৩৮২টি সেচযন্ত্র এবং পা চালিত সেচযন্ত্র ২৭ হাজার ৬৮৩টি ।
তিস্তা ব্যারেজ সেচ প্রকল্পের কর্তব্যরত ডালিয়া পওর বিভাগের ভারপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রকৌশলী মাহাবুবুর রহমান জানায়, তিস্তা ব্যারেজের সেচের পানি দিয়ে আসন্ন সেচ নির্ভর বোরো আবাদে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলার ৪৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে নীলফামারী জেলায় ২৬ হাজার ৫শত হেক্টর, দিনাজপুর জেলায় ২ হাজার হেক্টর ও রংপুর জেলায় ২৫ হাজার ৫শত হেক্টর জমিতে।
তিনি আরও জানান,পর্যাপ্ত পানির অভাবে তিস্তা ব্যারেজের সেচ কার্যক্রম কোনোভাবেই চালু করা সম্ভব হবে না। কারণ ভরা বর্ষায় ব্যারেজ এলাকায় যেখানে পানি থাকার কথা ৩০হাজার কিউসেক। সেখানে বর্ষা শেষ না হতেই নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই পানি শূন্য হয়ে পড়েছে ব্যারেজ এলাকা।

