চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : দেশজুড়ে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে র্যাব-পুলিশ-ডিবি ও বিজিবির সমন্বয়ে যৌথ বাহিনীর অভিযানে শুরু হয়েছে। নাশকতাকারীদের মনে ভীতি তৈরি ও নাশকতা দমনের কৌশল হিসেবেই মূলত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে যৌথ বাহিনীর এ অভিযান বলে জানা গেছে।
শুক্রবার বেলা ১২ টা থেকে দুপুর ২ টা পর্যন্ত নগরীর কোতোয়ালী থানার আন্দরকিল্লা এলাকায় তল্লাশির মাধ্যমে যৌথ বাহিনীর এ অভিযান শুরু হয়। এসময় দেশীয় চোলাই মদ বহনের দায়ে নারীসহ দুজন এবং সন্দেহজনকভাবে আরো তিনজনকে আটক করা হয়েছে।
এরআগে গত ২৫ অক্টোবর থেকে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় নগরজুড়ো কঠোর নিরাপত্ত বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে চেক পোস্ট ও টহল পুলিশের সংখ্যা। নগরীর সব সরকারি স্থাপনায় সার্বক্ষনিক পুলিশ মোতায়ন রয়েছে। বিশেষ করে বাস টার্মিনাল, রেল স্টেশন, গুরুত্বপূর্ণ সব সরকারি স্থাপনায় বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া পতেঙ্গায় অবস্থিত তেল স্থাপনাসহ কেপিআইগুলোতে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পুরো নগরীকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার কাজও শুরু করেছে সিএমপি।
এরমধ্যে নতুন করে গত মঙ্গলবার থেকে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কায় চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ডগ স্কোয়াড মোতায়ন করেছে বিজিবি। দুটি প্রশিক্ষিত ডগের সমন্বয়ে ১২ জন বিজিবি সদস্যের এ ডগ স্কোয়াড বিমান বন্দর দিয়ে আসা মাদকদ্রব্য ও বিস্ফোরক উদ্ধারে কাজ করছে। তারও আগে থেকে বিমান বন্দরে সাধারণ দর্শনার্থীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি এপিবিএনের প্রায় দুইশ বাড়তি ফোর্স মোতায়ন রয়েছে। যাত্রী প্রবেশ ও বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের সর্বোচ্চ সর্তকতার সাথে তল্লাশি করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে বন্দর নগরীকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলার দাবি করছে পুলিশ।
এদিকে গত বুধবার সাভারের আশুলিয়ায় চেক পোস্টে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাতে শিল্প পুলিশের কনেস্টেবল মুকুল মিয়া নিহত হওয়ার পর দেশজুড়ে নিরাপত্তা তল্লাশি জোরদার করার নির্দেশ দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের প্রতি দেয়া হয় বিশেষ নির্দেশনা। এছাড়া তল্লাশির সময় শিথিলতা পরিহার করে যথাযত সাবধানতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরের এক আদেশে। তল্লাশির সময় কমপক্ষে একজন অতিরিক্ত উপ কমিশনারকে (এডিসি) সেটি তদারকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পুলিশ সদস্যদের গুলিভর্তি অস্ত্র, বুলেট প্রুপ জ্যাকেট, হেলমেট ও ল্যাগ গার্ড পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রয়োজনে আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোঁড়ার বিষয়টিও নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে পুলিশ সদস্যদের।
সিদ্ধান্তানুযায়ী, শুক্রবার বেলা ১২ টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত প্রায় দুঘন্টা ব্যাপী যৌথবাহিনী তল্লাশি শুরু করে। এসময় সড়কে চলাচলরত সন্দেহজনক লোকজনকে তল্লাশি করা হয়েছে। এছাড়া সন্দেহজনক গতিবিধির রিকশা, সিএনজি অটোরিকশা, ও প্রাইভেট গাড়ী তল্লাশি করা হয়েছে। এমনকি আন্দরকিল্লা জামে মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদেরও শরীর তল্লাশি করে মসজিদে প্রবেশ করতে দিয়েছে যৌথ বাহিনী। তল্লাশির সময় উদয়বড়ুয়া ও সাধনা ভট্ট নামে নারীসহ দুজনকে চোলাই মদসহ আটক করা হয়। একই অভিযানে সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে আরো তিনজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানিয়েছেন কোতোয়লী থানার ওসি জসিম উদ্দিন।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘বিদেশি হত্যাকাণ্ডের পর থেকে নগরীতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি ছিল। এরপর সন্ত্রাসী হামলার গোয়েন্দা তথ্য পাওয়ার পর নগরীতে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরো কঠোর থেকে কঠোর করা হয়েছে। নগরীর প্রতিটি অলিতে-গলিতে নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।’
দেবদাস ভট্টাচার্য আরো বলেন, ‘আশুলিয়ায় পুলিশ সদস্য খুন হওয়ার পর নতুন করে নির্দেশনা আসায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে সিএমপির নিয়মিত চেক পোস্টের পাশাপাশি সারপ্রাইজিং চেক পোস্ট বসিয়ে তল্লাশি জোরদার করা হচ্ছে। এসব সারাপ্রাইজিং চেক পোস্টে র্যাব-ডিবি-পুলিশের পাশাপাশি বিজিবি সদস্যরাও অংশ নিচ্ছে। এখন থেকে যৌথবাহিনীর সমন্বয়ে নগরজুড়ে দৈনিক তিন চারটি সারপ্রাইজিং চেক পোস্ট বসানো হবে। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে যে কোনো স্থানে অভিযানও চালাবে যৌথবাহিনী।’
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পরিচালক (অপারেশন) লে. কর্ণেল এ আর এম নাসির উদ্দিন একরাম বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে শুক্রবার থেকে বিজিবির এক প্লাটুন সদস্য র্যাব-পুলিশের সাথে তল্লাশি ও অভিযানে অংশ নিচ্ছে। মূলত নাশকতা দমনের কৌশল হিসেবেই যৌথ বাহিনী এ অভিযান শুরু করেছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত যৌথ বাহিনীর এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এমনিতে গত মঙ্গলবার থেকে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিরাপত্তায় বিজিবির দুটি ডগের সমন্বয়ে বিজিবির ডগ স্কোয়াড মোতায়ন করা হয়েছে। এই ডগ স্কোয়াড বিমান বন্দর দিয়ে আসা মাদকদ্রব্য ও বিস্ফোরক উদ্ধারে কাজ করছে।’
র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র্যাব) -৭ এর সিইও লে.কর্ণেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে নাশকতা মোকাবেলায় পুলিশের সাথে র্যাব যৌথ অভিযানে অংশ নিচ্ছে। এরআগেও এই ধরণের পরিস্থিতি র্যাব-পুলিশ-বিজিবি একসাথে কাজ করেছে, এখনো করছে। দুই প্লাটুন র্যাব সদস্য যৌথ বাহিনীর এ অভিযানে থাকার পাশাপাশি ১২ প্লাটুন নগরীতে আলাদাভাবে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছে।’

