
নিজস্ব প্রতিবেদক : জাগৃতি প্রকাশনের মালিক ও প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। সোমবার দুপুর ২টার দিকে শাহবাগ থানায় দীপনের স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান বাদি হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শাহবাগ থানার ওসি আবু বক্কর সিদ্দিকী।
গত শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় জাগৃতি প্রকাশনীর অফিসের ভেতরে প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সাল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি জঙ্গিদের হামলায় নিহত মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞানমনস্ক লেখক অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক ছিলেন।
দীপন হত্যার পর দীপনের বাবা বিশিষ্ট কলামিস্ট আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, ‘আমার ধারণা ‘শুদ্ধস্বর’র স্বত্ত্বাধিকারী আহমেদুর রশীদ টুটুলকে হামলাকারীরাই আমার ছেলেকে হত্যা করেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি আইনানুযায়ী হয়তোবা মামলা করবো। তবে বিচার নিয়ে আশা করি না। কেননা আমি জানি এসবের বিচার হবে না।’
লিটলম্যাগের কাজ করতে করতে একটা সময় বইয়ের প্রতি ভালবাসা ও মমতাবোধের তৈরি হয় দীপনের। সেখান থেকেই প্রকাশন সংস্থার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। বিষয়ভিত্তিক, সৃজনশীল, মননশীল বই বেশি প্রকাশ করা হতো তার প্রকাশনা থেকে।
রোববার শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটে গিয়ে দেখা যায় ব্যবসায়ীরা মার্কেটটি বন্ধ রেখেছে। আজিজ সুপার কো-অপারেটিভ বহুমুখি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নাজিমুদ্দিন নাজিম বলেন, ‘অফিসে ঢুকেই দেখি নামাজে সিজদা দেয়ার মতো উপুড় হয়ে পড়ে আছেন দীপন। হামলার পরই তিনি মারা গেছেন। সিসিটিভি ক্যামরায় তার খুনির চেহারা এসেছে কি না জানি না। কয়েকটি ফুটেজ পুলিশ নিয়ে গেছে। তবে দীপনের অফিসের সামনে ক্যামেরা ছিল না।’
এদিকে ছায়া তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রোববার ডিবি পুলিশ, পুলিশ ব্যুারো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), র্যাবসহ কয়েকটি সংস্থা আজিজ মার্কেটের আটটি পয়েন্টের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে গেছে। এই ফুটেজে দুপুর আড়াইটার দিকে দীপন মার্কেটের মধ্যে চলাফেরা করেছেন বলে দেখা গেছে। তিনি আজিজ মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় অন্তরে রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার খান। এরপর তার কার্যালয়ে গিয়েই হামলাকারীদের কবলে পড়েন। তার আগে বা পেছনে সন্দেহভাজন খুনিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। অন্তরে রেস্তোরাঁয় দুপুর ২টা ২৬ মিনিটে ঢোকেন দীপন। সামনের টেবিলে বসে খাবার খান তিনি। ঠিক ২টা ৪১ মিনিটে বিল দিয়ে বের হয়ে যান। এরপরই তিনি নিজ কার্যালয়ে যান। পরে সেখানে খুন হন। এই চলাচলের সময় দীপনের অবস্থান পরীক্ষা করা হচ্ছে।
রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে দীপনের ময়না তদন্ত করেন ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. কাজী আবু শামা। তিনি বলেন, ‘নিহতের মাথার পেছনে একটি ১১ ইঞ্চি লম্বা এবং পাঁচ ইঞ্চি গভীর আঘাত আছে, যার কারণে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তার মৃত্যু হতে পারে। তিনি মারা যাওয়ার এক ঘণ্টা আগে খাবার খান, যা তার পাকস্থলিতে ছিল। আগে ব্লগার হত্যার সময় যেভাবে মাথা ও ঘাড়ে আঘাত করা হয় দীপনকেও একই কায়দায় আঘাত করা হয়।’
দীপনের লাশের সুরতহাল করেছেন শাহবাগ থানার পরিদর্শক শাহিন ফকির। তিনি লিখেছেন, ‘নিহতের ডান কানের নিচে ঘাড়ে ১০ ইঞ্চি লম্বা একটি জখম আছে। মাথার পেছনে বাম পাশে পাঁচ ইঞ্চি, ডান পাশে ছয় ইঞ্চি এবং পাশাপাশি চার ইঞ্চি আরো একটি কাটা জখম আছে। এগুলো পেছন থেকে ভারী ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সৃষ্টি হয়েছে।’
ছায়া তদন্তকারী একটি সূত্র জানায়, আজিজ সুপার মার্কেট ব্যস্ত এলাকা। এখানে হামলা করে পালাতে গেলে বাধার মুখে পড়ার আশঙ্কা আছে। তাই এই হত্যাকাণ্ডে বেশ কয়েকজন খুনি অংশ নেয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। আলামত ও পূর্বাপর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কমপক্ষে পাঁচজন ছিল।
এদিকে লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বর কার্যালয়ে হামলার সময় গুলিও করা হয়েছে। আগে কোনো ব্লগার হত্যায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার হয়নি।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বইমেলা চলাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে ব্লগার অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ১৮ আগস্ট র্যাব তৌহিদুর রহমান, সাদেক আলী মিঠু ও আমিনুল মল্লিক নামে তিন এবিটি সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তবে হত্যার পরিকল্পনার পেছনে কারা, তা আজও জানা যায়নি। গোয়েন্দারা বলছেন, এই ঘটনায় সন্দেহভাজন কয়েকজনের ছবি পাওয়া গেছে।
হামলার শিকার দুই প্রকাশকই ব্লগার অভিজিৎ রায়ের বই প্রকাশ করেছেন। অভিজিৎ হত্যার সঙ্গে এসব ঘটনার যোগসূত্র ও তদন্ত বিষয়ে মনিরুল বলেন, ‘অভিজিৎ হত্যার পর এফবিআইকে আমরা ১১টি আলামত দিয়েছি, যার পরীক্ষার ফল তারা এখনো আমাদের দেয়নি। এ ছাড়া ওই তদন্তকাজে তারা আমাদের আর কোনো সহায়তা করতে পারেনি। আমরা জানি তারাও চেষ্টা করছে। আমরা কয়েকজনের ছবি পেয়েছি। শনাক্তের চেষ্টা চলছে।’
প্রসঙ্গত, গত শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে লালমাটিয়ায় শুদ্ধস্বরের কার্যালয়ে এই প্রকাশক আমমেদুর রশীদ টুটুল, কবি ও ব্লগার তারেক রহিম এবং ব্লগার-লেখক রনদীপম বসুকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। বই ক্রেতা সেজে অফিসে ঢুকে গুলি চালায় হামলাকারীরা। শুদ্ধস্বর প্রকাশনা সংস্থা থেকে খুন হওয়া ব্লগার অভিজিৎ রায়ের ‘সমকামিতা’, ‘অবিশ্বাসের দর্শন’, ‘ভালবাসা কারে কয়’ নামক বইগুলোও প্রকাশিত হয়। এছাড়া ২০১৫ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল অভিজিৎ রায় ও মীজান রহমানের যৌথ লেখা ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’।
অন্যদিকে দীপনের জাগৃতি প্রকাশনী থেকে নিহত বিজ্ঞান লেখক অভিজিত রায়ের ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ বইটি প্রকাশ করা হয়।

