নীলফামারী প্রতিনিধি : জেলায় ৩১৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভেঙে পড়েছে প্রশাসনিক কার্যক্রম। ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের আদেশ নির্দেশ মানতে চান না সহকারী শিক্ষকরা। ফলে ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, নীলফামারী জেলার ৮৮১টি বিদ্যালয়ে মধ্যে ৩১৩টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদটি শূন্য আবস্থানে রয়েছে।
শূন্য পদগুলোর মধ্যে রয়েছে কিশোরগঞ্জে ৩১টি, জলঢাকায় ৯২টি, ডিমলায় ৫৫টি, ডোমারে ৬০টি, নীলফামারী সদরে ৬২টি এবং সৈয়দপুরে ১৩টি। সদ্য সরকারি হওয়া বিদ্যালয়গুলোসহ জেলায় মোট বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৪৭টি। এরমধ্যে প্রধান শিক্ষক পদে অনুমোদিত বিদ্যালয় রয়েছে ৮৮১টি। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করছে তিন লাখ ৯০হাজার ৩৪৯জন শিক্ষার্থী।
সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ উপজেলা ছিট রাজীব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, প্রধান শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা যে যার মতো করে মাঠে ছুটাছুটি করে বেরাচ্ছে। শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩৫০ জন হলেও উপস্থিতি ১০০ এর মতো। শিক্ষকরা গাল গল্প নিয়ে ব্যস্ত। শিক্ষার্থীরা পড়ছে কিনা সেদিকে শিক্ষকদের নেই কোনো খেয়াল।
প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্তের ভারে ভরাক্রান্ত। পুরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তিনজন সহকারী শিক্ষকের মধ্যে দু’জন শিক্ষক আবু হেলাল ও নাহিদ হোসেন নিজ খেয়াল খুশিমতো বিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন। পাঠদানের জন্য যান না শ্রেণি কক্ষে। বিদ্যালয়ে কোনো ক্লাসই ঠিকমতো হচ্ছে না।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য জামুদ্দি মামুদ ও দুলাল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষকদের মধ্যে কোনো সমন্বয় নেই। কেউ কারো কথা শুনে না। যার কারণে পড়াশোনার মানোন্নয়ন হচ্ছে না, স্কুল পরিচালনায় ত্রুটি দেখা দিয়েছে।’
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ইয়ামিন কবির স্বপন অভিযোগ করে বলেন, ‘দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবত বিদ্যালয়টিতে পূর্ণাঙ্গ প্রধান শিক্ষক না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। সহকারী একজন শিক্ষক ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। বিশেষ করে সহকারী শিক্ষক প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকায় অন্যান্যে শিক্ষকরা তাকে শ্রদ্ধা করতে চান না। তাছাড়াও কোনো আদেশ নির্দেশও পালন করতে অনিহা প্রকাশ করেন। বলা যায় চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির।’
নীলফামারী জেলা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও গুড়গুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন,‘পাঠদানের ক্ষেত্রে সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে আধুনিকায়নের ফলে শিখন পদ্ধতিও বদলাচ্ছে। এমন অবস্থায় শিক্ষক সংকট লেখাপড়ার মানোন্নয়নকে অনেকাংশে বাঁধাগ্রস্থ করে তুলছে। অতিদ্রুত প্রধান শিক্ষকসহ সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে বিদ্যালয়গুলোকে পরিপূর্ণতা দেয়া প্রয়োজন।’
নীলফামারী সদর উপজেলার সহকারী শিক্ষা অফিসার রহুল আমিন প্রধান শিক্ষকহীন বিদ্যালয়গুলোর সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমার তত্ত্বাবধানে ২৪টি স্কুল রয়েছে। এরমধ্যে আটটি স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই দীর্ঘদিন। দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী শিক্ষকরা। অনেক ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের আদেশ নির্দেশ মানতে চান না অন্যান্য শিক্ষকরা। সেক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। তবে প্রশাসনিক কাজে কোনো ত্রুটি হচ্ছে না বলে মনে করেন তিনি।’
অতিদ্রুত প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দিলিপ কুমার বণিক প্রধান শিক্ষক না থাকায় স্কুলগুলোয় শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় বিরুপ প্রভাব পড়ছে মন্তব্য করে বলেন, ‘আমরা শূন্যপদ পূরণে সরকারের সংশ্লিষ্ঠ বিভাগে লিখিতভাবে জানিয়ে আসছি। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত পদপূরণ করা সম্ভব নয়। তবে অতিদ্রুত শিক্ষকদের পদোন্নতি এবং নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।’

