কুষ্টিয়া প্রতিনিধি : আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ সদর আসনের সংসদ সদস্য মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ কোনো ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি জাতপাত বিশ্বাস না করে মানবতার কল্যাণে কাজ করে গেছেন।’
শুক্রবার রাতে কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ীতে কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসন ও লালন একাডেমির আয়োজনে বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১২৫তম তিরোধান দিবস উপলক্ষ্যে ৫ দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী দিনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘জাতহীন মানবদর্শন ও সঙ্গীত বর্তমানে সার্বজনীন বিদিত বিশ্বাঙ্গনে। বিশ্বময় যখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ভঙ্গ করে দাঙ্গা-হাঙ্গামা নিয়ে চরম অশান্তিতে রয়েছে। তখন আমাদের দেশের সকল ধর্মের লোক লালন শাহের অসম্প্রদায়িক শান্তির বাণী বুকে ধারণ করে সকলে মিলে-মিশে শান্তিতে বসবাস করছি। বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ এমনি একটি অসাম্প্রদায়িক সাম্যের সমাজ গড়ে তুলতে চেয়ে ছিলেন। লালন জাতপাত বিশ্বাস করেনি মানবধর্মে বিশ্বাস করেছিলেন।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বিদায়ী হজে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার কথা বলেছিলেন। আর এখন ধর্ম নিয়ে মানুষ রাজনীতি করছে। যার কারণে সমাজে হানাহানি মারামারির ঘটনা ঘটছে।’
আওয়ামী লীগের এই নেতা আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন বাংলাদেশকে আরো সামনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে ঠিক তখনি একটি মহল ধর্মের নামে দোহায় দিয়ে মানুষ হত্যা করছে এবং ধর্মের দোহায় দিয়ে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ সৃষ্টি করে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। আর এখন তাই সময় এসেছে আমরা প্রতিবছর এই লানের ধামে এসে শপথ নিয়ে দীক্ষা নিই মানুষের প্রতি মানুষের সম্প্রীতি সোহার্দ্য ও সহানুভুতিশীল হয়ে দেশটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবেই লালনের আত্মা শান্তি পাবে।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি বেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার প্রলয় চিসিম, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, সহ-সভাপতি হাজী রবিউল ইসলাম, কুমারখালী উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান খান, কুমারখালী পৌরসভার মেয়র শামসুজ্জামান অরুন, লালন একাডেমির সাবেক সাধারণ সম্পাদক তাইজাল আলী খান।
অনুষ্ঠানে লালনের জীবনাদর্শন নিয়ে আলোচনা করেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. সরওয়ার মুর্শেদ রতন ও ফকির লালন শাহের মাজারের প্রধান খাদেম মহম্মদ আলী।
শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন, কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাহেলা আক্তার। স্বাগত বক্তব্য দেন, লালন একাডেমির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. সেলিম হক।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই আগত অতিথিদের কুষ্টিয়া লালন একাডেমির পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া দিয়ে এবং আলোচনা শেষে ক্রেস্ট স্মারকগ্রন্থ ও বিশেষ উপহার দিয়ে বরণ করে নেয়া হয়।
এ সময় লালন স্মারকগ্রন্থের মোড়ক ও বাউল শিল্পীর সিডির মোড়ক উন্মোচন করেন অতিথিরা।
৫ দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী দিনে লালন একাডেমি চত্বরে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। কালী নদীর তীরে অবস্থিত উন্মুক্ত মঞ্চে প্রতিদিন লালন বিষয়ক আলোচনা, বিভিন্ন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে লালনগীতি পরিবেশন এবং আখড়া বাড়ির বিশাল এলাকা জুড়ে বসেছে লালন মেলা।
মাজারের ভেতরে আয়না মহলে চলছে সাধু-ভক্তদের লালনগীতি পরিবেশন। আলোচনা শেষে দ্বিতীয় পর্বে লালন মঞ্চে বিভিন্ন শিল্পি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে পরিবেশিত হয় লালন সংগীত। এতে উদ্বোধনী প্রার্থনা সংগীত পরিবেশন করেন লালন একাডেমির নির্বাহী সদস্য বাউল আব্দুল কুদ্দুস। স্থানীয় শিল্পীরা লালন সঙ্গীত পরিবেশন করেন। গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই সংগীত পরিবেশন। উৎসবকে ঘিরে পুরো একাডেমি চত্বরে খণ্ড-খণ্ড হয়ে গান পরিবেশনের সময় দর্শক-শ্রোতারাও নেচে-গেয়ে গানের সাথে সাথে তাল দেয়। দর্শক-শ্রোতারা কখনো পিন-পতন নীরবতায় গান শুনছেন আবার কখনো গানের তালের সাথে সাথে করতালি দিয়ে মুখর করে তুলছেন বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র আখড়াবাড়ীর আঙ্গিনা।

