মেহেরপুর প্রতিনিধি : মেহেরপুর জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ঐতিহ্যবাহী ভৈরব নদ পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। এ লক্ষ্যে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদসহ নদের পুরো জমি (সীমানা) পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। খননকাজ শেষ হলে নদীতীরবর্তী এলাকায় সেচ সুবিধাসহ এ নদ ফিরে পাবে হারানো গৌরব। এতে উপকৃত হবে জেলার কয়েক লাখ মানুষ। রক্ষা পাবে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্যও।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) চুয়াডাঙ্গা কার্যালয় সূত্র জানায়, দখল আর দূষণে একসময়ের প্রমত্ত ভৈরব মরা খালে পরিণত হয়। নদটি খননে দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে এলাকাবাসী। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তা আটকে ছিল। ২০১০ সালে মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুজিবনগরের আম্রকাননে এলে এ দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। তখন তিনি ভৈরব পুনঃখননের প্রতিশ্রুতি দেন।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, ভারত থেকে বাংলাদেশে ভৈরবের প্রবেশদ্বার গাংনী উপজেলার কাথুলী থেকে মুজিবনগরের রতনপুর পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার পুনঃখননের উদ্যোগ নেয় সরকার। এতে ব্যয় ধরা হয় ৭০ কোটি ৬৫ লাখ ৫১ হাজার ২১৬ টাকা। চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল খননকাজ শুরু হয়। ২০১৭ সালের ৩০ এপ্রিল কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধে খননকাজের দায়িত্ব দেওয়া হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কার্স লিমিটেড, নারায়ণগঞ্জকে। এরই মধ্যে প্রকল্পের প্রায় ২৫ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। মাঝে বর্ষায় অতিবৃষ্টির কারণে খননকাজ সাময়িক বন্ধ ছিল। আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে আবারও পুরোদমে কাজ শুরু হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, পুনঃখননের মধ্য দিয়ে ভৈরব নদ তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। আশার কথা, ১৯২২ সালের রেকর্ড অনুযায়ী নদের যে আয়তন ছিল, তা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। বর্তমানে ৫০ মিটার প্রস্থ ও সমতল থেকে তলদেশের গভীরতা ৫ মিটার রেখে খননকাজ চলছে। ফলে নদীতে সারা বছর পানিপ্রবাহ থাকবে। এতে নৌকা চলাচলের পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির মাছের উৎস সৃষ্টি হবে। এছাড়া খননকাজ শেষ হলে নদীর পাড়জুড়ে বৃক্ষরোপণ, ওয়ার্কিং প্লেস ও অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। অন্যদিকে সেচ সুবিধা পেলে এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে।
স্থানীয় লোকজন জানান, নৌবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে খননকাজ চলায় তা ভালোভাবে হচ্ছে। বেসরকারি কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করা হলে তা সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হতো না। এছাড়া নৌবাহিনীর অনুরোধে দখলদারদের বেশিরভাগ তাদের স্থাপনা অপসারণ করেছে। আর খননকাজে সব ধরনের সহযোগিতা করছেন স্থানীয়রা।
এ জেলার প্রধান নদ ভৈরব। নাব্য সংকটের সুযোগে প্রভাবশালীরা নদীর বেশিরভাগ জমি দখল করে চাষাবাদ শুরু করে। দুই দশক ধরে বর্ষায় কিছু পানির দেখা মিললেও শীতকালে মরা খালে পরিণত হয়। এ অবস্থায় ভৈরব পুনঃখনন জেলাবাসীর প্রধান দাবিতে পরিণত হয়। সরকারও এতে সাড়া দেয়। এরই ধারাবাহিকতায় শুরু হয় খননকাজ।
উপজেলার রসিকপুর গ্রামের এক কৃষক বলেন, ‘প্রভাবশালীরা ভৈরবের বেশিরভাগ জায়গা দখল করে নিয়েছিল। সেখানে তারা কয়েক বছর ধরে মাছ ও ধান চাষ করে আসছে। এ সময় সাধারণ কৃষক ও জেলেদের প্রবেশের উপায় ছিল না।’
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন দোদুল বলেন, ‘ভৈরব নদ পুনঃখনন জেলাবাসীর জন্য বড় পাওনা। দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হতে যাওয়ায় সাধারণ মানুষও খুশি।’ জেলার অন্য নদ-নদীও পুনঃখননের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, পদ্মার প্রধান শাখানদ হিসেবে ভৈরব মেহেরপুরের কাথুলী দিয়ে প্রবেশ করে চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা পর্যন্ত বিস্তৃত। নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫০ কিলোমিটার। খুলনার ইছামতি ও যশোরের কপোতাক্ষ হচ্ছে ভৈরবের শাখানদী।

