কক্সবাজার প্রতিনিধি : ‘দালালদের মিষ্টি কথায় স্বপ্ন দেখেছিলাম। যখন স্বপ্ন ভাঙল তখন আর ফিরে আসার সুযোগ ছিলনা। মৃত্যু কাকে বলে তা খুব কাছ থেকে দেখেছি। অনাহারে-অর্ধাহারে ও নির্মম অত্যাচার সহ্য করে ৭ মাস পর দেশে ফিরলাম। এখন খুব খুশি লাগছে। মনে হচ্ছে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি।’
কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে ঘরে ফেরার আগে কথাগুলো বলছিলেন মিয়ানমার ফেরত অভিবাসী বগুড়ার হেদায়ত আলী, ফিরোজ আহমদ ও শুক্কুর।
তারা জানান, তাদের কিছু চিহ্নিত দালাল স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সহজ ও কম খরচে মালয়েশিয়া গিয়ে ভালো বেতনে চাকরি পাওয়া যাবে। এতে তাদের জীবন বদলে যাবে। সেই স্বপ্ন নিয়ে তারা মালয়েশিয়া যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে বুঝতে পারেন তারা দালালদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তাদের মতো একই ভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছে আরও অনেক বাঙালি। অনেকে মাঝ সমুদ্রে দালালদের খপ্পরে জিম্মি রয়েছে বলেও জানান তারা।
জেলা প্রশাসনের সূত্র মতে, সাগর পথে মালয়েশিয়া যেতে গিয়ে মিয়ানমারের জলসীমা থেকে সাগরে ভাসমান অবস্থায় গত ২১ মে ২০৮ জন এবং ২৯ মে ৭২৭ জন অভিবাসী প্রত্যাশীদের উদ্ধার করে দেশটির নৌ-বাহিনী। উদ্ধার হওয়া এসব অভিবাসীদের মিয়ানমার প্রথম থেকে বাংলাদেশি নাগরিক বলে দাবি জানিয়ে আসছিল। এদের মধ্যে বাংলাদেশি হিসেবে শনাক্তদের ৮ জুন, ১৯ জুন, ২২ জুলাই, ১০ আগস্ট ও ২৫ আগস্ট পাঁচ দফায় দেশে ফেরত আনা হয় ৬২৬ জনকে। গত সোমবার নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সিদ্ধান্ত দিয়ে ষষ্ঠ দাফয় ফেরত আনা হয় আরও ১০৩ জনকে। তাদের কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রাখার পর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বাড়িতে পৌঁছানো হয়।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবদুস সোবাহান জানান, গত সোমবার ষষ্ঠ দফায় ফেরত ১০৩ জনের মধ্যে ৬ শিশুকে মঙ্গলবার আদালতে হাজির করা হয়। আদালতের নির্দেশে ৬ শিশুকে রেডক্রিসেন্টের জিম্মায় স্বজনদের কাছে পৌঁছানো হয়। বুধবার অপর ৯৭ জনকে আইওএম’র অধিনে বাড়িতে পাঠানো হয়।
ফরিদপুরের রহমান ও ইলিয়াস বলেন, ‘দালালের খপ্পরে পড়ে মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছি। অনেক কষ্টের পর এখন ঘরে ফিরে মা-বাবা, ভাই বোনকে দেখতে পাবো বলে খুবেই ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে ঈদ উদযাপন করছি।’
অত্যাচার-নির্যাতনের বর্ণনা দিতে গিয়ে চোখের জল মোছেন তারা। এ সময় দালালদের কঠোর শাস্তি দাবি করে তারা বলেন,‘আর কেউ যেনো এ ভুল পথে পা না বাড়ায়।’
কক্সবাজারের সহকারী পুলিশ সুপার ছত্রধর ত্রিপুরা জানান, ১০৩ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ১০৩ জন দালালের নাম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কক্সবাজারের রয়েছে ২৮ জন। এসব দালালদের বিরুদ্ধে ১৮ জেলায় মামলা হবে। ফেরত আসা লোকজন নিজ জেলায় গিয়ে এ মামলা দায়ের করবে। এ পর্যন্ত যেসব মামলা হয়েছে তার আসামিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
আইওএম’র ন্যাশনাল প্রোগাম কর্মকর্তা আসিফ মুনীর জানান, ১০৩ জনকে বাড়িতে পৌঁছানো হচ্ছে। মিয়ানমারে আর কোনো বাংলাদেশি নেই বলে সরকারি সূত্রে জেনেছেন তিনি।
এদিকে, কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সামনে অনেক স্বজনদের ঘুরতে দেখা গেছে। তারা বলেন, ‘তাদের সন্তানরা মালয়েশিয়া গিয়ে নিখোঁজ রয়েছে।’
ছেলে এবং ভাইয়ের জন্য কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সামনে কথা হয় কক্সবাজার শহরের মধ্যম কুতুবদিয়া পাড়ার ছফুরা খাতুন ও রামু উপজেলার গর্জনিয়া এলাকার কলিম উল্লাহর সঙ্গে। তারা বলেন,‘তাদের সন্তান ও ভাই সমুদ্র পথে মালয়েশিয়া গিয়ে নিখোঁজ রয়েছে।’
ছফুরা খাতুন বলেন, ‘দালালের হাত ধরে ৩ বছর আগে আমার ছেলে রমজান আলী টেকনাফ সমুদ্র পথ দিয়ে মালয়েশিয়ায় যায়। এখন পর্যন্ত তার কোনো খোঁজ খবর পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে থানায় ও বিজিবিকে জানানো হয়েছে দেড় বছর আগে। কিন্তু তার কোনো খবর নেই। তাই বার বার ছেলের সন্ধানে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে চলে আসি। কিন্তু এবারও আমার ছেলেকে পাওয়া গেল না।’
কলিম উল্লাহ বলেন, ‘ভাই দুদু মিয়াকে পাওয়া গেলো কিনা সে খবর নিতে প্রায়ই কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে আসি। কিন্তু এবারও পাওয়া গেল না।’
এদিকে, নিখোঁজদের সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই জেলা প্রশাসনের কাছে। মিয়ানমার থেকে ফেরত আনার প্রক্রিয়াও শেষ বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবদুস সোবাহান।
আইওএম কর্মকর্তা আসিফ মুনীর বলেন, ‘মানবপাচারের মামলা নিয়ে সন্দিহান আইওএম। এটার জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়া প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে শীতের মৌসুমে ফের মানবপাচার হয় কিনা তার জন্য সতর্ক থাকতে হবে।’

