চট্টগ্রাম প্রতিনিধি : ৫ অক্টোবর, সৎ মায়ের পরিকল্পনায় সৎ ভাইসহ চার সদস্যের কিলিং স্কোয়াডের হাতে খুন হয় ছয় বছরের শিশু সামির। ১২ অক্টোবর, কলেজ পড়ুয়া ছোট ভাইয়ের হাতে ছুরিকাঘাতে নিজ বাসায় খুন হন প্রকৌশলী বড় ভাই সোহেল চৌধুরী। ১৪ অক্টোবর, মানসিক ভারসাম্যহীন ৪০ বছর বয়সী ছেলের ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা রওশন আরা।
এই তিনটি খুনের ঘটনাই ঘটেছে চলতি সপ্তাহে বন্দর নগরী চট্টগ্রামে। তিনটি হত্যাকাণ্ডের ধরণ দেখে পুলিশ বলছে, এগুলো পারিবারিক হত্যাকাণ্ড। আর এই তিন খুনের পেছনের প্রতিটির ব্যাকগ্রাউন্ডও প্রায় অভিন্ন। সব হত্যার পেছনেই রয়েছে পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, সামাজিক অস্থিরতা ও সম্পত্তির বিরোধ। শুধু এই তিনটি হত্যাকাণ্ড নয়, দেশের প্রতিটি জেলায় প্রতিদিন এরকম পারিবারিক হত্যাকাণ্ড ঘটেই চলছে। পারিবারিক সহিংসতা দিন দিন বেড়েই চলছে আশঙ্কাজনহারে।
বিশ্লেষকদের মতে, একে অপরের প্রতি সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণ সমাজ ও পরিবার থেকে ক্রমেই উঠে যাচ্ছে। মানুষের মূল্যবোধের জাগ্রত বাতিটি ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে। আকাশ-সংস্কৃতি আর ব্যক্তিগত ব্যস্ততার কারণে একে অপরের সাথে পারিবারিক যোগাযোগও কমিয়ে দিচ্ছে। শ্রদ্ধা-স্নেহ, মায়া ভালবাসাবোধও ক্রমশ: হ্রাস পাচ্ছে। এতে করে প্রতিনিয়ত বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা, খুন-খারাবি। মানুষ নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে ধীরে ধীরে ক্রোধ সংযম করতে না পেরে অসহিঞ্চু হয়ে উঠছে।
পারিবারিক কলহ, মাদক, যৌতুক, পরকীয়া, প্রেম, দাম্পত্য সমস্যা, ঋৃণগ্রস্থ, শারীরিক অক্ষমতা, জমি-জমার বিরোধকে কেন্দ্র করেই অধিকাংশ খুনের ঘটনা ঘটছে। পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার কারণে জীবনে বাড়ছে হতাশা, মানসিক বিষন্নতা, আর্থিক দৈন্যতা। নৃশংস এসব হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে শিশুরাও। একারণে হিংসা-বিদ্বেষ বেড়ে গিয়ে পারিবারিক খুনের ঘটনা অহরহ বাড়ছে। এসব থেকে পরিত্রাণ পেতে সামাজিক, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় অনুশাসন বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে চট্টগ্রাম মহানগরীতে পারিবারিক সহিংসতায় খুন হয়েছেন তিনজন। এরমধ্যে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নগরীর চান্দগাঁও থানার মোহরা কামাল বাজার এলাকায় মানসিক ভারসাম্যহীন অসুস্থ ৪০ বছর বয়সী জহিরুল হক সবুজ নামে এক ছেলের ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন রওশন আরা নামে ৬০ বছরের এক বৃদ্ধা মা। সকালে বেলা মায়ের কাছে টাকা চেয়ে না পেয়ে সন্ধ্যায় নিজ মেয়ের সামনে বাসায় মাকে খুন করেন সবুজ। তবে ঘটনার পর থেকেই তিনি পলাতক।
গত ১০ অক্টোবর সকালে কলেজ না যাওয়া শাসন করায় কলেজ পড়ুয়া ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে খুন হন নগরীর কোতোয়ালি থানার জামালখান ওয়ার্ডের রাবেয়া লেনের বাসিন্দা প্রকৌশলী সোহেল চৌধুরী। দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভোগার এক পর্যায়ে বড় ভাইকে খুন করে ঢাকায় পালিয়ে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের দ্বিতীয় দিনের মাথায় নিজেই পুলিশের কাছে গিয়ে আত্মসমর্পণ করেন নগরীর কাজেম আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র ঘাতক রায়হান চৌধুরী।
এরও আগে গত ৫ অক্টোবর নগরীর বন্দর থানার দক্ষিণ-মধ্যশ হালিশহর এলাকায় দুই সতীনের বিরোধের জেরে সামির নামে ৬ বছরের বড় সতীনের ছেলেকে খুন করিয়েছেন শিশুটির সৎ মা বেবি আক্তার। একাজে তিনি নিজের ১৪ বছর বয়সী ছেলে ইমতিয়াজকে দিয়ে গঠন করিয়েছেন ছেলের বন্ধুদের সমন্বয়ে চার সদস্যের একটি কিশোর কিলিং স্কোয়াড। ২৫ হাজার টাকার চুক্তিতে এই কিশোর কিলিং স্কোয়াড সৎ মা বেবি আক্তারের পরিকল্পনামতে বন্দর থানার ধুমপাড়ার সাগরপাড়ে নিয়ে শিশু সামিরকে শ্বাসরোধ ও ছুরিকাঘাত করে খুন করে মাটির নিচে লাশ পুতে ফেলে। পরে ৭ অক্টোবর পুলিশ শিশু সামিরের লাশ উদ্ধারের পর একে একে গ্রেপ্তার হয় কিলিং স্কোয়াডের দলনেতা ও নিহত সামিরের সৎ ভাই ইমতিয়াজসহ চার সদস্য। একই সময়ে গ্রেপ্তার করা হয় সৎ মা বেবি আক্তারকে। পরে উভয়েই খুনের পরিকল্পনাসহ হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন।
এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘আমাদের সমাজ দিন দিন আধুনিকতার দিকে যাচ্ছে। সম্পর্ক জটিল থেকে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে। সামাজিক ঐতিহ্য পরিবার থেকে সরে যাচ্ছে। নতুন নতুন বিষয় যোগ হচ্ছে। পরস্পরের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা কমছে। এসবসহ বেশ কিছু কারণে পারিবারিক খুনের ঘটনা ঘটছে। এ অবক্ষয় রোধ করতে পারিবারিক বন্ধন বাড়াতে হবে।’
আর মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘মানুষের নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে পরস্পরের প্রতি মমত্ববোধ। পরিবারে একে অপরের মধ্যে যোগাযোগ কমে যাচ্ছে। অনেক সময় বাবা-মা মাদক সেবন করে ঘরে এসে ঝগড়া করছেন। এতে সন্তানদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে যাচ্ছে। এসব কারণে পারিবারিক সহিংসতা বাড়ছে। এসব রোধ করতে পারিবারিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। সামাজিক অনুশাসন মেনে চলতে হবে।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার (সিএমপি) আব্দুল জলিল মন্ডল বলেন, ‘এক সপ্তাহের মধ্যে নগরীতে যে তিনটি খুনের ঘটনা ঘটেছে তাতে পুলিশের কোনো দায় নেই। এগুলো সব ফ্যামেলি ক্রাইম। এরপরও পুলিশ আসামিদের আটক করে বিচারের মুখোমুখি করেছে। এসব খুনের পেছনে রয়েছে পারিবারিক বন্ধন ও মূল্যবোধের অভাব। একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়ায় দায়ী। এসব পারিবারিক হত্যাকাণ্ড কমাতে হলে পরিবার থেকেই সকলকে সচেতন হতে হবে।’
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, ‘পারিবারিক এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনের মূল কারণ হচ্ছে পারিবারিক অস্থিরতা ও নৈতিকতার অভাব। সামাজিক ও পারিবারিক যোগাযোগ আরো বাড়ানো হলে এসব খুনের ঘটনা কমানো সম্ভব। কেউ বড়জনের ওপর হিংসাপরায়ন হয়ে শিশুকে হত্যা করছেন। আবার কেউ মানিসক অবসাদ থেকে মুক্তি পেতে রাগের বশবর্তী হয়ে ভাইকে খুন করছেন, আবার কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ থাকায় অভাবের কারণে মাকে খুন করছেন। এসব থেকে উত্তরণে আইন-শৃংখলা বাহিনীর চেয়ে পরিবারের শাসনই সবচেয়ে জরুরী।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. লিয়াকত আলী বলেন, ‘এ ধরনের প্রতিনিয়ত খুন হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে আমি মনে করি সামাজীকরণের অভাব। যেমন একটা পরিবারে ছেলের সাথে বাবা-মার যে ধরনের সম্পর্ক থাকা দরকার তা না থাকা। যখনই কোনো সন্তানের প্রতি মা-বাবার সু-সম্পর্ক থাকবেনা, তখনই এ ধরণের ঘটনা সাধারণত ঘটে থাকে। এক প্রকার বিরক্ত হয়ে মনের ক্ষোভ থেকে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তাছাড়াও অনেক সময় দারিদ্র অর্থ্যাৎ অভাব অনটনের কারণেও এ ধরনের ঘটনা বৃদ্ধি হতে পারে।’
এ থেকে উত্তোরণের উপায় সম্পর্কে এ সমাজ বিজ্ঞানী বলেন, ‘এটা থেকে উত্তোরণের একমাত্র পথ হল, মা-বাবা ও সন্তানের সু-সম্পর্ক। সাথে সাথে যারা জন প্রতিনিধি আছেন তাদের এ ব্যাপারে সজাগ হওয়া। যেমন পরিবারের অভাব অনটনের মুক্তি দিয়ে শিক্ষার ব্যবস্থা করা।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী নূর হোসেন বলেন, ‘যে পরিবারে সু-সম্পর্ক ছাড়াও সন্তান ও মা-বাবার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আবদার থাকেনা তখন সে পরিবারে এ ধরনের ঘটনা ঘটে। তাছাড়াও বিদেশী অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে আমাদের পরিবারে দিন দিন নৈতিক অবক্ষয় হচ্ছে। এ অপসংস্কৃতির প্রভাবে তা যেমন একদিকে সন্তানের মধ্যে অবক্ষয় হচ্ছে। ঠিক একইভাবে মা-বাবারও নৈতিকবোধ শক্তি লোপ পাচ্ছে। তা থেকে মূলত এ ধরনের অনাকাঙ্কিত ঘটনা ঘটছে।’
উত্তরণের উপায় সম্পর্কে এ মনোবিজ্ঞানী বলেন, ‘প্রত্যেক মা-বাবার উচিত তার সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা। সন্তানের দাবি দাওয়া বুঝতে চেষ্টা করা। তা যদি অনৈতিক দাবিও হয় তবুও তার কথা বুঝার চেষ্টা করা। পারলে সমাধান করে দেওয়া আর না পারলে সুন্দর ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া। তখন এ ধরনের ঘটনা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি।’
এ প্রসঙ্গে নগরীর চান্দগাঁও থানার পূর্ব মোহরা এশা আতুল উলুম মাদ্রাসার নির্বাহি পরিচালক মাওলানা আমানউল্লাহ বলেন, ‘এ ধরণের হত্যাকাণ্ড দেখে আল্লাহর রাসূল বর্ণিত কেয়ামতের আলমতই মনে হচ্ছে। রাসুল (স.) হাদিনে উল্লেখ করেছেন, কেয়ামতে আগে এই ধরণের খুন-খারাবি অপরাধ ব্যাপকহারে বাড়বে। ছেলে মাকে খুন করবে, মা ছেলেকে খুন করবে, ভাই ভাইকে খুন করবে। আবার পরক্ষণে সব কিছু স্বীকার করে কেন এই খুন করেছে সে বিষয়ে কোনো ভালো জবাবও দিতে পারবেনা। এগুলো হচ্ছে কেয়ামতের পূর্ব লক্ষণ।’
উত্তরণের উপায় সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ ধর্মীয় শিক্ষাবিদ বলেন, ‘এসব অপরাধ থেকে উত্তরণের জন্য একমাত্র উপায় হচ্ছে আল্লাহ ও রাসূল প্রদত্ত তার বিধি-বিধান মেনে চলা। ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যে থাকলেই এসব অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে। পরিবারের সদস্যের প্রতি মায়া-মমতা বাড়বে। একে অপরের প্রতি ভ্রাতিত্ববোধ জাগ্রত হবে।’

