অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : আগামী ২৫ অক্টোবরের মধ্যে ধান, চাল, ডাল, সার, চিনি, ভুট্টা ছয়টি পণ্যের মোড়কীকরণে পাটের ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। কিন্তু মূল্য নির্ধারণ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে ঘোষিত সময়ের মধ্যে মাঠ পর্যায়ে পাটের ব্যাগ ব্যবহার নিশ্চিত করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। যদিও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর জন্য আবেদনের চিন্তা-ভাবনা করছে।
এদিকে, পাটের ব্যাগের দাম নির্ধারণ নিয়ে সৃষ্ট জটিলতা কাটাতে উদ্যোগী হয়েছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ‘দি ফেডারেশন অব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি’ (এফবিসিসিআই)। সংগঠনটি ব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীদের দেয়া দাম নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছে। একই বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গেও আলোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠনটি।
চাতাল মালিকদের দাবি, পলিথিন ব্যাগের বদলে পাটের ব্যাগ ব্যবহারের ফলে এমনিতেই আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। আর যদি বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের নির্ধারিত মূল্যেই পাটের ব্যাগ কিনতে হয় তাহলে ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে। তখন চাল, ডাল, চিনিসহ ভোগ্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে।
জানা গেছে, পাটের ব্যাগ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) ও বাংলাদেশ জুট মিলস অ্যাসোসিয়েশনস (বিজেএমএ) ৩৭ ইঞ্চি/সাড়ে ২২ ইঞ্চি সাইজের চিকন পাটের লেমিনেশনসহ ৫০ কেজি ওজনের (ওজন ৩৭৫ গ্রাম) পাটের ব্যাগের দাম হাকিয়েছে ৮৪ টাকা। কিন্তু ব্যাগের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারী চাতাল মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হেস্কিং মিলস অ্যাসোসিয়েশন এ সাইজের ব্যাগের দাম বলেছে ৫০ টাকা। এছাড়া, একই সাইজের লেমিনেশন ছাড়া মোটা জাতীয় (ওজন ৭০০ গ্রাম) ব্যাগের দাম হাকিয়েছে ৮৫ টাকা কিন্তু চাতাল মালিকরা এর দাম বলেনি। আর এ নিয়েই দুটি সংগঠনের মধ্যে চলছে টানাটানি।
বাংলাদেশ জুল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি এ বারেক খান জানান, দেশের বাজারে প্রতি মণ পাটের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। একই সঙ্গে পাটের ব্যাগ উৎপাদনে শ্রমিকদের খরচ, বিদ্যুৎ গ্যাসের দাম, ব্যাংক ইন্টারেস্ট বেড়েছে। এতে পাটের ব্যাগের দাম কমানো হলে কৃষকরা লোকসানে পড়ার সম্ভাবনা আছে।
তিনি আরো বলেন, ‘সঠিক দাম পেলে আমরা চাহিদা মতোই পাটের ব্যাগ সরবরাহ করতে সক্ষম।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হেস্কি মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আবদুর রশিদ বলেন, ‘প্রতি বছর আমাদের প্রায় ৩০ কোটি ব্যাগের চাহিদা আছে। পরিবেশের কথা চিন্তা করে আমরাও পাটের ব্যাগ ব্যবহারে আগ্রহী। কিন্তু বেশি দামের কারণে এটা সম্ভব হচ্ছে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহারের ফলে আমাদের খরচ পড়ে ১৮ থেকে ২২ টাকা। আর আমরা পাটের ব্যাগের দাম দিতে চাচ্ছি ৫০ টাকা। এতেই আমাদের উৎপাদন খরচ ৫০ কেজিতে ২৮ টাকা বেড়ে যাবে। এরপরও যদি আরো বেশি দামে ব্যাগ কিনতে হয় তাহলে এর প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপর।’
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষকে আগামী ৩ দিনের মধ্য ব্যাগের বাৎসরিক চাহিদা ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সরবরাহের সক্ষমতা জানাতে বলেছে এফবিসিসিআই। এরপরেই দর নির্ধারণ নিয়ে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নামবে সংগঠনটি।
এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, ‘এখন ব্যবসায়ীদের মোড়কীকরণে খরচ পড়ছে ১৮ টাকা থেকে ২২ টাকা। কিন্তু পাটকল করপোরেশন প্রতিটি ব্যাগের দাম চেয়েছে ৮৪ টাকা থেকে ৮৫ টাকা। যা বর্তমান মোড়কীকরণের চেয়ে ৪ থেকে ৫ গুণ বেড়ে যাচ্ছে। তারা বলছে, তাদের কস্টিং পড়ছে ২২ টাকা। তাদের বিষয়টিও আমাদের দেখতে হবে। তাই আমি চিন্তা করলাম বর্তমানে অর্ধেকের চেয়ে বেশি কারখানা বন্ধ আছে। যদি তারা লেমিনেশনসহ অন্যান্য মোট খরচ ২৪ টাকা কমিয়ে দেয়, তাহলে দাম নেমে আসে ৬০ টাকায়। আর ব্যবসায়ীরা যদি প্রতিটি ব্যাগ ৫০ টাকায় ক্রয় করে তাহলে মাত্র ১০ টাকা সরকার ভর্তুকি দিলেই হয়ে যাবে। তাতে বেশি দিন ভর্তুকি দিতে হবে না। সর্বোচ্চ ৬ মাস ভর্তুকি দিলেই চলবে।’
এতে এক দিকে দেশের বেশির ভাগ বন্ধ পাটকল খুলে যাবে। অপরদিকে পাটের ব্যাগের ব্যবহার নিশ্চিত হবে বলে মনে করেন তিনি।

