চবি প্রতিনিধি : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষ, ছাত্রলীগ-ছাত্রলীগ সংঘর্ষ ও সংঘর্ষের পর আবাসিক হল ও কটেজগুলোতে লুটপাত ছিল এতোদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম ইস্যু। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আরেকটি ইস্যু হিসেবে যুক্ত হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত চুরি।
প্রতিদিন রাত পার হয়ে সকাল হলেই কারো না কারো রুম থেকে ল্যাপটপ, মোবাইল ও মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আর এসব চুরির ঘটনা স্থানীয় বহিরাগতদের উৎপাতের কারণেই ঘটছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের ।
এদিকে প্রায় প্রতিদিন এ ধরনের চুরির ঘটনা ঘটলেও, এটি নির্মূলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা দপ্তরের কর্তা ব্যক্তিরা কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে বেড়েই চলেছে এসব চুরির ঘটনা। এতেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্ট মহল।
গত ২০ আগস্ট রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এ এফ রহমান হলের একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মো. হাবিবুল্লাহ মাসুমের ১৩৯ নম্বর কক্ষের জানালার কাঁচ ভেঙ্গে ও রড় কেটে চোর প্রবেশ করে মোবাইল, লাগেজ, হাতঘড়ি, কাপড় ও মানিব্যাগ নিয়ে যায় ।
কয়েকদিন না যেতেই ওই মাসেই শাহজালাল হলের বেশ কয়েকটি রুম থেকে ল্যাপটপ ও মোবাইল চুরি হওয়ার খবর পাওয়া যায় । কয়েকদিন পর পর চুরির ঘটনা ঘটায় শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওই সময় প্রভোস্টের রুমও ভাঙচুর করে।
চলতি মাসের ১২ সেপ্টেম্বর রাতে শাহজালাল হলের বেশ কয়েকটি রুম থেকে ১০-১২টি মোবাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র চুরি হওয়ার অভিযোগ উঠে । চুরির ঘটনার জের ধরে ১৩ সেপ্টেম্বর ছাত্রলীগের এক পক্ষ হলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে তালা পর্যন্ত লাগিয়ে দেয়। ওই ঘটনায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টির জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সভাপতি আলমগীর টিপু ও সাধারন সম্পাদক ফজলে রাব্বি সুজন ছাত্রলীগের ৬ কর্মীকে সকল প্রকার রাজিনৈতিক কর্মকান্ড থেকে ২৩ দিনের জন্য অব্যাহতিও দেয় ।
এর কয়েকদিন পর ১৮ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ক্যান্টিন থেকে দোকানের জানালা ভেঙ্গে ফ্রিজ থেকে ১৫০টি মুরগী, ১০০টি রুই মাছ, ৩০০টি ডিম, ক্যান্টিনের প্রয়োজনীয় হাড়িপাতিল সহ ২০ হাজার টাকা মূল্যের জিনিস চুরি করে নিয়ে যায়।
সর্বশেষ ২১ সেপ্টেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রীতিলতা হলের শিক্ষক ডরমেটরি থেকে প্রভাষক রুনা সাহার রুম থেকে ল্যাপ্টপ চুরির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষকে অভিযোগও দেন ভুক্তভোগী এই শিক্ষক ।
বর্তমানে এ ধরনের চুরির ঘটনা ক্যাম্পাসে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এসব চুরির পেছনে স্থানীয় বহিরাগতরা জড়িত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সন্ধ্যা হতে না হতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ছাত্রী হল, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, দক্ষিণ ক্যাম্পাস, ফরেস্ট্রি লেক, কলা অনুষদ ঝুপড়ি, শহীদ মিনার এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বসে বহিরাগতদের আড্ডা। এদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের অনেক নেতাকর্মী । এই আড্ডা চলে অনেক রাত পর্যন্ত ।
বহিরাগতদের মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্রের ছত্রাছায়ায় থাকার কারণে দিব্যি প্রবেশ করছে এসব যানবাহন। এদের অনেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্পট, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেল গেইট থেকে মাদকদ্রব্য কিনতে আসেন বলেও একটি সূত্র জানিয়েছে । এ নিয়ে গত কয়েক মাসে ছোট-বড় মিলে ২০ টিরও বেশি চুরির ঘটনা ঘটেছে ক্যাম্পাসে ।
চবির অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক রুনা সাহা বলেন, ‘ঈদ আসলেই প্রতিবছর চুরি-ছিনতাইয়ের এমন অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কর্মীদের অবহেলার কারনেই নিয়মিত চুরির ঘটনা ঘটছে। তা না হলে কিভাবে জানালার গ্লাস ভেঙে মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে যায়।’
এছাড়া তিনি চুরি হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে মনে করছেন স্থানীয় বহিরাগতদের প্রবেশকেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মাসুম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মতন এমন একটি প্রতিষ্ঠানে যতোটুকু নিরাপত্তা থাকা দরকার তা এখানে নেই। নিরাপত্তা না থাকার কারণেই নিয়মিত চুরির ঘটনা ঘটছে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ক্যান্টিন মালিক মো. অলী উল্লাহ বলেন, ‘এ মাসের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যান্টিন থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকার জিনিসপত্র জানালা ভেঙে চোরের দল নিয়ে যায় । এর আগেও আরো দু’বার এমন চুরির ঘটনা ঘটেছে । কিন্তু আইন বিভাগের ডিনসহ নিরাপত্তা দপ্তরের কাছে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোন কাজ হয়নি।’
এ বিষয়ে নিরাপত্তা দপ্তরের প্রধান মো. বজল হককে (ভারপ্রাপ্ত) বলেন, ‘আমরা সব সময় এ বিষয়ে সর্তক থাকি। কিন্তু তারপরও কয়েকটি ঘটনা দুঃখজনক। নিরাপত্তা প্রহরীদের এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে বলা হয়েছে । আশাকরি সামনে থেকে এ ধরনের কোনো ঘটনা আর হবেনা।’
এদিকে নিরাপত্তা দপ্তরের কাছে এ ধরনের কোনো অভিযোগ দেওয়া হয়নি বলে অস্বীকার করে নিরাপত্তা দপ্তরের আরেকজন কর্মকর্তা সেকশন অফিসার মো. আজম খান বলেন, ‘আমাদেরকে কেউ চুরির ও লুটের ঘটনায় আগে কেউ অভিযোগ দেয়নি। চুরির ঘটনার বিষয়েও জানি না।’
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আবুল কালাম বলেন, ‘আমরা ক্যাম্পাসে চুরি ও মাদকদ্রব্যের ব্যবহার ঠেকাতে তৎপর রয়েছি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি চুরির ঘটনা দুঃখজনক।’

