আন্তর্জাতিক ডেস্ক : থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে ভারতের গুজরাটে। কারফিউ জারি হয়েছে। টহলে সেনারা। বিশৃঙ্খলা দেখলেই চলবে গুলি।
হঠাৎ করে অগ্নিমূর্তি হয়ে উঠল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজ্য গুজরাট। কিন্তু কেন? ভারতের গণমাধ্যম বলছে, প্যাটেল সম্প্রদায়ের লোকেরা চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে কোটা সুবিধা চাইছে। এ জন্য তারা রাজপথে নেমেছে।
প্রশ্ন হলো- এই যে প্যাটেলরা রাজপথে নামল, কার ডাকে। কে তাদের সংগঠিত করেছেন? অর্থের জোগান এল কীভাবে? হঠাৎ করেই কি কোনো আন্দোলন লাখো মানুষের সমর্থন পায়, তাও আবার একটি অঞ্চলে?
গুজরাটে প্যাটেল বিক্ষোভের নেতা হার্ডিক প্যাটেল মাত্র ২২ বছর বয়সি এক তরুণ। এনডিটিভি বলছে, তার বয়স ২১ বছর। বিবিসির সঙ্গে কথা বলার সময় হার্ডিক জানিয়েছেন, তার বাড়ি আহমেদাবাদের অদূরে একটি ছোট শহরে। বাণিজ্যে স্নাতক পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। ছোটখাটো ব্যবসা করেন। বাবা-মা ও বোনকে নিয়ে একসঙ্গে নিজেদের বাড়িতে থাকেন। কোনো প্রকার আন্দোলন বা বিক্ষোভের সঙ্গে কাজ করার দীর্ঘ ইতিহাস নেই তার। থাকার কথাও নয়। কারণ, তার বয়স মাত্র ২১ বছর। এ বয়স আমাদের প্রাণপ্রিয় কবি সুকান্তের বয়সের সমান। অধিকার আদায়ের শাণিত দাবি যার কবিতায় আজও জ্বলজ্বল করছে।
হার্ডিক প্যাটেলকে আমি মোটেও সুকান্তের আদর্শের সঙ্গে মেলাতে চাই না। সুকান্ত মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন। কিন্তু হার্ডিক বলছেন একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের কথা, প্যাটেলদের প্রতি সরকারি বঞ্চনার কথা। দুজনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও আলাদা। কিন্তু বয়সের দিক থেকে, তরুণ্যের দিক থেকে হার্ডিক ও সুকান্তের একটি মিল তো অবশ্যই খুঁজে পাওয়া যায়। এত অল্প বয়সে তারা মানুষকে জাগাতে পেরেছেন। কিন্তু সুকান্ত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে উত্তীর্ণ এক বিবেকের নাম। হার্ডিক এখনো অপরীক্ষিত, কাঁচা।
তিন দিনের আন্দোলনে হার্ডিক হয়ে উঠেছেন ‘প্যাটেলদের মুখ’। প্যাটেল সম্প্রদায় যেন তার মুখেই কথা বলছে। তার ভাষাই ব্যবহার করছে। তার ইশারায় উঠছে-বসছে। তা না হলে সুরাটের সমাবেশে ১০ লাখ লোক কোথা থেকে এল? অবশ্য সুরাট পুলিশের দাবি, জনসভায় ৩ লাখ লোক ছিল। হোক সে ১০ বা ৩ লাখ, এক সাধারণ যুবকের ডাকে লাখ লাখ মানুষ হাজির হলো- এ মোটেও হেলাফেলা নয়।
নেতা, নেতৃত্ব ও আন্দোলনের যে সংজ্ঞা আমরা জানি, হার্ডিক প্যাটেল যেন তা পাল্টে নতুন এক মডেলের জন্ম দিলেন। এখন সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের কাছে ‘প্যাটেল বিস্ময়’ হয়ে রইলেন তিনি। কারণ, দুই মাস আগেও ভারতের গণমাধ্যমে হার্ডিক প্যাটেল নামটি শোনা যায়নি। এখন তিনি খবরের শিরোমণি। ছোটখাটো, শ্যামল বর্ণের অনাকর্ষণীয় দৈহিক গড়নের মানুষ হার্ডিকের হুংকারে কাঁপছে গুজরাট। মঙ্গল থেকে বুধবার- এই দুই দিনে ঝরে গেছে আটটি প্রাণ।
প্যাটেল বা পতিদর। হিন্দুধর্মাবলম্বী একটি বর্ণ। হীরকা কাঁটা ও হীরক ব্যবহারোপযোগী করার প্রক্রিয়ায় জড়িত প্যাটেলরা। এ ছাড়া গুজরাটের গ্রামাঞ্চলে বড় বড় ভূস্বামীও প্যাটেলরা। বিশাল বিশাল খামারের মালিক এই প্যাটেল বর্ণের লোকেরা গুজরাটে কৃষিবিপ্লব ঘটিয়েছে। এই রাজ্যের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্যাটেলদের শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীও একজন প্যাটেল, আনন্দিবেন প্যাটেল। প্রধানমন্ত্রী মোদির বিশ্বাসভাজন আনন্দিবেন। যে কারণে গুজরাটের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার সিংহাসন ছেড়ে দেন আনন্দিবেনের হাতে।
আনন্দিবেন মুখ্যমন্ত্রীর হওয়ার পর গুজরাটে প্যাটেল সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে। কিন্তু সেই স্বস্তি সাময়িক প্রভাব রাখতে সক্ষম হয়। গুজরাটের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ ভাগ অর্থাৎ ১ কোটি ৮০ লাখ লোক প্যাটেল সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। হার্ডিক প্যাটেলের দাবি, অন্তজ শ্রেণির মানুষদের অর্থাৎ নিম্নবর্ণ ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও চাকরিক্ষেত্রে কোটা সংরক্ষণ করায় প্যাটেলরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যোগ্যতা থাকতেও তারা চাকরি পাচ্ছে না। অথচ কোটাসুবিধার কারণে অযোগ্যরা চাকরি পাচ্ছে, উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে। যদি কোটাব্যবস্থা বহাল রাখা হয়, তবে জনসংখ্যার বিচারে প্যাটেলরাও কোটা পাবে। প্যাটেলদের ১০ ভাগ লোকও ধনী নয়। গ্রামাঞ্চলে অনেকে না খেয়ে থাকছে। কিন্তু তারা চাকরি পাওয়ার যোগ্য। শুধু কোটার কারণেই তারা বেকার।
হার্ডিক প্যাটেলের এই দাবিগুলো থেকে স্পষ্ট, তিনি কথা বলছেন শুধু প্যাটেলদের কোটাসুবিধা দেওয়ার জন্য। কিন্তু প্যাটেলরা গুজরাটে সামাজিকভাবে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় মঙ্গলবারের সমাবেশ থেকে। সরকারি সমর্থন এবং অর্থের জোগান না থাকলে এত বড় গণজমায়েত করা সম্ভব হতো কি? আমি মনে করি, না। সরকারের বিভিন্ন স্তরে প্যাটেলরা প্রভাবশালী ভূমিকায় রয়েছে। যে কারণে হার্ডিকের মতো তরুণ এক নেতার ডাকে লাখো মানুষ পথে নেমে পড়েছে।
নাগরিক আন্দোলনের যে বৈশিষ্ট্য, তা প্যাটেল বিক্ষোভে অনুপস্থিত বলা যায়। যেখানে সবার কথা বলা হয় না, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি-পেশার মানুষের কথা বলা হয়, তাও আন্দোলন, তবে তা নাগরিক আন্দোলন নয়। এটি একটি সাম্প্রদায়িক আন্দোলন। যা শেষমেশ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্ম দিতেও পারে। যে কারণে হার্ডিক প্যাটেল সম্প্রদায়ের নেতা হয়ে উঠতে পেরেছেন কিন্তু সমাজের নেতা নন তিনি। ফলে এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়বে বলে আমার বিশ্বাস।
সরকারের পক্ষ থেকে কিছু সুযোগ-সুবিধার আশ্বাস এলেই বিক্ষোভ থেমে যাবে। আন্দোলন রূপ নেবে আনন্দে। কিন্তু তাতে ভারতের সমাজব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না। উল্টো রাজ্যে রাজ্যে সম্প্রদায়ভিত্তিক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হ্যাঁ, প্যাটেলরা যদি বঞ্চিত হয়ে থাকে, তাদের দাবি যদি ন্যায্য হয়, তবে সরকারকে তাদের কথা শুনতে হবে। কিন্তু প্যাটেলরা পিছিয়ে সংখ্যালঘুদের কোটাসুবিধার বিরুদ্ধে দাঁড়ালে, সে বিষয়ে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে। তা না হলে সামগ্রিক জীবনমানের উন্নয়ন থেমে যাবে।
হার্ডিক প্যাটেল বলেছেন, ‘আমি মহাত্মা গান্ধী ও সরদার বল্লবভাই প্যাটেলের অনুসারী। বেশি পছন্দ বল্লবভাইকে।’ কিন্তু এই দুই মহামনীষী সবার জন্য আজীবন লড়েছেন। কোনো নির্দিষ্ট বর্ণ বা শ্রেণির জন্য নয়। আবার হার্ডিককে অনেকে প্রধানমন্ত্রী মোদির মতো ‘ম্যাজিক নেতা’ বলছেন। আসলেই কি তাই? হয়তো শিগগরিই আমরা হার্ডিকের ভবিষ্যৎযাত্র কোন পথে এগোচ্ছে, তা দেখতে পাব।

