নিজস্ব প্রতিবেদক : স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব (হাসপাতাল-২) আব্দুল মালেক এখন অবসরে। তবে চাকরির শেষ দিকে এসে ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি হাসপাতালগুলোর কিছু অসাধু ডাক্তারদের সহযোগিতায় কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তিনি।
ইতিমধ্যে দুই সরকারি হাসপাতাল থেকে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে তার বিরুদ্ধে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানে প্রতারণার মাধ্যমে এই বিপুল টাকা আত্মসাতের বিষয় প্রমাণিত হয়েছে। আত্মসাতে সেই উপ-সচিব ও হাসপাতালের অধ্যক্ষসহ উচ্চপর্যায়ের মোট ১৮ কর্মকর্তার যোগসাজসও প্রমাণিত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে দুদক।
সম্প্রতি সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেনাকাটায় অনিয়ম অনুসন্ধানে এই আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া যায়। তাদের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলার অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা হবে বলে জানায় দুদক সূত্র।
উপ-সচিব (হাসপাতাল-২) আব্দুল মালেকসহ তিন মামলার মধ্যে এক ও দুই মামলা আসামিরা হলেন- সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক অধ্যক্ষ ও পরিচালক ডা. এসজেড আতিক, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) ডা. মো. রুহুল কুদ্দুস, একই হাসাপাতেল জুনিয়র কনসালট্যান্ট (ইএনটি) ডা. নারায়ণ প্রসাদ সান্যাল, সিনিয়র কনসালট্যান্ট (অর্থো সার্জারি) ডা. একেএম জাহাঙ্গীর আলম, আবাসিক মেডিলকেল অফিসার ডা. এসএমএম মারুফ হাসান, জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী) ডা. মোছা. রহিমা খাতুন, সেবা অফিসার মো. ওয়াহিদুজ্জামান, সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসের সিনিয়র স্বাস্থ্য শিক্ষা অফিসার একেএম সোহরাব হোসেন, গণপূর্ত বিভাগ-১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হারুন অর রশীদ, নয়াপল্টনে অবস্থিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মার্কেন্টাইল ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের মালিক মো. আব্দুস সাত্তার, মহাখালীর ট্রেনিং ইঞ্জিনিয়ার নিমিউ এর অ্যাসিস্ট্যান্ট রিপায়ার মো. হাবিবুর রহমান এবং সেগুনবাগিচার তোপখানা রোডে অবস্থিত বেঙ্গল সায়েন্টেফিক অ্যান্ড সার্জিক্যাল কোংয়ের মালিক মো. জাহের উদ্দিন।
ওই উপ-সচিবসহ তিন নম্বর মামলায় অনুমোদিত আসামিরা হলেন- দিনাজপুর মেডিকেল কলেজের হাসপাতালের দুই সাবেক পরিচালক ডা. আবু বকর সিদ্দিক, ডা. এবিএম ইকবাল হোসেন, উপ-পরিচালক ডা. সিদ্দিকুর রহমান এবং ব্লেয়ার অ্যাভিয়েশন নামের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মালিক মোকছেদুল ইসলাম।
দুদক সূত্র জানায়, কমিশনের অনুমোদিত মামলায় আসামিরা এই দুই হাসপাতালে বাজার দরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দরে ভারী যন্ত্রপাতি ও মেশিন সরবারহ করে এবং যন্ত্রপাতি মেরামতের নাম করে ১৪ কোটি ৪৭ লাখ ১০ হাজার ২৭২ টাকা আত্মসাৎ করেন। এর মধ্যে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭৫ লাখ ১২ হাজার ৭৫০ টাকা এবং বাকি টাকাগুলো আত্মসাৎ করা হয় সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, সাতক্ষীরা হাসপাতালের উচ্চপর্যায়ের ওই কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ২০১৩ সালের ১ জুলাই এক কার্যাদেশে ৩৩টি আইটেমের মেশিন বা যন্ত্রাংশ সরবরাহের সিদ্ধান্ত হয়। কার্যাদেশ নং ২০১৩/১১৫৮ এবং এমসিএম/সাত/২০১৩/১১৫৯। এই দুই কার্যাদেশ মোতাবেক বাজারের দরের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দরে ভারী যন্ত্রপাতি ও মেশিন সরবারহ করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো। যেমন- ৫ লাখ ৫ হাজার টাকা মূল্যের ব্লাড গ্যাস সরবরাহ করা হয় ৩৫ লাখ ২৫ হাজার টাকায়। আবার ২৫ হাজার টাকা মূল্যের আলট্রাসেনট্রিফিউজ মেশিন কেনা হয়েছিল ৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায়।
সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসব উচ্চমূল্যে যন্ত্রপাতি সরবরাহের সহযোগিতায় ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপ-সচিব আব্দুল মালেক। তার সহযোগিতায় বিল গ্রহণের ব্যয় মঞ্জুরি এনে ভ্যাট ও ট্যাক্স ৯ শতাংশ বাদ দিয়ে বিল নং ১, ৩ ও ৫ এর বিপরীতে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত পৃথকভাবে ৬ কোটি ১৯লাখ ৭৬ হাজার ২৩ টাকা এবং ৭ কোটি ৫১ লাখ ২১ হাজার ৪৯৯ টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
আর এসব যন্ত্রপাতি সরবরাহের দরপত্র কমিটির সভাপতি ছিলেন অধ্যক্ষ ও পরিচালক ডা. এসজেড আতিক। আর বাকি কর্মকর্তারা ছিলেন সেই কমিটির সদস্য। তারা উপ-সচিবের সহযোগিতায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে বাজার দর যাচাই না করেই অধিক মূল্যে কার্যাদেশ দেয়ার জন্য দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির ২০১৩ সালের ১৩ জুন তারিখের সভায় সপুারিশ করেন। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি তাদের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে দরপত্র অনুমোদন দেয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় পরস্পর যোগসাজসে তারা এসব টাকা আত্মসাৎ করে বলে দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়।
দুদক সূত্র আরো জানায়, দিনাজপুরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটির আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, এক্স-রে, অ্যানেসথেশিয়ানসহ বিভিন্ন মেশিন ও যন্ত্রপাতি মেরামতের জন্য টেন্ডার ডাকা হয়। ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে এই টেন্ডারের জন্য ৭৫ কোটি ১২ হাজার ৭৫০ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়। তবে এই টেন্ডার কোনো পত্রিকায় না দিয়ে গোপনে উপ-সচিব আব্দুল মালেকের পছন্দের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ব্লেয়ার অ্যাভিয়েশনকে কাজ দেয়া হয়। এরপর হাসপাতালের ওই সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটির যোগসাজসে কোনো মেরামত কাজ না করে টেন্ডারে বরাদ্দকৃত সমুদয় টাকা আত্মসাৎ করেন। এখানেও আব্দুল মালেকের পূর্ণ প্রতাণার মাধ্যমে এই আত্মসাৎ প্রক্রিয়া করা হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আমিরুল ইসলামের অনুসন্ধানে ওই তিন হাসপাতালের টাকা আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হয়। তাই এসব জালিয়াতিতে জড়িত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন জমা দেন। সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই শেষে তাদের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দেয় কমিশন। ইতিমেধ্য মামলা অনুমোদন আদেশের কপি অনুসন্ধানী কর্মকর্তা মো. আমিরুল ইসলামের কাছে পৌঁছেছে। তাই তিনি তাদের বিরুদ্ধে এই সপ্তাহের মধ্যেই মামলা করবেন।’

