ময়মনসিংহ প্রতিনিধি : শিক্ষার্থী আছে, নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক। রয়েছে শ্রেণীকক্ষ সঙ্কট ও একাডেমিক ভবন সমস্যা। ছাত্রাবাস দুইটির ভবনও জরাজীর্ণ, নেই কোনো ছাত্রীবাস, শিক্ষকদের থাকার জন্য নেই ডরমেটরি ভবন। সীমানা প্রাচীর ভেঙে পড়ছে, অরক্ষিত জায়গাও হয়ে যাচ্ছে বেদখল। এছাড়াও রয়েছে আরো নানাবিধ সমস্যা।
এ চিত্রটি ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী গৌরীপুর সরকারি কলেজের।
স্থানীয় ও কলেজে সূত্রে জানা গেছে, ১৯৬৪ সালের ১লা আগষ্ঠ গৌরীপুর পৌর শহরের কৃষ্ণপুর এলাকায় জমিদার সুরেন্দ্র প্রসাদ লাহিড়ীর বাড়িতে ২২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় গৌরীপুর কলেজ। ১৯৯১ সালের ২৫শে এপ্রিল কলেজটি সরকারিকরণ হয়। ২০১১/১২ শিক্ষাবর্ষে কলেজেটিত সম্মাণ কোর্সের প্রর্বতন করা হয়।
এ কলেজে বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সমাজকর্ম, মনোবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান ও ব্যাবস্থাপনা এ ৬টি বিষয়ের সম্মান কোর্স চালু আছে। নিয়ম অনুযায়ী সম্মান শ্রেণীর প্রতিটি বিভাগে সাতজন করে শিক্ষক থাকার কথা। কিন্তু সম্মান কোর্স চালুর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো বিভাগেই ৭ জন করে শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা হয়নি। এছাড়াও রয়েছে একাডেমিক ভবন সঙ্কট।
বর্তমানে কলেজে উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও সম্মান শ্রেণীর সর্বমোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫ হাজার ৪শ ৮০ জন। কলেজের পাঠদান রুটিন অনুযায়ী প্রতি কর্মদিবসে উচ্চ মাধ্যমিক একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীর মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসা শিক্ষা শাখায় ৪১টি ক্লাস, স্নাতক ১ম, ২য় ও ৩য় বর্ষতে ২০টি ও সম্মান ৬টি বিভাগের ১ম, ২য় ও ৩য় বর্ষের ২৪টি পাঠদান ক্লাস রয়েছে। কিন্তু এই ক্লাস করানোর জন্য কলেজের নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শ্রেণীকক্ষ।
এছাড়া অধ্যক্ষ, উপাধাক্ষ্যসহ ৪২ জন শিক্ষকের মধ্যে কর্মরত আছে মাত্র ৩২ জন। আর পাঠদান শ্রেণীকক্ষের সংখ্যা মাত্র ২৯টি। এরমধ্যে আবার বৃষ্টি হলে কয়েকটি শ্রেণীকক্ষের টিনের চালের ফুটো দিয়ে পানি পড়ে। ফলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদেরকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয় এলাকাবাসী, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে এখানে ছেলেমেয়েরা পড়তে আসেন। যারা উপজেলা শহরের বাইরে গিয়ে পড়তে পারেন না তাদের কাছে এই প্রতিষ্ঠানই উচ্চশিক্ষার একমাত্র ভরসা। কিন্তু বর্তমানে কলেজটি শিক্ষক, শ্রেণীকক্ষ সঙ্কটসহ বিভিন্ন কারণে পাঠদান ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
অভিযোগ আছে, কয়েকজন শিক্ষক নিয়মিত কলেজে আসেন না। এবং সপ্তাহের প্রায় দিনই দুপুরের পর কলেজে কোনো ক্লাস অনুষ্ঠিত হয় না।
এ ব্যাপারে কলেজের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানায়, শিক্ষকদের বিষয়টি নিয়ে আমরা অনেক শক্ত অবস্থানে আছি। এবং কয়েকজন শিক্ষককে এ ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে। দুপুরের পর ক্লাস না হওয়া প্রসঙ্গে জানান, যদিও আমাদের শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। তবে ক্লাস না হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় কারণ হলো শিক্ষার্থীদের অনীহা। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই দুপুরের পর কলেজে ক্যাম্পাস ছেড়ে বাইরে-বা বাড়িতে চলে যায়।
সরজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত কলেজটির সম্পূর্ণ জায়গা সীমানা প্রাচীর দিয়ে ঘেরা নয়। বেশিরভাগ জায়গা অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কলেজের ক্যাম্পাসের কিছু অংশে সীমানাপ্রাচীর থাকলেও সংস্কারের অভাবে কয়েকটি জায়গায় ভেঙে পড়ে বড় সুরঙ্গ সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে আবাসন সমস্যা। কলেজের অধ্যক্ষের থাকার জন্য নেই বাসভবন, শিক্ষকদের থাকার জন্য নেই ডরমেটরি ভবন। মেয়ে শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য নেই কোনো ছাত্রীবাস। ছেলে শিক্ষার্থীদের জন্য এস আলী ও মজীদ আলী নামে দুইটি ছাত্রাবাস থাকলেও সিট সংখ্যা মাত্র ৫২টি।
গৌরীপুর সরকারি কলেজের রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. ফজলুল হক বলেন, ‘ডরমেটরি ভবন না থাকার কারণে শিক্ষকদের এখানে থাকতে কষ্ট হয়। বিশেষ করে ব্যাচেলর শিক্ষকদের বাসা ভাড়া পেতে অনেক বেগ পোহাতে হয়।’
গৌরীপুর সরকারি কলেজের উপাধাক্ষ্য শেখ হাবিবুর রহমান বলেন, ‘কলেজটির বেশিরভাগ জায়গা অরক্ষিত থাকার কারণে পুরাতন জেলখানার মোড় ও এস আলী ছাত্রবাসের পেছনের কিছু জায়গা স্থানীয়দের দখলে চলে গেছে। এবং আরো কিছু জায়গা স্থানীয়রা দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিষয়টি আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেছি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেননি।’
গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দূর-রে শাহওয়াজ বলেন, ‘জায়গা বেদখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগটি কিছুদিন আগে কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাকে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন। তবে লিখিত কোনো অভিযোগ দেননি। লিখিত আকারে অভিযোগ জানালে আমরা জায়গা উদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করবো।’
গৌরীপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ আল হেলাল ভুঁঞা কলেজের নানাবিধ সমস্যার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘৩টি একাডেমিক ভবন, ১টি ছাত্রাবাস, ১টি ছাত্রীবাস, অধ্যক্ষের বাসভবন, নারী ও পুরুষ শিক্ষকদের পৃথক ২টি ডরমেটরি ভবন ও কলেজের সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের প্রস্তাব সাবেক স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. ক্যাপ্টেন (অব) মজিবুর রহমান ফকির এমপি মহোদয়ের ডিও লেটারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠানো হয়েছে। এবং শিক্ষক সঙ্কটের বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়ছে। তবে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেননি।

