অর্থনৈতিক প্রতিবেদক : বৃষ্টি ও বৈরী আবহাওয়ার প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। বিশেষ করে কাঁচা বাজারে প্রভাব পড়ছে বেশি। অতি বৃষ্টির কারণে পরিবহণ ব্যয় কিছুটা বেড়েছে। আর এ অজুহাতকে কাজে লাগিয়ে কারণ ছাড়াই বিক্রেতারা বাড়াচ্ছে পণ্যের দাম। গত কয়েকদিনে লাগামহীনভাবে বেড়েছে সকল ধরনের সবজির দাম। তবে কোনো কারণ ছাড়াই অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে ডিমের দাম।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে আমদানি কম, পরিবহণ খরচ বেশি। এই অবস্থা থাকলে আগামীতে নিত্যপণ্যের দাম আরো বাড়তে পারে। আর সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, মিথ্যা অজুহাতে দাম বাড়িয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন।
শুক্রবার ছুটির দিনে রাজধানীর কারওরান বাজার ও কমলাপুর কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বাজারে পেঁয়াজ ৬৫ টাকা, পটল ৬০ টাকা, করলা ৬০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১২০ টাকা এবং বেগুন ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অথচ ঢাকার বাইরে স্থানীয় বাজারে এসব কাঁচাপণ্যের দাম অর্ধেকের চেয়ে কম।
আর বয়লার মুরগীর ডিম বিক্রি হচ্ছে হালি প্রতি ৪০-৪২ টাকা। দেশি মুরগির ডিম ৫০-৫২ আর হাঁসের ডিমের হালি ৪৫-৪৮ টাকা।
কাঁচাবাজারে দামের বিষয়ে বৈরী আবহাওয়াকেই দুষছেন ব্যবসায়ীরা। কারওরান বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী আবদুল জলিল জানান, বৃষ্টির কারণে কাঁচাপণ্যের সরবরাহ কমে গেছে। ফলে বেশি দাম দিয়ে পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পণ্য কিনে বিক্রি করতে হচ্ছে।
এভাবে বৃষ্টি আরো কয়েকদিন চলতে থাকলে সবজির দাম আরও বাড়তে পারে বলেও আশংকা প্রকাশ করেন এ ব্যবসায়ী।
অপর এক পাইকারি ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম জানান, বৃষ্টির কারণে অনেক সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষকরা আগে মোকামে ৫ থেকে ৭ মণ করে সবজি ওঠাতেন। এখন তারা দেড় থেকে ২ মণের বেশি সবজি মোকামে তুলতে পারছেন না। ফলে তাদের কাছ থেকে আমাদের বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। তিনি বলেন, তাছাড়া বৃষ্টির কারণে আমাদের পরিবহণ খরচও বেশি গুণতে হচ্ছে।
তবে সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ ব্যবসায়ীরা ইচ্ছে করেই সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ায়। ছুটির দিনে সপ্তাহের বাজার করতে কমলাপুর বাজারে আসা ব্যাংকার সৈয়দ বজলুল আমীন বলেন, কোনো কারণ ছাড়াই ব্যবসায়ীরা সবজির দাম বাড়িয়েছে। রাজধানীর সঙ্গে অন্যান্য জেলার সবজির দামে খুব বেশি পার্থক্য থাকার কথা নয়।
তিনি বলেন, গত সপ্তাহের রোববার আমি দেশের বাড়ি থেকে (কুমিল্লা) ঘুরে এসেছি। ওখানকার বাজারে সবজির দামের সঙ্গে ঢাকার বাজারের দাম অনেক ফারাক।
তিনি আরো বলেন, আমার জানা মতে কুমিল্লা থেকে রাজধানীতে প্রচুর সবজি আসে। এমনকি ঢাকায় আনার উদ্দেশ্যে কৃষকরা তাদের সবজি বিক্রি করেন। আমি কথা বলে জেনেছি, যে দামে ওখানকার কৃষকরা কাঁচামাল বিক্রি করছে তাতে তাদের বেশি লাভ হচ্ছে না। তা হলে ঢাকায় এতো দাম কেন?
এর কারণ হিসেবে এই ক্রেতা বলেন, ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দুই তিন গুণ দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর বাড়তি টাকা গুণতে হচ্ছে আমাদের।
পেঁয়াজের দামের বিষয়ে কারওরান বাজারের আড়তদার আব্দুর রশিদ বলেন, আসলে আমরা বেশি করে নিয়ে আসতে পারছি না। কারণ কোনোভাবে একটা পেঁয়াজ যদি বৃষ্টির পানিতে পঁচে যায় তবে বাকি পেঁয়াজ রাখা খুব অসুবিধা হয়ে পড়ে। এ কারণে বাজারে এর কিছুটা প্রভাব পড়ছে।
এর সঙ্গে ভারতের বাজারে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধিকেও কারণ হিসেবে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
ডিমের দাম বাড়ার বিষয়ে ব্যবসায়ীরা বলছেন, বন্যার কারণে পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে। বৃষ্টি ও ঠান্ডায় অনেক দেশি মুরগি মারাও যাচ্ছে, ডিম পাওয়া যাচ্ছে না।
কারওয়ান বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন বলেন, পরিবহণ সংকটের কারণে ডিম সংগ্রহের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়, বেশি দামে কিনতে হয়। তাই পাইকারি ও খুচরা বাজারে দাম বেড়েছে। এমন চলতে থাকলে সামনে দাম আরো বাড়তে পারে।
তিনি আরো বলেন, বাজারে মাছ, মাংস, ডাল ও শাকসবজির দাম বাড়ার কারণে ডিমের চাহিদা বেড়েছে। আর এ কারণে বাজারে ডিমের সংকট তৈরি হয়েছে। তবে বৃষ্টি কমে গেলে এবং পরিবহণ ব্যবস্থা ভাল থাকলে ডিমের দাম ৩৫ টাকার নিচে নেমে আসবে।
এদিকে ডিমের দাম বাড়লেও অপরিবর্তিত রয়েছে বয়লার ও লেয়ার মুরগির মাংসের দাম। বাজারে বয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৬৫ টাকায়। লেয়ার বিক্রি হচ্ছে ১৮০-১৯০ টাকায়। তবে দেশি মুরগির দাম এখনো চড়া রয়েছে। ২৭৫-৩০০ টাকার নিচে বাজারে দেশি মুরগি পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ১ জুলাই থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত গুঁড়ি গুঁড়ি ও অনবরত বৃষ্টির কারণে সারাদেশে ১ লাখ ১৭ হাজার ৮শ ১৪ হেক্টর ফসলী জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বৃষ্টিতে অন্যান্য জেলার তুলনায় যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, বরিশাল, ফেনী, কক্সবাজার, সিলেট, পটুয়াখালী ও পিরোজপুর জেলার কৃষকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এসবের প্রভাবও পড়ছে বাজারে। তবুও সবজির দাম এতো বেশি হওয়ার কথা নয় বলে মনে করছেন ক্রেতারা।

